রাষ্ট্র কতটুকু মিতব্যয়ী হবে

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৭ এএম

ইরান, ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ফলে বিশ্ব বর্তমানে অস্থির সময় পার করছে। বিশ্বের অনেক দেশ সংকটে পড়েছে এবং কিছু দেশ নতুন করে সংকটে পড়তে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিগত কয়েক বছরই বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা বেশ ভঙ্গুর। তাই অস্থির বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে বা তুলবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও ভেঙে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে অথবা স্থিতিশীল অবস্থা বজায় রাখতে,  সরকারকে মিতব্যয়ী হওয়া ছাড়া উপায় নেই যেখানে বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোও জ্বালানি সংকট নিরসনে, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় মিতব্যয়ী হওয়ার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রশ্ন হলো, সরকার কতটুকু মিতব্যয়ী হবে? বিশ্বে জ্বালানি তেলের সংকট চরমভাবে ঘনীভূত হচ্ছে, যা থেকে বাংলাদেশ নিজেকে সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করতে পারবে না। তবে সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করে, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল রেখে জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া সম্ভব।

সরকারকে মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন পড়বে বলে মনে করেন না অনেক বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, শুধু একটি খাত নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই দেশ সফল হবে, সফল হবে সরকার এবং স্বস্তি পাবে সাধারণ জনগণ। সেই খাতটি হলো, জ্বালানি তেল। কারণ, বিশ্বে জ্বালানি তেলের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী অঞ্চল হলো মধ্যপ্রাচ্য। এ কারণেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যের তেল শোধনাগারগুলোতে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালাচ্ছে। ইরান হয়তো মনে করছে, ‘মরলে একা মরব না, সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ে মরব।’ সেই হাওয়া থেকে বাংলাদেশ নিজেকে কতটুকু বাঁচাতে পারবে? কারণ বাংলাদেশে দরবেশ বাবার অভাব নেই। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সেই চরিত্রের বাবাদের হাতে দেশের শিল্প খাতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারকে দক্ষ, সৎ ও নির্ভীক ব্যক্তিদের হাতে উপযুক্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে হবে। কারণ একদিকে জনগণকে আশ্বস্ত করতে হবে, অপরদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় কঠোর হতে হবে। সরকারকে স্বচ্ছতার সঙ্গে জ্বালানির প্রকৃত অবস্থা জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে হবে এবং ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাতে হবে। দেশে কী পরিমাণ জ্বালানি মজুদ আছে এবং এর চাহিদা কত, তা প্রকৃত অবস্থাসহ নিয়মিত বা নির্দিষ্ট সময় পরপর তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি, জনগণ যাতে আতঙ্কিত না হয়, সেদিকেও রাষ্ট্রকে নজর দিতে হবে। জ্বালানির মজুদ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যের গরমিল থাকতেই পারে এ বিষয়টি রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারকে মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য একমাত্র জ্বালানি তেলের ওপর কেন গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, কারণ জ্বালানি তেল ছাড়া সমগ্র বিশ্ব অচল। জ্বালানি তেলের ব্যবহারের মাধ্যমেই বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কল-কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখা, যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা, কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সার উৎপাদন, এমনকি চিকিৎসা ক্ষেত্রে জীবনরক্ষার প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ওষুধ উৎপাদনে জ্বালানি খাতের বিকল্প নেই। এ কারণে এই যুদ্ধের মাধ্যমে তেলকেই একমাত্র মাধ্যম বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই জ্বালানি তেলের ব্যবহারে সর্বোচ্চ নজর দিয়ে যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে জ্বালানি পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলের যে দীর্ঘ লাইন বা ব্যক্তিগত গাড়ির যে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, সেখান থেকে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া উচিত রাষ্ট্রের এই ক্রান্তিকালে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ নেই। প্রত্যেককে গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে বিদ্যুৎচালিত এবং জ্বালানি তেল ছাড়া গাড়ির ওপর জোর দিতে হবে। অতিরিক্ত আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। রাস্তার বাতিগুলো বন্ধ রাখতে হবে। তবে ডাকাতি বা ছিনতাই এড়ানোর জন্য রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর ১৪৪ ধারা জারি করা যেতে পারে। আরও কীভাবে উত্তম পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে একক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পরিহার করতে হবে। সবার আগে দেশ বাংলাদেশ, এই নীতিতেই অটল থাকতে হবে সবাইকে। বিদ্যুৎকে প্রাধান্য দিয়ে, অফিস-আদালত বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ঠিক হবে না। যদি অনলাইনে ক্লাসগুলো পরিচালনা করার চেষ্টা করেন, সেখানে মোবাইলে আসক্ত কোমলমতি শিশুরা বা শিক্ষার্থীরা আরও বেশি মোবাইলের প্রতি আসক্ত হবে। সুতরাং এমতাবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো অবস্থায়ই বন্ধ করা যাবে না। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ে লোডশেডিং দেওয়া যেতে পারে। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কীভাবে ঠিক রাখা যায়।

সবাই মিলে দেশের এই ক্রান্তিকালে কী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। বিপদ খুবই সন্নিকটে। এমতাবস্থায় সংবিধান, গণভোট এবং জুলাই সনদ নিয়ে টানাহেঁচড়া করা হলে সরকারের সমস্যা হতে পারে। সরকারকে স্পষ্ট করা উচিত সংবিধান, গণভোট এবং জুলাই জাতীয় সনদ একটি নির্দিষ্ট সময়ে আলোচনা বা গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু আসন্ন বিপদ থেকে বাঁচার জন্য, এখনই সময় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের। আর সঠিক সিদ্ধান্ত যদি সবাই মিলে গ্রহণ করা হয়, তা হবে অধিকতর গ্রহণযোগ্য এবং ফলপ্রসূ। সামনে মূল্যস্ফীতি কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, দারিদ্র্যের হার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে, কলকারখানা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, প্রবাসী আয়ে ব্যাঘাত ঘটবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবে। আবার গুঞ্জন পাওয়া যাচ্ছে, বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন শুরু করবে সংবিধান সংস্কার নিয়ে, যা এই দুর্যোগকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে। এতে করে দেশ ও দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান চরম ভোগান্তিতে পড়বে। জাতির এই ক্রান্তিকালে প্রত্যেককে সহনশীল হতে হবে। মূল ভূমিকায় থাকতে হবে সরকারকে, যাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে। কারণ ব্যর্থতা ও সফলতার ফলাফল নির্ভর করবে সরকারের ওপর। সফল হলে ভালো, কিন্তু ব্যর্থ হলে চরম মূল্য দিতে হবে। তাই এখনই সময় সঠিক সিদ্ধান্তের। সঠিক সিদ্ধান্তই সঠিক রাস্তা দেখাবে। দেশ ও জাতি সেই প্রত্যাশায় অধীর আগ্রহে সরকারের প্রতি চেয়ে রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কী করে।

লেখক : ব্যাংকার ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত