বিগত অন্তর্বর্তী কিংবা রূপান্তরকালীন সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টা ও তাদের কারও কারও স্বামী-পুত্র ও স্বজনদের দুর্নীতির যেসব চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে, তাতে অন্তর্বর্তী সরকারের স্তাবকদের ভ্রুকুঞ্চিত। অবশ্য তাদের কজনকে চিনি-জানি। অন্তর্বর্তী কিংবা রূপান্তরকালীন সরকারের শাসনামলে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত আমার কয়েকটি লেখা নিয়ে তাদের কেউ কেউ আমাকে কিঞ্চিৎ সতর্ক করেছিলেন। এ অভিযোগ তো এড়ানো যাবে না যে, ওই সরকারের কারও কারও স্বেচ্ছারিতায় কত জীবন, কত পরিবার বিপন্ন-বিপর্যস্ত হয়েছে। তার হিসাব মেলানো ভার। বিগত সরকারের যেসব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি-স্বেচ্ছারিতার অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার কি তা আমলে নিয়ে খতিয়ে দেখে আইনি প্রতিকার করবে? এ দেশে স্তাবকদের ভিড়, সময়-সুযোগ বুঝে স্ফীত হওয়ার চিত্র ফিরে ফিরে দৃশ্যমান হয়েছে খুব কদর্যভাবে। ভবিষ্যতেও যে হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
রূঢ় সত্য হলো, স্তাবকদের আয়ুষ্কাল বরাবর খুব কম। ওই সরকারে বেশ কিছু জ্ঞানপাপীও ছিলেন এ অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। যেসব সংবাদমাধ্যমে ওই সরকারের স্তুতি গাওয়া হতো, তাদেরও কেউ কেউ মুখ খুলতে শুরু করেছে। আশা করি, ওই জ্ঞানপাপীদের মুখোশও তারাই উন্মোচন করবেন। সব কথার শেষ কথা হলো, কে বা করা এই রক্তস্নাত দেশটিকে সব সম্ভবের দেশে পরিণত করলেন! অনস্বীকার্য, স্বাধীনতা অর্জনের পর মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার-প্রত্যয়ে ক্রমান্বয়ে ক্ষয় ধরতে শুরু করে। সৃষ্টি হতে থাকে ক্ষতের ওপর ক্ষত। এই ক্ষতগুলো মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার সর্বজনের রাষ্ট্র গড়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ওই অঙ্গীকার-প্রত্যয়ে এমন ঝং ধরিয়েছে, যা ছাড়ানো এখন সহজ নয়। সর্বজনের রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের জনগুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়টি, বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিছক রাজনৈতিক বাকোয়াজ ছাড়া আর কিছু যে নয়, সেসবের নজির রয়েছে অনেক।
এই বাস্তবতায় সংগত প্রশ্ন দাঁড়ায়, অধিকারের সমতল ভূমি নিশ্চিত করা কি এত সহজ? এ নিয়ে এ পর্যন্ত যত আওয়াজ আমরা শুনেছি, এর ন্যূনতম কিছু কি বাস্তবায়নের আয়োজন কখনো দৃশ্যমান হয়েছে? ৫৪ বছরের রক্তস্নাত বাংলাদেশে, নেতিবাচক অনেক কিছু করেই রাগ তো কম দেখানো হয়নি। মনে রাখা প্রয়োজন, এভাবে ফ্যাসিবাদের যবনিকাপাত ঘটে না। বরং ফ্যাসিবাদের পুনঃজন্ম কিংবা পুনরুৎপাদনই হতে থাকে এবং রাজনীতির গায়ে কালিমা লেপন হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে স্ববিরোধিতা যে দেশের রাজনীতির অঙ্গভূষণ হয়ে গেছে, ওই দেশে শুভ কিছুর প্রত্যাশা করা কঠিন। তবুও আশা হারাতে চাই না। অধিকার ও জীবনবৈরী কোনো অভিঘাতই মেনে নেওয়া যেকোনো মানবিক মানুষের পক্ষে দুরূহ। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির নজিরও আমরা কম দেখিনি। প্রশ্ন দাঁড়ায়, সর্বজনের রাষ্ট্র গড়ার যে প্রত্যয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার, তা কি গুটিকয়েক রাজনীতিকের অনিচ্ছার কারণেই হারিয়ে যায়নি? এ দেশের রাজনৈতিক অর্জন তো কম নয়। কেন ঘটল এমন অর্জনের বিসর্জন? বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব প্রশ্নের উত্তর সন্ধান জরুরি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে প্রত্যাশা রাজনীতিকে জনকল্যাণমুখী এবং রাজনীতির শ্রী যদি ফেরাতে হয়, তাহলে এর সমাধানে গুরুত্ব দেবেন তারা। অন্তর্বর্তী কিংবা রূপান্তরকালীন সরকারের শাসনামলজুড়ে ‘মব জাস্টিস’ শব্দযুগল সমাজে যে ভয়াবহতার সৃষ্টি করেছিল, সেই ক্ষতের উপশম এখনো হয়নি।
আইনের শাসন কিংবা ন্যায়বিচারের দাবি এ দেশে নতুন নয়; বহু পুরনো। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই দাবির বাস্তবায়ন আজও অধরা রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এ নিয়ে সমাজে আক্ষেপ-আকুতি বাড়ছে । রক্তস্নাত বাংলাদেশের ইতিহাসে ট্যাগের রাজনৈতিক অপ-সংস্কৃতি যেভাবে ক্রমাগত অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, তাতে এটি সমাজের জন্য ভয়ংকর বার্তা বহন করে। অনেক ক্ষেত্রে, এখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল মবের উৎকট রূপ। আমরা জানি, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজকে অনাচার, দুরাচার ও অপকর্মমুক্ত করার জন্য রাষ্ট্রে বিদ্যমান আইনি কাঠামো এবং আইন প্রয়োগকারী বহু সংস্থা ও বাহিনী রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আইনি কাঠামোকে ডিঙিয়ে যখন মানুষ নামধারী কিছু স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তি সমাজে উন্মত্ততা ছড়িয়ে দিয়েছিল, তখন তা জনমনে ভয় আর প্রশ্নের সীমা বাড়িয়ে দিয়েছিল। তখন বিএনপি দলীয়ভাবে এর নিন্দা জানিয়েছিল। আজ তারা ক্ষমতায়। তারা কি তখনকার ‘মব জাস্টিস’-এর প্রতিবিধান করতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে? আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, অতীতে রাজনীতি ও ভোটের সমীকরণে অনেক অপরাধ চিহ্ন মুছে গেছে। এমন গুরুতর ব্যাধি যে দেশের রাজনীতির অনুষঙ্গ হয়ে গেছে, সে দেশে সর্বজনের অধিকার নিশ্চিত করা সহজ নয়। আমাদের রাজনীতিকদের অনেকের দেশপ্রেম নিয়ে নানা কথা আছে এবং সেসব কথা যে অমূলক নয়, এও অনস্বীকার্য।
মনে রাখা জরুরি, নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তার অনিবার্য শর্ত হচ্ছে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিকতা। এর অর্থ হলো, গণতান্ত্রিক সরকারে জনগণের অংশগ্রহণ, জনগণের দ্বারা ও জনগণের স্বার্থের অনুকূলে পরিচালিত সরকার। রেমন্ড গারফিল্ড গেটেল, অধ্যাপক গেটেল নামে সমধিক পরিচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে, ‘যে শাসন ব্যবস্থায় জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগে অংশ নেওয়ার অধিকারী, তাই গণতন্ত্র।’ কিন্তু আমাদের দেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এরও ব্যত্যয় ঘটেছে বারবার। রাষ্ট্র সর্বজনের হওয়ার ক্ষেত্রে, এও অন্যতম অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর দায় কি রাজনীতিকরা এড়াতে পারেন? অগ্নিদগ্ধ-রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই বাংলাদেশের মাটিতে ক্ষতের তালিকা দীর্ঘ হওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কোনো পক্ষই এড়াতে পারে না। ভুলে যাওয়া অনুচিত, একাত্তরের রক্তাক্ত অধ্যায় খুব দূর অতীতের নয় যে অধ্যায় জাতির বাঁক পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। এও ভুলে যাওয়া অনুচিত, ওই অধ্যায়ের মহানায়ক-নায়ক ও প্রত্যেক সমরনায়ক কিংবা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আমাদের অনেক ঋণ। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও সেই অধ্যায়েরই একজন বীর সমরনায়ক। কিন্তু তাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার অপপ্রয়াস কম হয়নি। সত্য অস্বীকার করে, মিথ্যার জাল বুনে সঠিক ইতিহাস রচিত সম্ভব নয়, কখনো নয়। রাজনীতির নামে অপরাজনীতির সড়ক চওড়া হওয়ার কারণেই, অনাচারের চারণভূমি বিস্তৃত হতে থাকে। ভুলের ঊর্ধ্বে কেউ নন, ভুলের গঠনমূলক সমালোচনা হতে পারে এবং তা হোক, কিন্তু সত্যকে অস্বীকার করে নয়। রণাঙ্গনের বাইরেও অসংখ্যজন একাত্তরপর্বে মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশে-বিদেশে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন। তারা সবাই জাতীয় বীর মনে করি। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং তাদের কাছে আমাদের যে ঋণ, তা কোনোভাবেই শোধ করার নয়। তাদের মর্যাদা-সম্মানটুকু যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আমাদের ভোগ করতে হবে ভয়াবহ পরিণাম, তা যেন ভুলে না যাই।
রাজনীতির ভুল সংশোধিত হতে হবে রাজনৈতিক পন্থাতেই। আমরা এমন কোনো রাজনীতি আর চাই না, যে রাজনীতির কারণে রাষ্ট্রের মালিক জনগণকে পোহাতে হবে খাণ্ডবদাহন। রাজনীতির অপর নাম যদি হয় ‘জনকল্যাণ’, তাহলে বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে ফিরে ফিরে যে কদাচারের অধ্যায়গুলো দৃশ্যমান হয়েছে তাতে এ প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয় যে, এ কোন রাজনীতি! কিছু কিছু হীনস্বার্থবাদী রাজনীতিকদের নৈতিক অধঃপতন যে ক্ষত রাষ্ট্র ও সমাজে সৃষ্টি করেছে এর উপশম কীভাবে হবে তা শুধু গভীর চিন্তার বিষয়ই নয়, এর প্রতিবিধান নিশ্চিত করা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার, গণমানুষের রাষ্ট্র গঠনের কোনো বিকল্প নেই। দেশে রাজনৈতিক সুস্থতা আসুক। মানুষ ফিরে পাক, নিজস্ব অধিকার। আমরা যেন দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার সময়, বিষয়টি সর্বক্ষণ আচরণ ও স্বভাবে গেঁথে নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কবি ও বিশ্লেষক