আদালতে বিচারাধীন শিশু এখন পরিপূর্ণ যুবক। বিয়ে করে সে বর্তমানে সংসারী। কিন্তু শিশু হিসেবে নিয়মিত তাকে শিশুবিচারিক আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। ঘটনাটি ২০১২ সালের। রাজধানীর চকবাজারের মোল্লার মোড় আর অ্যান্ডসি রোডের একটি পলিমার কারখানার নিরাপত্তাকর্মী খুন হয়। এ হত্যাকা-ে ১১ জনকে আসামি করে নিহতের স্ত্রী মামলা করেন। এই মামলার একজন কিশোরকে, আদালতের নিয়ম অনুয়ায়ী শিশু আদালতে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু বিগত ২০১২ থেকে বর্তমান ২০২৬ সালে এসেও মামলা শেষ করতে পারেনি শিশু আদালত। ফলে এখনো চলছে সেই মামলা। ১৭ বছরের শিশুর বয়স এখন ৩১। আইন বলছে, এই ধরনের মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। মানে এর মধ্যে বিচার শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও, শিশু আদালতের বিচারক কেন মামলা শেষ করতে পারেননি, সেই খবর আমরা জানি না। আমরা জানি, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলে বিচারকের ওই সময়ের মধ্যে মামলার রায় দেওয়ার কথা। কিন্তু যেকোনো কারণে সেই মামলাটি ১৪ বছর পর্যন্ত গড়িয়েছে। এই চৌদ্দ বছরেও যখন বিচারক মামলা শেষ করতে পারেননি, তখন এটা ধরে নেওয়া যায় অধিক মামলার স্তূপ এবং লোকবলের অভাবে বিচারক ঠিক সময়ে কাজ শেষ করতে পারেননি। এমনও হতে পারে, গত ১৪ বছরে মামলার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। আবার এও হতে পারে, প্রসিকিউশনের দায়িত্বে যারা আছেন ও ছিলেন, তারা সময়মতো দায়িত্ব পালন করেনি। আইনজীবীরাও যে সবাই সক্রিয় ছিলেন, এমনটাও বলা যাবে না।
এই চিত্রটি গোটা দেশের আইন ও আদালতের। বিচার না করা ও প্রলম্বিত করার বিচারিক মনোভাব এবং মামলা ঝুলিয়ে রাখার চেতনা, কয়েকজন আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে আছে। এটা যদি তারা অস্বীকার করেন, তাহলে আমাদের বলা উচিত হবে আদালতের সংখ্যা কম, আইনজীবীর সংখ্যা কম এবং এই সুতো ধরে উভয়পক্ষই মামলা ঝুলিয়ে দিতে কসুর করেন না। আমরা তো জানি, আদালতের শরণাপন্ন হলে ন্যায়বিচার পাবে বাদী ও বিবাদী উভয়পক্ষ। আবার সরকারি তরফে নির্মিত আইনে আছে, মারাত্মক সব গরমিল ও অসামঞ্জস্য। স্ববিরোধিতাও আছে। বিশেষ করে, শিশু অপরাধীদের বিচার আদালতের সংখ্যা অঙ্গুলিমেয়। ২০১৩ সালে এই আদালতের যাত্রা। এ পর্যন্ত হয়েছে মাত্র ১২টি। আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক জেলায় একটি করে শিশু আদালত স্থাপন করা হবে। কিন্তু গত ১৪ বছরে ১২টি হলে বোঝা যায়, সরকার চায়নি শিশু আদালত হোক। তার প্রমাণ নারী শিশু ট্রাইব্যুনালেই বিচার কাজ হবে, শুধু ঘোষণা দিলেই হবে এই আদালত এখন শিশু বিচারিক আদালত। এই ব্যবস্থাকে আইনবিদরা বলছেন, স্ববিরোধী। নারী ও শিশুবিষয়ক ট্রাইব্যুনাল কীভাবে শিশু আদালত হবে? দ্বিতীয়ত, ওই আদালতের বিচারকরা কি শিশু সমস্যার বিস্তারিত বিষয় উপলব্ধি করতে পারবেন? তারা কি শিশুর মানসিকতা বোঝেন বা সেই রকম অনুভব করতে সক্ষম? তাদের কি শিশু মনস্তত্ত্ব জানা আছে? তারা কি এটা জানেন যে, শিশু কেন এবং কীভাবে সমাজের ভেতরে থেকেও ক্রিমিনাল অফেন্স করছে? তারা কি জানেন, পরিবারের বাবা-মা, চাচা-চাচিদের মনন-মানসিকতায় শিশু সার্বিক পরিচর্যা সম্পর্কে অবগত।
পরিবার থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো চর্চিত হয় না বলেই তারা ক্রিমিনাল অফেন্সে জড়িয়ে পড়ে। পারিবারিক শিক্ষা যে একটি শিশুর বেড়ে উঠার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ, তা নিশ্চয় আমরা ভুলে যাইনি। পরিবারের বাইরে আছে বিদ্যালয় ও সামাজিক শিক্ষা। বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শিশুর ভালোভাবে গড়ে উঠার ক্ষেত্রে ভালো অবদান রাখে। সমাজসংসারের শিক্ষায় একটি শিশু অনেক কিছু শেখে। বিশেষ করে ন্যায় ও অন্যায় কী, কোনটা অসামাজিক কাজ, কোনটা গর্হিত, কোনটা করা অনুচিত, আদব-লেহাজ ইত্যাদির সঙ্গে আচার-আচরণের অনুপুঙ্খ বিষয়ে তারা শেখে কর্তব্যপরায়ণতা। এরপরও নানা কারণে শিশু-কিশোররা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। অবদমিত ইচ্ছার কারণেও শিশু-কিশোর অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ে। শিশুর অপরাধ বিচারের মাধ্যমে সংশোধন করা কতটা সম্ভব, সেটা ভাবতে হবে। আমাদের শিশু-কিশোর সংশোধনালয়গুলো সংশোধনের মতো উপযুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। শিশুর মানসিকতা মানবিক দৃষ্টি দিয়ে দেখতে হবে। আবার শিশু মনস্তত্ত্ব না জানলে, বিচার করা দুরূহ। এ জন্য বিচারকদের বিশেষভাবে অভিজ্ঞ ও চর্চার অধীন হতে হবে। শিশুশিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া উচিত। শুধু ‘অ-আ-ক-খ’ শেখালেই, শিশুশিক্ষা পায় না। তাকে যেমন লেখা শিখতে হয়, তেমনি তাকে কলম ধরতে, চালাতে শিখতে হয়। আসলে জন্মের পর থেকেই একটি শিশু শেখে। আমরা তাদের শেখাই। শিশু যখন কিশোর হয়ে ওঠে তখন তাকে ন্যায়-অন্যায়, আদাব-সালামসহ যাবতীয় শিক্ষাই দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু তারপরও পাড়া-প্রতিবেশী ও স্কুলের বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে শিশু-কিশোর ডিরেইল্ড হয়, হতে পারে, হয়ে পড়ে। এই শিক্ষাকে পরিবার থেকে যখন বিদ্যালয়ে যাবে সে/তারা, তখন তাকে দিতে হবে সঠিক শিক্ষার কারিকুলাম। বইয়ের শিক্ষার পাশে রাখতে হবে প্র্যাকটিস। সেই কারিকুলামে থাকতে হবে পরিবার-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং সাংস্কৃতিক অভ্যাসের বিষয়-আশয়। আছে ধর্ম ও ঐতিহ্যের আঁকড় সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান, যা তাকে সামনের দিনগুলোকে বোঝার ও নির্মাণের পথ তৈরি করে দেবে। আজকের সমাজ, বিশেষ করে নগর ও মহানগরকেন্দ্রিক শিশুরা নানা অপকর্মের মধ্যে পড়ে যায়। শিশুশ্রম যে বেআইনি, মানুষদের উচিত হবে না শিশুকে সেরকম অপরাধ কর্মে জড়ানো। তা তাদের যেমন জানাতে হবে, তেমনি নিজেদেরও সচেতন থাকতে হবে। তাহলেই কেবল শিশুদের অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে। টিভিতে খবরে দেখছিলাম, একটি কিশোর ওপার থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগে করে মাদক পাচার করে দেশের ভেতরে আসছে। এপারে কোস্টগার্ড বা বিজিবি লুকিয়েছিল জঙ্গলে, সঙ্গে ছিল সংবাদকর্মী ও তার সচল ক্যামেরা। কিশোরটিকে আটক করার পর দেখা গেল, সে বহন করে এনেছে মাদকদ্রব্য। এটি একটি চিত্র। যখন বিজিবি টহলে থাকে না, অন্যদিকে টহলে যায়, এই ফাঁকে চোরাকারবারিরা শিশু-কিশোরদের কাজে লাগায়। ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সে/তারা মাদক সংগ্রহ করে নিয়ে আসে দেশের ভেতরে। শুধু মারাত্মক মাদকই নয়, শিশুরা প্রতিদিনই অন্য অপরাধমূলক কাজ করছে, অথচ তারা তা জানে না। ওপার থেকে ধান বা চাল বা ফলফলারি চোরাই পথে দেশের ভেতরে আনলেও যে তা অপরাধ, সেটা তারা জানে না বলেই বিনা ওজর-আপত্তিতে ওই কাজে যোগ দেয়। আর যারা তাদের কাজে লাগাচ্ছে, তারা চিহ্নিত ক্রিমিনাল। সীমান্তবর্তী এলাকায় ক্রিমিনালের সংখ্যা বেশি। অভিযোগ করা হয়, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের ছোটখাটো নেতারা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। এই অভিযোগ কতটা সত্য, তা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। সরকারি তরফ থেকে যাচাই করে সামাজিক মানুষের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। প্রকৃত সত্য বেরিয়ে এলেই যে কিশোর চোরাচালানি দল বা গ্যাং সদস্যদের নিবৃত্ত করা যাবে, এমনটা নয়। তারা যে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, সেটাও তারা বোঝে না। এই বোঝানোর দায় সমাজপতিদের, দায় পরিবার-পরিজন ও শিক্ষকদের। কিন্তু সেই কাজ আদৌ হয় না। শিক্ষকরা এখন আর শিশুদের শাসন করেন না। তার কারণ ভয়। ওই শিশু যদি কোনো গ্যাংয়ের সদস্য হয়, যা হওয়াটাই স্বাভাবিক, সমাজপতিদেরই কেউ না কেউ অপরাধীদের লালন-পালন ও নিরাপত্তা দিয়ে থাকেন, তাহলে সমস্যা সংকটে রূপান্তরিত হতে পারে। সমাজব্যবস্থা যে তার আসল কর্তব্য হারিয়ে ফেলেছে, তা আমরা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। সর্বত্র একটি ভাঙা ব্যবস্থা, ভাঙা সুর বাজছে।
এখান থেকে আমাদের বের হতে হবে। আর বেরিয়ে কোথায় থামব, কোথায় দাঁড়িয়ে নতুন কিছু নির্মাণ করব, তা খুঁজে বের করতে হবে। শুধু ভেঙে দিলেই হবে না, গড়ে তোলার কল্পনা ও পরিকল্পনাও থাকতে হবে, আঁকা থাকতে হবে। পৃথিবী যখন পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক সমাজে বিভক্ত ছিল, তখন বাম ঘরানার রাজনীতিকরা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিত এই সমাজ ভাঙতে হবে। সাম্য সমাজ গড়তে হবে। তখন সাম্য সবাই একই সমাজে, একই মানের অধীনে বসবাস করবে। গরিব মানুষদের জন্য এই কল্পবাস্তব খুবই মোহময় ছিল। তারা দলে দলে ওই কল্পবাস্তবের লাইনে সারিবদ্ধ হলো। কিন্তু সেই কল্পবাস্তব আর বাস্তবসত্য হলো না। নানা ঘাতে তা ভেঙে গেল। এখন কেবলই পুঁজির সাম্রাজ্য। ডিরেইল হওয়ার অনেক মজার মজার সর্গ-উপসর্গ আছে। শিশুকে মোবাইল (মূলত ওই যন্ত্রের নাম সেলুলার) হাতে দিলে কী হতে পারে, তার বাস্তব অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমারই নাতি এখনো চার বছর বয়স, কথা বলে না সেলুলারের বদৌলতে সে এখন অস্থির ও উত্তেজিত। এখন সে মাত্র কথা বলার স্কুলে ভর্তি হয়েছে। আমরা যে কি ভুল করি, শিশুকে শান্ত রাখতে গিয়ে, তার একটি উদাহরণ এটি। দয়া করে শিশুর হাতে সেলুলার দেবেন না। দয়া করে প্রতিদিনই তার সঙ্গে কথা বলেন ও কথা বলার চর্চা করেন, তাহলে সে সবকিছু ধারণ করতে পারবে। সে হু হু করে উঠলে আপনি তার বিপরীতে বাবা, পাপা, দাদা, মামা, চাচা বলতে শেখান। জিহ্বার জড়তা কমে গেলেই সে কথা বলতে শিখবে।
দ্বিতীয় কাজটি করতে হবে, কখনোই শিশুকে একা রাখবেন না। ভঙ্গুর কোনো কিছুর টুকরো শিশুর হাতে দেবেন না। শিশু মুখে নিতে পারে এমন বয়সে, ওই টুকরোটুকু কখনো দেওয়া উচিত নয়। টিভিতে শিশুতোষ কার্টুন দেখান, যেগুলো তাকে তার শরীরে এক ধরনের আনন্দ সৃষ্টি করবে। তাকে আন্দোলিত করবে এবং তার ভেতরে ক্ষমতার বীজ বুনবে। এ ছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে, যা পিতা-মাতাকে লক্ষ্য রাখতে হবে। নবজাতকের মা কেন জব ছেড়ে দিয়ে বাচ্চার লালন-পালনে সারা দিন সারা রাত ব্যয় করে, তা আমাদের বুঝতে হবে। আমাদের গ্রামের নবজাতকরা কোনো রকম পরিচর্যা পায় না। বাবা-মায়ের সংসারে তাদের কষ্টসাধ্য জীবনে শিশু অনাদরে অবহেলায় বড় হয়ে ওঠে। তারা না পায় পরিবার থেকে শিক্ষা, না পায় লোকজ সংসারের স্নেহ-মায়া ও পরিচর্যা, না পায় পুষ্টিকর খাবার। গ্রামীণ শিশুরা যাতে পুষ্টি পায়, তার জন্য সরকার বিশেষ প্রণোদনা দিতে পারে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রসূতি মা ও জাতকের জন্য বিশেষ আর্থিক সুবিধা দিতে পারেন। স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি ঘরে খোঁজ নিয়ে তালিকাভুক্ত করতে পারেন এবং সেই তথ্যপূর্ণ তালিকা ধরে প্রণোদনার অর্থ দেওয়া যেতে পারে। তবে সেই টাকা শিশুখাদ্যসহ অপরাপর কাজে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা তদারকি করবে ইউপি মেম্বাররা। তাতে করে তাদেরও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। শিশুরাও, বিশেষ করে প্রান্তিক শিশুরা নগর শিশুদের মতোই মানবিক শুশ্রুষা পাবে। একটি জাতির শিশু-কিশোররা সুস্থ ও নীরোগ দেহে বেড়ে উঠতে পারলেই, সেই প্রজন্ম থেকে নতুন মানুষের আবির্ভাব আমরা দেখতে পাব। আমরা নীরোগ দেহের শিশু-কিশোরই দেখতে চাই। কোনো রকম অপরাধপ্রবণ ও ডিরেইল্ডদের দেখতে চাই না। সরকারকে বুঝতে হবে, কী কী পদক্ষেপ নিলে শিশুরা সমাজে অনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে না। সেই পরিকল্পনাই বাঁচাতে পারে নতুন প্রজন্মকে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
mahboob.hasan08@ gmail.com