জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশের বড় বড় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমিত আকারে অনলাইন-অফলাইন পাঠদান পদ্ধতি চালুর চিন্তা করছে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আপাতত এ পরিকল্পনার বাইরে রাখা হতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনলাইন-অফলাইন পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আজ বুধবার শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে অংশীজনদের এ বৈঠকেই একটি দিকনির্দেশনা আসতে পারে। তবে কোন স্তরে কতদিন অনলাইন বা অফলাইন ক্লাস হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো খসড়া পরিকল্পনা হয়নি।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনলাইন ক্লাস পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে এটি কার্যকর হবে না। তার মতে, বড় শহরে সীমিত পরিসরে এ ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু সারা দেশে একযোগে বাস্তবায়ন যৌক্তিক নয়। তিনি আরও বলেন, দেশে পর্যাপ্ত ডিভাইস, স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ ও অনলাইন উপযোগী পাঠ পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতিও এখনো পর্যাপ্ত নয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (বিদ্যালয়) রেবেকা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনলাইন-অফলাইন ক্লাস চালুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করা হয়নি বা এমন নির্দেশনাও আসেনি।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (কলেজ-১) অধ্যাপক মো. নুরুল হক শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৮ এপ্রিলের বৈঠকের সুপারিশ পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। সেখান থেকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন অফলাইন ক্লাস চালুর মতো কোনো প্রস্তাব এখনো আলোচনায় আসেনি বলেও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোভিড-১৯ সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্লাস পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত হলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তার জানা নেই।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাপ বেশি বড় শহরগুলোতে। তাই সেসব এলাকাতেই সীমিত পরিসরে অনলাইন-অফলাইন পদ্ধতি চালুর সম্ভাবনা বেশি। তবে অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও প্রস্তুতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, অনলাইন-অফলাইন ক্লাস পরিচালনার বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হবে এবং তাতে কোনো পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইকবাল বাহার চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে একটি আলোচনায় যুক্ত হয়েছিলাম। সেখানে অনলাইন ক্লাস নিয়ে নানান জটিলতার কথা তুলে ধরেছি। বিকল্প সমাধান হিসেবে কয়েকটি বিষয় উত্থাপন করেছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সকালে এক শিফটে নিয়ে আসা, সাপ্তাহিক বন্ধ বাড়িয়ে হোমওয়ার্ক বা অ্যাসাইনমেন্ট পদ্ধতিতে পাঠদান করা।
তিনি বলেন, অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে। প্রয়োজনীয় ডিভাইসের অভাবে এসব শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে পারবে না। এ ছাড়া অনলাইন ক্লাসের জন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও পাঠ পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোভিড সময়কালে অনলাইন পাঠে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি জরিপ করা হলেও পরে তা প্রকাশ করা হয়নি।
