ক্যাপ্টেনকে ট্রফি দিয়ে নির্বাচনের তারিখ এনেছেন ড. ইউনূস

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪১ এএম

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডনে গিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের ট্রফি দিয়ে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে এসেছেন বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন তিনি। তিনটি আন্দোলনের ট্রফি বিএনপির ঘরে বলে দাবি করে মীর শাহে আলম বলেন, ‘১৯৭১ ,১৯৯০ ও জুলাই-আগস্ট, তিনটি আন্দোলনের ট্রফিই আমাদের ঘরে। এ রকম ট্রফি শুধু বিএনপির ঘরে, অন্য কোনো রাজনৈতিক দল দেখাতে পারবে না। আওয়ামী লীগ ৭১ ও ৯০ বলতে পারবে, কিন্তু জুলাই-আগস্টের ট্রফি তাদের ঘরে নেই। বিরোধী দলের বন্ধুরা জুলাই-আগস্ট বলতে পারবে, কিন্তু ‘৭১ ও ৯০ বলতে পারবে না। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতারা হইচই করেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধী দলের এমপিরা হইচই করতে পারেন। তারা নব্বইয়ের কথা বলতে পারেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে ঢাকঢোল পিটিয়ে তারাই আওয়ামী লীগের নির্বাচনে গিয়েছিলেন, আমরা যাইনি।

মীর শাহে আলম বলেন, এনসিপির এক নেতা বাইরে বলেছিলেন, জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা খেলেছে আর ট্রফি বিএনপি নিয়েছে। এ সময় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা হইচই করলে স্পিকার বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা, বক্তাকে কোনো বাধা দেবেন না। আপনারাও আপনাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন।’

পরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আমরা সবাই ছিলাম। ট্রফি আমরা কারও কাছে নিতে যাইনি। ক্যাপ্টেন কে? সেটা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস চিনেন। এ কারণে উনি লন্ডনে গিয়ে আমাদের ক্যাপ্টেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ট্রফি দিয়ে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে এসেছেন। এতে প্রমাণিত হয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নেতৃত্ব মূল ভূমিকা কোন দলের ছিল, কোন নেতার ছিল; আমরা সবাই আন্দোলন করেছি, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ক্যাপ্টেন একজনই থাকেন, সে ক্যাপ্টেনের কাছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান লন্ডনে গিয়ে আলোচনা করে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসছেন বলেই এ দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে।’

জাতীয় সংসদের স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদের উদ্দেশে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বলেন, আপনি ১৯৭১ সালকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই ক্রেডিট বিএনপির, কারণ, স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান।

সরকারি দলের বেঞ্চে অনেক মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটি বিরোধী দলের বেঞ্চের মধ্যে খুঁজে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই করেন। তখন স্পিকার বলেন, ‘বিরোধী দলের বেঞ্চেও মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। আমি নিজেও দেখেছি, গাজী নজরুল ইসলাম (সাতক্ষীরা-৩) একজন মুক্তিযোদ্ধা।’

বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী দলের (২০০১ সালের সরকার) এমপিদের গাড়িতে পতাকা দিয়ে দায়মুক্তি দিয়ে সরকারের অংশ করে জাতির কাছে সম্মানিত করেছেন। সে কথা তো একবারও বলেন না! আপনাদের শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বেগম খালেদা জিয়া ... ।’

সবার আন্দোলনের ফসল বর্তমান সংসদ উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরাও আন্দোলন করেছি, আপনারাও আন্দোলন করেছেন। কিন্তু ২০১৪ সালের পরে আপনাদের আর খুঁজে পাইনি। দীর্ঘদিন যাবৎ আমরা চারদলীয় জোট, ২০ দলীয় জোট একসঙ্গে ছিলাম। একে অন্যকে কিন্তু বহুভাবে চিনি। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আপনারা গুপ্ত হয়ে জুলাই-আগস্টের পরে প্রকাশ্য এসে জাতির সামনে বারবার জুলাই-আগস্টকে ধারণ করে ভুল বোঝাতে চাচ্ছেন। আপনারা জুলাই-আগস্টকে এমনভাবে ধারণ করতে চান, মনে হয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন হয়নি। যদিও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বর্তমান বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমানসহ জামায়াতের নেতারা বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিল।’

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে ফ্লোর নেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথম দিনই অঙ্গীকার করেছি যে, এ বিরোধী দল গতানুগতিক বিরোধী দল হবে না। ন্যায়সংগত সব কাজে সহযোগিতা এবং অন্যায়-জনঅধিকার হরণকারী সব পদক্ষেপে কণ্ঠ থাকবে আপসহীন।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজকে সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে দেওয়া বক্তব্যে অসংখ্য অসত্য তথ্য এখানে এসেছে। দু-একটার প্রতিবাদ আপনি (স্পিকার) নিজেও করেছেন। আমাদের দাবি, অসত্য কোনো তথ্য যাতে সংসদে কেউ পরিবেশন না করেন। ‘অসত্য তথ্য’ এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা। পরে স্পিকার বলেন, ‘আমি বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখব। সেখানে কোনো অসংসদীয় ও অসত্য তথ্য থাকলে এক্সপাঞ্জ করা হবে।’

রাষ্ট্রপতি নিজের মতো ভাষণ দিতে পারেননি, ক্ষমতার ভারসাম্য কোথায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার জন্য বারবার আলোচনা হয়েছে। সরকারি দল, বিরোধী দল, চব্বিশের অভ্যুত্থানের আগে-পরে সব সময় বলা হয়েছে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা। বিএনপি তার ভিশন ২০৩০ ও ৩১ দফায় এ সম্পর্কিত প্রস্তাব রেখেছে। এই কারণে প্রত্যাশা ছিল, এবার রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত ভাষণের বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে ভাষণ দিতে পারবেন। কিন্তু আমরা দেখলাম, এবারও মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদিত ভাষণ দিতে হয়েছে। এতটুকু স্বাধীনতা আমরা রাষ্ট্রপতিকে দিতে পারিনি, তাহলে আমরা কোন ভারসাম্যের কথা বলছি।’

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন রুমিন ফারহানা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য তিনি বিএনপিকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, ‘বিএনপি মনোনয়ন না দেওয়ার কারণে দেশের লাখো মানুষের ভালোবাসা বুঝতে পেরেছি।’

জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘এই আন্দোলনের সম্মুখসারিতে ছিলেন নারীরা। একঝাঁক নতুন প্রজন্মের তরুণ মুখ আমরা পেয়েছিলাম। সেই নারীরা এক বছর পার না হতেই হারিয়ে গেল কেন? সাতজন নারী সংসদ সদস্যের এই সংসদে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি। মিছিলের সামনের সারিতে নারীর প্রয়োজন হয়, টিয়ার শেল ও লাঠিপেটার সামনে নারী ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, অস্থির সময়ে নারীর সাহায্য ছাড়া পার হওয়া যায় না আর সবকিছু যখন ঠিক হয়, তখন নারী হয়ে যায় ‘ট্রলের বস্তু’। নারীর পোশাক, নারীর চেহারা, নারীর কথা, নারীর হাসি সবকিছু তখন হাসির খোরাকে পরিণত হয়। ৫২ শতাংশ মানুষকে পেছনে ফেলে নতুন বাংলাদেশ রচনার কোনো চিন্তা যদি কেউ করে থাকে, সেটা কখনো সম্ভব নয়। কোনো দিন সম্ভব নয়।’

রুমিন বলেন, গত ১৫ বছরে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে এর পরিমাণ ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার; তা ফেরত আনা না গেলে কিংবা ব্যাংক খাতে থাকা ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা না গেলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসবে না। মিথ্যা ইনভয়েসিং বন্ধ করা না গেলে টাকা পাচার বন্ধ হবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত