চুক্তির ফাঁদ যুদ্ধের আঘাত

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৬ এএম

ভয়াবহ যুদ্ধ কতদিন চলবে, মধ্যপ্রাচ্য কি আগের মতো থাকবে এ প্রশ্নের সঙ্গে ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্ববাসী। এই যুদ্ধে প্রতি সেকেন্ডে আমেরিকা খরচ করেছে ১০ হাজার ডলারের বেশি, তা জানা যাচ্ছে। কিন্তু হিসাব হচ্ছে না, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে জীবন-সম্পদ ধ্বংস হয়েছে কত? সাময়িক একটা যুদ্ধবিরতি হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব কতদিন, এই বিরতি কি আরেকটি যুদ্ধের প্রস্তুতি? যুদ্ধ যদি থেমেও যায়, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হবে কীভাবে? এবং এসব প্রশ্ন ভেসে উঠছে মানুষের মনে। একটি সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে, এই ঘোষণা কোন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান প্রকাশ্যে দিতে পারেন এ কথা কেউ ভাবেনি আগে। এর আগে সাম্রাজ্যবাদ তার বাজার দখলের জন্য, দুটো বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়েছে। প্রাণহানি ঘটেছে কয়েক কোটি মানুষের। লুণ্ঠন করা হয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ আর ধ্বংস হয়েছে কত জনপদ। সমস্বরে প্রতিবাদ করে এখন আর সেসব কথা বলে লাভ নেই। এসব কথা মানুষ বোঝে না। মানুষ বোঝে, উন্নয়ন আর ব্যক্তিগত লাভ। উন্নয়নের নেশা, প্রায় আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে মানুষের। এখন সমাজে আর আদর্শ, নীতি, সমাজের উন্নতি নিয়ে আলোচনার কোনো কার্যকর প্রভাব নেই। এসব কথা বলতে বলতে,  প্রায় সত্যে পরিণত করেছে একদল মানুষ। বিশ্ব এখন গ্লোবাল ভিলেজ। এ কথা বলার চল শুরু হয়েছিল, ৯০-এর দশকে।

বলা হয়েছে, সমাজতন্ত্র ব্যর্থ, এ দিয়ে চলবে না। পৃথিবীতে এখন প্রতিষ্ঠিত হবে, শুধু শান্তি এবং সহযোগিতা। শোষণ একটা বামপন্থি রাজনৈতিক বুলি, এই বুলি দিয়ে মানুষকে বিভক্ত করা ঠিক না। কেউ কাউকে শোষণ করে না, এখন পৃথিবীতে সবাই হবে উন্নয়ন সহযোগী। ধনী দেশগুলো গরিব দেশগুলোকে সহযোগিতা করবে, যাতে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমে যায়। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ভেঙে গেল। কিন্তু ১৯৯০ থেকে ২০২৫ এই ৩৫ বছরে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কি কমেছে? বৈষম্য কমেনি, শোষণ থামেনি বরং বিশ্ব মাস্তানের কবলে যে সব দেশ জিম্মি, এটা এখন না বললেও সবাই বুঝতে পারেন। ফলে যে শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের গল্প বলা হয়েছিল তা মিথ্যায় পর্যবসিত হয়েছে। বিশ্ব এখন পুঁজিবাদী শক্তিশালী দেশগুলোর লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এদের মোড়ল হিসেবে সারা বিশ্বকে লুণ্ঠনের নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। ইরানে তার আগ্রাসী রূপের আগে তেলের জন্য ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও দেখেছে মানুষ। সারা পৃথিবীর স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষেরা প্রতিবাদ করছে আমেরিকার এই বর্বরতার। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে এক নতুন ধরনের যুদ্ধ দেখছে মানুষ। এ যুদ্ধ অস্ত্রের নয় চুক্তির। অন্তর্বর্তী সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে, নির্বাচনের তিন দিন আগে আমেরিকার সঙ্গে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে, বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারাবে বাংলাদেশ। কারণ চুক্তির আওতায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে চার হাজার পণ্যে শুল্ক নিতে পারবে না। এছাড়া আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। আবার বাংলাদেশ আমেরিকায় যে সমস্ত পণ্য রপ্তানি করে, তার ওপর আগে থেকেই ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল এখন আরও ১৯ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হলে মোট ৩৪ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে এই চুক্তি।

চুক্তির যে সমস্ত বিষয় বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হবে, তা হলো ১. আমেরিকা বিনাশুল্কে রপ্তানি করবে, বাংলাদেশের শিল্প ঝুঁকির মুখে পড়বে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই ৪ হাজার ৫০০টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এর মধ্যে রয়েছে গবাদিপশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, বস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও নানা শিল্পপণ্য। এ ছাড়া আরও ১ হাজার ৫৩৯টি পণ্যের শুল্ক চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক কমানো হবে। বাকি অর্ধেক পরবর্তী চার বছরে সমানভাবে কমবে। পঞ্চম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে, এসব পণ্য পুরোপুরি শুল্কমুক্ত হবে। এই বিপুল পরিমাণ শুল্কছাড়ের কারণে, বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পপণ্য আমেরিকার পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। ২. আমেরিকার পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো নীতি প্রয়োগ করতে পারবে না, যাতে সেসব পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে বাংলাদেশকে ছাড় দিতে হবে, আমেরিকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের ক্ষেত্রে। ৩. কৃষি ও জৈবপ্রযুক্তি পণ্যের প্রবেশের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাদ দিতে হবে। এর ফলে বিতর্কিত জেনিটিক্যালি মোডিফায়েড পণ্য আমদানিতে বাধা দেওয়া যাবে না, এমনকি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এমন সতর্কবাণীও লেখা যাবে না। ৪. বাধ্যতামূলক এবং বেশি দামে পণ্য ও যন্ত্রপাতি কিনতে হবে। চুক্তি অনুসারে, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে হবে। আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মার্কিন জ্বালানি, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হবে। সেই সঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলার বা ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষিপণ্য কিনতে হবে। এর মধ্যে গম কিনতে হবে, প্রতিবছর ৭ লাখ টন হারে পাঁচ বছর ধরে। সয়াবিন কিনতে হবে, এক বছরের মধ্যে ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ টন পরিমাণ। এ ছাড়া বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা বাড়াতে হবে এবং অন্য দেশ থেকে কেনা কমাতে হবে। সস্তায় পেলেও, অন্য কোনো দেশ থেকে কেনা যাবে না। ৫. চুক্তি অনুসারে খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও রপ্তানির জন্য আমেরিকার কোম্পানিকে সহযোগিতা করতে হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিকমিউনিকেশন, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে এবং পুঁজি বিনিয়োগে কোনো সীমা আরোপ করা যাবে না। এর ফলে দেশে গ্যাস সংকট থাকলেও,  যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিকে গ্যাস রপ্তানির অনুমোদন দিতে হবে। ৬. চুক্তি অনুসারে,  বাংলাদেশকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবাণিজ্যিক সহায়তা বা অন্য কোনো ধরনের ভর্তুকি প্রদান করা যাবে না। আমেরিকার ব্যবসার স্বার্থ দেখতে গিয়ে,  জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্র কোনো ভর্তুকি দিতে পারবে না। ৭. চুক্তি অনুসারে, আমেরিকা যদি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সীমান্ত বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাংলাদেশকে তাদের সঙ্গে মিল রেখে ‘পরিপূরক বিধিনিষেধ’ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর এমন সফটওয়্যার ব্যবহার সীমিত করতে হবে। আমেরিকা যাকে শত্রু বলবে, সেই দেশকে বাংলাদেশও শত্রু বলতে বাধ্য হবে। ৮. চুক্তিতে এমন সব শর্ত রাখা হয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি বা সমঝোতায় যেতে পারবে না, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যে কেউ একটু ভাবলেই, তার মন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে এ কথা ভেবে যে এই চুক্তি কীভাবে বাংলাদেশকে আমেরিকার কাছে জিম্মি করে ফেলেছে। আজ থেকে ২০ বছর পরে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক কোন ধরনের পরিস্থিতি হবে এ কথা বিবেচনা করলে, এই চুক্তি মেনে নেওয়া যে কোনো মানুষের পক্ষে খুব কঠিন।  ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলায় হামলা এবং ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার কারণে সারা দেশে তেল সংকটে হাহাকার তৈরি হয়েছে। গ্যাসের অভাবে সারকারখানাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে সার কিনতেই হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছে তেল কিনতে পারবে কি না, সেই অনুমতিও এখন আমেরিকার কাছ থেকে নিতে হচ্ছে। ফলে এই চুক্তি শুধু শর্তের বেড়াজালে বাংলাদেশকে বেঁধে ফেলবে তাই নয়, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে পঙ্গু করে দেবে। বামপন্থি রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদের কারণে, ইতিমধ্যে অনেক উপদেষ্টা বলতে শুরু করেছেন যে তাদের না জানিয়েই এই চুক্তি করা হয়েছে। এরা কেউ দায় নেবে না। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণকে, দীর্ঘদিন এই চুক্তির বোঝা বহন করতে হবে। বাজার দখলের জন্য পুঁজিবাদ যুদ্ধ করে। যুদ্ধে অস্ত্র ব্যবসার জন্য যুদ্ধ করে। এ রকম করতে করতে, যুদ্ধ অর্থনীতির চক্রে জড়িয়ে ফেলে বিশ্বকে। যুদ্ধের ক্ষত এবং ধ্বংসলীলা সবাই দেখতে পায়, কিন্তু চুক্তির ফাঁদ সহজে বুঝতে পারা যায় না। এর মারপ্যাঁচে দরিদ্র দেশগুলোতে পরে সেসব দেশের অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ হয়, তা দেখতে পাওয়া যায় না কিন্তু তার বিষে জর্জরিত হয় দেশের জনগণ আর বিষময় ফলভোগ করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। বাংলাদেশ আজ সেই ধরনের চুক্তিতে বাঁধা পড়ে গেল।

একদিকে যুদ্ধের ফলে বিশ্বঅর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানি নির্ভর বাংলাদেশের ওপর এক আকস্মিক বোঝা চেপে বসেছে। তেলের বাড়তি দাম প্রভাব ফেলবে অর্থনীতিতে, শ্রমিকের চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক প্রবাসী শ্রমিকের কাজ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে এইসব বিষয় নিয়ে ভাবছেন সবাই। কিন্তু চুক্তির ফলে রাজনীতি ও অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে (কৃষি, শিল্প, সেবা, আমদানি-রপ্তানি, খনিজ এবং সামুদ্রিক সম্পদ, গবেষণা, সামরিক অস্ত্র কেনাকাটা, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) যে প্রভাব পড়বে, তা থেকে দেশকে মুক্ত করা যাবে কীভাবে? সংসদ চলছে, বিতর্ক চলছে সংবিধান ও সনদ নিয়ে। জনগণ আতঙ্ক ও উত্তেজনার সঙ্গে লক্ষ করছে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি। কিন্তু দেশের সঙ্গে চুক্তির নামে নীরব ও দীর্ঘস্থায়ী যে একতরফা যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলো,  সে ব্যাপারে আলোচনা এখনো দেখা যাচ্ছে না। সময় যত যাবে, চুক্তির ফাঁদ তত গভীরভাবে এঁটে বসবে দেশের গলায়। এখনই প্রয়োজন প্রতিরোধ এবং প্রতিকার। 

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত