ভাবনা-দুর্ভাবনার নববর্ষ

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৬ এএম

বাংলা নববর্ষ এলে যেখানে বিগত দিনের অর্জন, বিসর্জন আর ভবিষ্যৎ-সম্ভাবনার হিসাব মেলানোর কথা, সেই জায়গায় এখন কী নামে নববর্ষ উদ্যাপিত হবে তা নিয়ে তর্কবিতর্ক শুরু হয়ে যায়। যেন নববর্ষকে বিশেষ কোনো নামে উদ্যাপনের মধ্যেই আমাদের ভবিষ্যতের কল্যাণ নিহিত। তা-ও এই উদ্যাপন যদি যথা-অর্থে দায়পালন বা দায়পূরণের জন্য হতো, তাহলে হয়তো তা মেনে নেওয়া যেত, কিন্তু এখানে দায়টা সারা হয় মাত্র, আর বাকি সব নানা রকম প্রদর্শনী ছাড়া কিছু নয়। তার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়ার কথা না ভেবে, সাময়িক আনন্দ উপভোগের জন্য আমরা তা মেনেও নিই।

দেখলাম এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে, না আনন্দ শোভাযাত্রা, তা নিয়ে কথা উঠেছে; এখন শুনছি বিশাখা নক্ষত্রজাত মাসের নাম বৈশাখের সূত্র ধরে বৈশাখী শোভাযাত্রা হবে। এই মুহূর্তে ‘মঙ্গল’, ‘আনন্দ’ বা ‘বৈশাখী’—এই তিন শব্দের যেকোনো একটি দিয়ে তা উদ্যাপন করলে বা না-করলে আমাদের কী এমন উপকার বা অপকার হবে তা জানি না। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নাম স্থাপন-পুনঃস্থাপনের কাজে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বৃহত্তর জীবনাদর্শের চিন্তা না-করে কোনো-একটি বিশেষ আদর্শের ছদ্মাবরণে রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়নের চেষ্টাটাই করে গেছেন। শব্দার্থের দর্শন, শব্দ ও অর্থের চরিত্র বা প্রকৃতি বিষয়ে অনুসন্ধানের ধৈর্য আর যাচাই-বাছাইয়ের উন্নত রুচি তাদের ছিল না। একটি শব্দ হাজার বছর ব্যবহারের পরে একটি নির্দিষ্ট অর্থ ধারণ করে একসময় ‘প্রতীক’-এ পরিণত হয়, এ কথা যেমন সত্য, তেমনই এই কথাটাও বিশেষভাবে মনে রাখতে হয় যে, কোনো যুগজয়ী প্রতিভার আবির্ভাবে বা কোনো বিশেষ সময়ের আলোড়ন ও তৎপরতার প্রভাবে কখনো কখনো সেই শব্দটিও নতুন অর্থ ধারণ করে। তাই নাম নিয়ে এইসব তর্কে লিপ্ত না হয়ে আমাদের উচিত ছিল বৃহৎ জনগোষ্ঠী-থেকে-বিচ্ছিন্ন এই উদ্যাপনকে একটি সার্বভৌম/যৌথযাপনের উৎসবে পরিণত করবার কথা ভাবা। এখানে এই কথাটি স্পষ্ট করে নেওয়া ভালো যে, যৌথযাপনের উৎসবকে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের উৎসব বলে ধর্মীয় তকমায় চিহ্নিত না-করে সবার উৎসবরূপে চিহ্নিত করা ভালো, এতে নাগরিক মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা যেমন থাকবে, তেমনই থাকবে কৃষক-শ্রমিকসহ সব শ্রেণির সুখ-দুঃখের কথাও। অর্থাৎ নববর্ষ উদ্যাপনের নয় শুধু, এটি যৌথযাপনের উৎসবও।

এ কথা মনে রাখলে নানারকম আশঙ্কার কারণে উৎসবের আনন্দে কিছুটা বিষাদের ছায়াও পড়বে। অর্থাৎ শোভাযাত্রায় লাঙল, জোয়াল, ঢেঁকি, প্রভৃতি ঐতিহ্য-উপকরণ যদি থাকে, তাহলে, তাতে, কৃষকের ফসলহানির দুর্ভাবনার কথাও থাকবে। বাস্তবে তা-ই তো হওয়ার কথা। কারণ বাংলা নববর্ষের প্রতিষ্ঠার পেছনে ফসলের সম্পর্ক ওতপ্রোত, এর জন্য একে ফসলি সন বলেও অভিহিত করা হয়। সেই সময়কার প্রথা অনুযায়ী ফসলের মাধ্যমেই যেহেতু রাজকর পরিশোধ করা হতো, তাই এই সন প্রবর্তনের পেছনে ফসল উৎপাদনের ঋতুর কথা বিশেষভাবে মাথায় রেখেছিলেন সম্রাট আকবর। এখন আর সেই সময় নেই। যারা সম্পন্ন কৃষক, তারা প্রতিবছর ফসল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করলেও এখান থেকেই যে তাদের কর দিতে হয় এমন নয়; কিন্তু যারা নিম্নআয়ের কৃষক, তাদের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই ফসল ফলাতে হয়, কিন্তু সেই বছরই ঋণ পরিশোধ করতে পারবে কি না, এমন আশঙ্কায় তাদের দিন কাটাতে হয়। ফসল তুলতে পারলে তো ভালো, নাহলে সেই ঋণের দায়ে তাদের কখনো কখনো সর্বস্বান্তও হতে হয়। আগের বছরের হিসাবের খাতাকে হালনাগাদ করার প্রথা নগরজীবনে কমে গেলেও গ্রামজীবনে এখনো তা মানা হয়, কিন্তু ঘরে ফসল তুলতে না পারলে কৃষকরা বাকির খাতার হিসাব পরিশোধ করবে কীভাবে?

এবারও পহেলা বৈশাখে যখন নববর্ষ উদ্যাপিত হওয়ার কথা, তার আগে, এই চৈত্র মাসে প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তার খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। এ কারণে এ বছর ভাটির কৃষকরা বৈশাখী ধান তুলতে পারবে কি না, তা নিয়ে সেই দুর্ভাবনাতাড়িত সচেতন নাগরিকদের প্রতিবাদও লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশের জায়গায় জায়গায় যখন শোভাযাত্রার আয়োজনসহ নববর্ষ উদ্যাপনের তোড়জোড় চলছে, তখন, গত ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে (দৈনিক আজকের পত্রিকা-য় প্রকাশিত) সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা’র উদ্যোগে যে মানববন্ধন হয়েছে, তাতে মূল বক্তাদের বক্তব্যের সারকথা হলো : ‘কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় অর্ধশত হাওরের অন্তত ২ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব জমির কাঁচা ধানগাছে পচন ধরেছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না।’ পহেলা বৈশাখে এই লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে, তার আগে আরও বৃষ্টি হলে তলিয়ে যেতে পারে সুনামগঞ্জের ছোট-বড় শতাধিক হাওরের বোরো ফসল। আমরা চাই না প্রকৃতি বিরূপ হোক, কিন্তু বাস্তবে যদি তা-ই হয়, তাহলে, তখন নববর্ষ উদ্যাপনের মধ্যে কী তাৎপর্য আমরা খুঁজে পাব জানি না। তখন আমাদের শোভাযাত্রা—‘মঙ্গল’-‘আনন্দ’ বা ‘বৈশাখী’ যে-নামেই উদ্যাপিত হোক না কেন—তা জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হবে, আর আমাদের কৃষি-ঐতিহ্যের প্রদশির্ত প্রতীকগুলোতেও ফুটে উঠবে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের নঞর্থক ব্যঞ্জনা।

এগুলো আমাদের প্রায়-প্রতিবছরেরই চিত্র। ২০২২ সালের ১৭ এপ্রিল, অর্থাৎ বাংলা নববর্ষের তিন দিন পর দৈনিক প্রথম আলো-য় এই লেখকেরই একটি কলাম ছাপা হয় যার শিরোনাম ছিল : ‘হাওরে ফসলহানি: বিপর্যয়ের আগে কেন টনক নড়ে না’। এই লেখা প্রকাশের আগে ও পরে চৈত্র-বৈশাখের হাওরের একমাত্র বোরো ফসল রক্ষায় যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা যথানিয়মে বাস্তবায়িত হয়নি, সেইসব অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয়নি, তাই আজও কৃষকের ফসল তোলার ক্ষেত্রে কোনো নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। অথচ দীর্ঘকালের এই সমস্যার কথা আগে থেকেই তুলে ধরা হয়েছে, তার প্রতিবাদও কম হয়নি। এইসব জীবন-মরণের সমস্যা সমাধানের জন্য ভাটিবাংলার প্রতিনিধি বাউল শাহ আবদুল করিম এক সময় যে-সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার নাম ছিল ‘বাঁচতে চাই’। সংগঠনের লক্ষ্য ছিল, কীভাবে কোনোরকমে জীবন ধারণ করা যায় সেই কথাগুলো বলা এবং সেই অধিকার আদায়ের জন্য চেষ্টা করা। নববর্ষ নবীন বেশে বঞ্চিত কৃষকদের জীবনেও আসে, কীভাবে আসে, তিন দশক আগে তার ভাটির চিঠি বইয়ে তিনি তা লিখেওছিলেন:

চৈত্রের শেষে নবীন বেশে আসে বৈশাখ মাস।

ধনী গরিব সবার মনে আনন্দ উল্লাস ॥

একটি ফসল মাত্র ভাটি এলাকার।

কৃষক সকলেরই মজুর দরকার ॥

এইসময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়।

এলাকাবাসী তখন আতঙ্কিত রয় ॥

কৃষক সবাই তখন এই চেষ্টা করে।

তাড়াতাড়ি ফসল তুলে নিতে চায় ঘরে ॥

কিন্তু বাস্তব হলো, ফসল তোলার আগে ঝড়-বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যায় ধান, তখন নবীন বেশে আসা নববর্ষ বৈশাখের আনন্দ আর থাকে না। তার অন্য একটি গানে আছে, সবই যখন আশা নিয়ে ধান তোলার অপেক্ষায়, নতুন দিন, নতুন গান আর নতুন বাণীর অপেক্ষায়, তখন ফসলহানির আশঙ্কায় পেরেশানি শুরু হয় এবং একসময় দেখা যায় ‘হাড়ভাঙা খাটুনির বদলে জমিতে যে ফসল ফলে’, তা শিলাবৃষ্টি আর বন্যার পানিতে সমূলে বিনাশ হয়ে যায়। হেমাঙ্গ বিশ^াস বলতেন, ধানই তাকে গান দিয়েছে। আসলে ভাটির জীবনে ঘরে ধান না-উঠলে বাকি ছয় মাসের জীবনে আর আনন্দ থাকে না। গান থাকে না। লোকউৎসব আর লোকক্রীড়ায় প্রাণও থাকে না। এসব কথা শুধু বাউল শাহ আবদুল করিমের গানেই নয়, হাওরাঞ্চলের অন্য বাউল-ফকিরদের গানেও রয়েছে। ফকির সমছুলের একাধিক গানে বৈশাখী তোলার পর ভাটির মানুষের মনে যে আনন্দ হয়, উৎসবের আমেজ তৈরি হয়, সেসব কথা আছে, কিন্তু সেই সঙ্গে রয়েছে আশঙ্কার কথাও, আছে সাল ও মাস উল্লেখ করে বলা এইসব ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথাও :

১৪২৩ বাংলা, চৈত্র মাসের মধ্যবেলা

সারা সুনামগঞ্জ জেলা, পানির উপর ভাসে,

সাথে সাথে ঝড় তুফান,

হাওরের বান পড়িল খসে ॥

বাঁধ ভাঙ্গিয়া ঢুকল পানি, হইয়া মানুষ পেরেশানি,

চিন্তা করে দিন-রজনী আপন ঘরে বসে।

পুরান ধান বিক্রি করল,

নতুন ধান পাইবার আশে ॥

কৃষকদের এইসব আশঙ্কার কথা—বলা উচিত জীবন-মরণ সমস্যার কথা—বাদ দিয়ে উৎসব যে অর্থহীনতায় পর্যবষিত হয়, তা হাওরাঞ্চলের মানুষের বৈশাখযাপন না দেখলে বোঝা যাবে না। এখানে এইসব কথা বলার কারণ, এই দুই বিষয়েই ভূমিকা রাখার অধিকার সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। হাওরের এইসব ধান নষ্ট হয়ে গেলে পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা দেশের মানুষের অর্ধেক মাসের খাবারও পানির নিচে তলিয়ে যায়, তাই সেই বিষয়ে সরকারেরই তো বেশি দুর্ভাবনা থাকবার কথা। এমন দুর্ভাবনা থাকলে কোনো উৎসবেই আর আনন্দ থাকে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মানুষের উৎসব সেদিন, যেদিন মানুষ একত্র হয়ে বড় হতে পারে, ‘মনুষ্যের শক্তি’ অনুভব করে মহৎ হতে পারে; প্রাত্যহিক প্রয়োজনে, সাংসারিক সুখ-দুঃখের কারণে আমরা যখন ‘ক্ষুব্ধ’ হই, তখন উৎসব আর উৎসব থাকে না।

দেশের এইসব জীবন-মরণ সমস্যা শেষ হলে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা যাবে। আপাতত এই কথাটি বলে লেখাটি শেষ করতে চাই যে, ভবিষ্যতে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনেরই শিরোনাম অন্য ভাষায়, বিশেষত ইংরেজি ভাষার কোনো শব্দ বা শব্দবন্ধে রাখতে হয় কি না, সেই দুর্ভাবনার কথাটিও এখানে উত্থাপন করতে চাই—দেশের প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা ও শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যম ও পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করলে এই কথাটির বাস্তবতা উপলব্ধি করা যাবে।

তাই নববর্ষ ঘনিয়ে এলে অনেকেই যখন উৎসবের নাম কী হবে সেই তর্কে লিপ্ত, আমরা তখনো মন থেকে এইসব দুর্ভাবনা সরাতে পারি না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত