একগুচ্ছ বৈশাখী ঝড়

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৯ এএম

ফারুক মাহমুদ

ঝড়েপড়া বীজের বয়ান

 

আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে...

 

নিতে নিতে দূরে কিংবা কাছে

ঢিবি, সমতল, মাঠ, বন-উপবনে

ছেড়ে দেবে। আরও কিছু দূর

যাওয়া হলে দেখতে পেতাম

অধিক বিপুল বস্তু, দৃশ্য, ছায়াশান্তি...

 

এখন যা আছি, আছে মাটির আঁচল

জলগন্ধ। টের পাই মৃদুঅণুতাপ

হয়েছি অঙ্কুরশিশু, চারাগাছ, বৃক্ষ

ফুলের সৌরভগাথা, ফলের উল্লাস

 

হে ঝড়, তোমাকে ধন্যবাদ

পিয়াস মজিদ

তোমার কথারা

 

তুমি কোনো কথা বলতে চাচ্ছিলে

 

কথার গায়ে কুয়াশা এসে পড়ছে

 

এর আগে পড়েছিল রোদ

এরও আগে মেঘ

তার আগে ছায়া

তারও আগে ঝড়

এবং বৃষ্টিও।

 

আমার কাছে আসতে আসতে

তোমার কথাটা ঢাকা পড়ে গেল

ঋতুচক্রের আবর্তনে।

 

নাকি তুমি

ঋতুচক্রের আবর্তনের কথাই

বলতে এসেছিলে আমাকে?

লোপা মমতাজ

এ শহরে ঝড় আসে

 

আমি মফস্বলের মেয়ে—

আমার কাছে ঝড় মানে হাওয়ার খেলা,

মাটির উঠানে বৃষ্টির গন্ধ,

আর মায়ের সেই চেনা ডাক—

‘হাওয়া ঢুকতেছে, বান্দর মাইয়া,

ঘরে আইয়া দরজাটা লাগা।’

এ শহরে ঝড় আসে—

আবহাওয়া অফিস তা জানে।

অভিজ্ঞ চোখ মানচিত্রে আগেই

তার পথ এঁকে রাখে,

তবু দালানগুলো চুপচাপ দীর্ঘশ্বাস ফেলে,

কাঁচের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটা

অচেনা এক সুর তোলে—

অবেলায়, একা।

রাস্তায় উপড়ে পড়ে থাকে দু’একটা গাছ,

গাড়ির হেডলাইটগুলো

অন্ধের মতো পথ খোঁজে,

আলো আছে, মানুষ আছে—

তবুও চারপাশে জমে ওঠে অদৃশ্য অন্ধকার।

এ শহরে ঝড় আসে,

তার ছাঁট চুইয়ে পড়ে শহরের মরা খালে।

অভ্যস্ত দিনের শেষে,

ক্লান্ত মানুষের

দরজাগুলো বন্ধ হয় নিঃশব্দে,

ব্যক্তিগত সুরে।

আমি মফস্বলের মেয়ে—

দাঁড়িয়ে থাকি দুই প্রান্তের মাঝখানে,

শহরের ভেতর থেকেও

মফস্বলী মন নিয়ে

নিজের ভেতরে ডুবে যাই—

ধীরে, আরও ধীরে।

জুয়েল মাজহার

দু-তিন পেগের পর

 

রক্তাল্প-শরীরে শুধু হাড়হাড্ডি খটাং খটাং

 

তবু ভাবি, কৃশ দেহ আঁশে ঢেকে

ঢুকে পড়ব মাছের পাড়ায়

 

দু-তিন পেগের পর—

আমার তালাশে, দেখি, স্বয়ম্বরা রাত্রি এসেছেন

দেখি, তারও সারা গায়ে ঝলমলাচ্ছে আঁশ!

 

বোঝা গেল, তিনি হর্নি—

তদুপরি  নিষ্পোশাক,

লেজ নেড়ে আমাকে ডাকছেন

 

সে-সুবাদে—

টানা তিন মাছপ্রহর তার সঙ্গে আমোদপ্রমোদ

 

সারা রাত ‘কানু কহে, রাই’

গ্রামোফোনে সারা রাত কমলা ঝরিয়া

 

খিড়কিপথে অপলক বৈশাখের গোলচক্ষু মেঘ আর

                        দরজার আড়ালে রাক্ষস

 

বিধবার হাসি যেন

জানালার পাশে ভাটফুল

ঝরে পড়ছে হায়াসিন্থ-জলে টুপটাপ

 

ঝরে পড়ছে মেঘমাংস

আঁশে ছাওয়া মেঘের আধুলি ঝমঝম

 

ছমছম অন্ধকারে পথে-পথে তুমি কি তখন

              বসে থাকবে জলসত্র খুলে?

 

ক্ষত থেকে রক্ত ধুয়ে দিতে

মেঘেদের কলপাড়ে ঘড়া-হাতে থাকবে দাঁড়িয়ে?

 

তুমিও কি চাও—

ছাদ ভাসিয়ে বৃষ্টি হোক, তীব্র হোক স্নান?

 

আঁশ ঝরিয়ে তখন আমিও

অহিংস পেরেকসহ তোমার ভেতরে যাব—চুপ!

শফিক ইমতিয়াজ

ঝড়

 

এই রোদগন্ধ বৈশাখে কত না ঝড় এসে ছুঁয়েছে চাতাল

আম কুড়োবার তুমুল হুল্লোড়ে

একদিন কুড়িয়ে পেলাম তোর জ্যোৎস্নাঝরা চোখ!

মনে পড়ে, আমাদের মগ্ন ভাষা বিনিময়ে থেমে যেত ঝড়?

হৃদয়ে উষ্ণবরফ : একাকী বিহঙ্গঝাপে ঊর্মিদোল দীঘি!

 

একদিন ডালভাঙা ঝড়

তুই ও পড়শীরা স্বভাবত ছুটে গেলি মুখর আমবাগানে

শুধু আমি এক অবাধ্য কিশোর

সব চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্য এক দুরন্ত ঝড়ের টানে

দলছুট চলে যাই লোকালয় ছেড়ে।

রোশনারা

জানি, বেদনা-বিস্ময়ে আমাকে যে কত খুঁজেছিলি!

 

কোনো কোনো ঝড় মুছে দেয় কিশোর ও যুবকের ভেদ

বয়সের অনেক আগেই দেহমন প্রাজ্ঞ করে তোলে

কোনো কোনো ঝড় বরাভয়ে হাতে তুলে দেয় আগ্নেয়াস্ত্র

দানবের দাঁতাল দম্ভের ডেরা ভেঙে দিতে।

 

জানিস, ট্রিগারে হাত রেখেও তোকে ভুলিনি

ভাবতাম, দেশ মুক্ত হলে তোর বধুগন্ধ শাড়ির আঁচলে

আমার কুড়িয়ে পাওয়া সব আম তুলে দেব।

 

আজও তোকে তন্ন তন্ন খুঁজি রোশনারা

এই ঝড়ক্লিষ্ট বিরান চাতালে আমার যে ডানা ভেঙে যায়!

তপন বাগচী

জ্বলন্ত নিদাঘ শেষে

 

বরুণ গাছের নিচে একদিন মেলা বসেছিল

জ্বলন্ত নিদাঘ শেষে পড়ন্ত বিকেলে

হাতে তুলে নিয়েছিলে মিষ্টি খিলি পান

অনভ্যস্ত মুখে যেন দিল সুধা ঢেলে।

 

হাঁটুতে বড়শি-ফোঁড়া সাধুর চড়ক

এখনো মায়ার বশে ঘোরায় নিয়ত

এখনো জিভের স্বাদে গাঁথা আছে ঝাল চানাচুর

কদমা-বাতাসা দিয়ে পার করি কাল-সন্ধ্যাব্রত।

 

পাতার বাঁশিরা গায় বেসুরো রাগিণী

বানরের নৃত্যকলা, ডুগডুগি বাজে

লাফ দিয়ে পার হয় ক্ষীরের সাগর

এইসব টুকে রাখি স্মৃতির দেরাজে।

 

নির্মেঘ আকাশ থেকে নেমে আসে দূরের অশনি

আচানক ঘূর্ণিবাত্যা মুছে দেয় বিগত কালিমা

জয়ডঙ্কা ডেকে আনে বজ্র ও বিদ্যুৎ

দুই চোখে মেপে রাখি দৃষ্টি পরিসীমা।

নিজাম বিশ্বাস

বজ্রপাতের রাতে

 

এক রাতে, ঝড়ো রাতে, বজ্রপাতে

দৃশ্যমান হলো তার মুখ—

আমার হারানো বিড়ালের মুখ,

অন্ধকারে সে আমার মুখপানে চেয়ে আছে

কতকাল পরে তার মানুষের কথা এলো মনে

 

তার চোখ দুটো যেন শিলাবৃষ্টি

আছড়ে পড়ল বারান্দায়,

এ অন্দর তারই আজও, তার ঘর, তার বিছানায়

ফুল তোলা কুশনে এখনো তারই গন্ধ

লেগে আছে পরম যতনে—আসো, আসো বিড়ালিনী...

 

সেই রাতে, ঝড়ো রাতে, চোখের ভয়াল বজ্রপাতে—

মুহূর্তে বদলে গেল চেনা পথ-ঘাট,

উপড়ে পড়ল শতবর্ষী গাছ,

ইঞ্জিনের নৌকা পথ ভুলে চলে গেল দূর দরিয়ায়—

সময়ে ঘুচেছে ক্রোধ, ম্রিয়মাণ হলো

বাতাসের গতি, শান্ত উপকূল,

গভীর কোমার ঘুম ভেঙে

অবশেষে আমাদের হলো দেখা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত