সংস্কৃতিই আত্মশক্তি

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

সংস্কৃতি কোনো পারফরম্যান্সনির্ভর বিষয় নয়, কোনো প্রদর্শনী নয়, কিংবা বাঁধাধরা বুলি বা আচার সমষ্টিও নয়। এর অন্তর্নিহিত অর্থ জীবনের বিস্তৃত রেখায়—দেখা ও অদেখার ভেতর প্রকাশ পায়। পুরো বিষয়টি আত্মম্ভরিতার নয়, আত্মস্থতার। পৃথিবীর কোনো জাতির সংস্কৃতি খাটো বা বড় নয়; লিখিত ইতিহাসেরও আগে এর সূচনা। যেমন—কোনো শিল্প-অভিব্যক্তির পেছনে তার নির্মাণের দীর্ঘ ইতিহাস রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকে।

এসব ভাবতে গেলে মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস আসে। কখন আমরা উপলব্ধির জায়গা থেকে সরে এসে একটি পারফরম্যান্সকেন্দ্রিক জাতিতে পরিণত হলাম? শুধুই দৃশ্যকেন্দ্রিক উদ্ভাসন! যেন কিছু বণিক মানসিকতার মানুষ সবকিছুকে বাণিজ্যে রূপান্তর করে ফেলেছে। সবই এখন স্বল্পমেয়াদি ম্যানিফেস্টেশন। আত্মপরিচয়ের দীর্ঘমেয়াদি রেখার কথা কেউ কেউ ভাবলেও তা বাস্তবায়নের সুযোগ পান না। কাজের রসদের অভাব যেমন আছে, তেমনি নিয়ন্ত্রকদের রাজনৈতিক অনীহাও রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও পিছিয়ে আছে।

আমি বহুদিন ধরেই বিলেতে প্রবাসী। বিদেশে বসবাস কোনো স্ট্যাটাস নয়, তবে ব্যক্তিক, পারিবারিক ও সামষ্টিক পর্যায়ে এটি এক ধরনের সুযোগ এনে দেয়—নিজ দেশের সাংস্কৃতিক ইমেজ তুলে ধরার সুযোগ। এক অর্থে অনারারি দূত হওয়া যায়। দেশের শক্তিগুলো তুলে ধরা যায়, আবার দূর থেকে তার শক্তি ও দুর্বলতা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। বিদেশে গেলে দেশের জন্য দায়িত্ব কেউ চাপিয়ে দেয় না—তা নিজে থেকেই অনুভূত হয়।

কেউ তা পালন করে, কেউ করে না। আমি নিজেকে প্রথম দলের বলে ভাবতে চাই। তবে আমি একা নই; আমাদের মতো মানুষের সংখ্যা কমও নয়।

সম্ভবত সে কারণেই দেশে যখন আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি সংকটে পড়েছে, বিদেশে তার বিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে বিলেতে আমরা নিরন্তর বৈশাখী মেলার আয়োজন করে আসছি। পৃথিবীর নানা দেশে একই আকুতি ও অধ্যবসায়ের ফলে এ আয়োজন বিস্তৃত হয়েছে। বৈশাখী কর্মকাণ্ডের সময়সীমাও আর সীমাবদ্ধ নেই। ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে লন্ডনে একবার শ্রাবণ মাসেও বৈশাখী মেলা আয়োজন করা হয়েছে। আঠারো বছর ধরে অনুষ্ঠিত ‘বৈশাখী মেলা’ এখন একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত।

প্রবাসে বাংলাদেশের মনন ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে একুশে ফেব্রুয়ারি, চৈত্রসংক্রান্তি, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের উৎসব নিয়মিত পালিত হচ্ছে। দেশের নীতিনির্ধারকরা যদি এই উদ্যোগগুলোর তাৎপর্য উপলব্ধি করে অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রার নাম ও ব্যাখ্যা অযথা পরিবর্তন না করতেন, তবে তা আরও সুদৃঢ় হতো। যেমন—বিলেতের সেকেন্ডারি স্কুল কারিকুলামে ‘বিজয়ফুল’ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অভিবাসীদের উদ্যোগ থেকেই গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ করে এ কাজটি করেছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, যার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে ২৪ এপ্রিল।

সংস্কৃতি উদযাপন কীভাবে পারফরম্যান্সনির্ভরতা কাটিয়ে গভীর উপলব্ধির দুয়ার খুলে দিতে পারে, তার একটি উদাহরণ রিকশা। রিকশার অনন্য শিল্প আমাদের এক মূল্যবান সম্পদ। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে আমরা অনেক কাজ করতে পারি। এ ক্ষেত্রে বিবি রাসেলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। বাংলা নববর্ষকে ঘিরে দেশে-বিদেশে স্কুলে, পাড়ায়, প্রাঙ্গণে রিকশা নির্মাণ, এর শিল্প, রঙ, নকশা, শিল্পীর বিবর্তন নিয়ে কর্মশালা হতে পারে। রিকশাচালকদের জীবন, সমাজ, প্রেম, সাহিত্য, চলচ্চিত্র—সবকিছু মিলিয়ে স্তরে স্তরে কাজ করা যেতে পারে। বৈশাখের আগে অন্তত ছয় সপ্তাহ ধরে পাঠ, চর্চা ও আনন্দের মধ্য দিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে শেষে শোভাযাত্রায় তা উপস্থাপন করা যেত। প্রতি বছর ভিন্ন থিম থাকলে সংস্কৃতির প্রভাব আরও গভীর হতো।

একবার দেখেছিলাম, শুধু গিনেস বুক অব রেকর্ডে ওঠার জন্য শত শত মানুষ নিয়ে বিশাল পতাকার কোরিওগ্রাফি করা হলো। কিন্তু লাখো মানুষের হাতে পতাকা ধরিয়ে গান গাইলেই কি দেশপ্রেম জাগে? যদি তার আগে তিন মাস ধরে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের বাণী, উচ্চারণ, সুর, চিত্রকল্প এবং এর ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা হতো, তবে ১৬ ডিসেম্বরের সেই আয়োজন ভিন্ন মাত্রা পেত। এতে অসংখ্য শিক্ষক, প্রশিক্ষক, শিল্পী ও সাহিত্যিক যুক্ত হতে পারতেন।

ইংল্যান্ড একটি বহুজাতিক কর্মকাণ্ডসমৃদ্ধ দেশ, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র পূর্ব লন্ডন। নিউহাম ও টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার বহুমাত্রিক সংস্কৃতির কারণেই লন্ডন ২০১২ সালের অলিম্পিকের আয়োজক হওয়ার সুযোগ পায়। আমি টাওয়ার হ্যামলেটসে থাকি, যেখানে ৫৫% মানুষ এশীয় ও কৃষ্ণাঙ্গ; তাদের মধ্যে ৩২% বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। এদের মধ্যে অনেকেই আমার মতো জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। তাই এখানে বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী ও বৈশাখী মেলার মতো আয়োজন জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

আমার দ্বিভাষিক ও দ্বিজাতিক কাজের ধারায় আমি সবসময় কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্যের সংযোগ তুলে ধরার চেষ্টা করি—হোক তা সংগঠন, বক্তৃতা, লেখা, কবিতা বা গল্প বলা। কারণ বাংলাই আমার আত্মধাম, বাংলাই আমার শক্তি।

তবে একা কেউ সফল হয় না। একটি শুভ উদ্যোগের বিকাশের জন্য প্রয়োজন সৎ ও সচেতন মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস। এর সঙ্গে প্রয়োজন স্থানীয় রাজনীতির সহায়তা। সামাজিক আন্দোলন কোনো দান নয়, ন্যায্যতার দাবি করে। তাই স্থানীয় রাজনীতিক, নেতা, শিল্পী ও লেখক—সবার ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ।

নব্বইয়ের দশকে শিক্ষকতা করতে বিলেতে আসি। তখন প্রবাসী বাঙালিদের ‘প্রবাসপিতা’ নামে পরিচিত তসাদ্দুক আহমেদ আমাকে বিভিন্ন মূলধারার স্কুলে নিয়ে যান, যেগুলোর নাম ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘শাপলা’, ‘কাজী নজরুল’, ‘ওসমানী’ ইত্যাদি। ব্রিক লেনে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় লেখা দেখে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। পরে আমি নিজেও জড়িয়ে পড়ি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। বাংলাদেশ বিশ^সাহিত্য কেন্দ্রের প্রেরণায় লন্ডনে প্রতিষ্ঠা করি বিশ^সাহিত্য কেন্দ্র এবং শুরু করি ‘বইলিট’ (বৈশাখী সাহিত্য উৎসব)। সেখানে বাংলা ও বিশ^সাহিত্যভিত্তিক নানা আয়োজন হতো—নাটক, কর্মশালা, প্রদর্শনী, গল্প বলা, আলোচনা ইত্যাদি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের বছরব্যাপী কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেনে একটি ম্যুরাল উদ্বোধন এবং হোয়াইটচ্যাপেল স্টেশনে বাংলা নামফলক উন্মোচনের মাধ্যমে। ম্যুরালে বাংলাদেশের নৌকা, মাঝি, চা-বাগান ও সিলেটের ঐতিহাসিক কীন ব্রিজের ছবি স্থান পেয়েছে। আমি ভাবি, শত বছর পরও যদি সবকিছু বদলে যায়, তবু এই বাংলা অক্ষর দেখে কেউ বুঝবে—এখানে একসময় বাংলাদেশিদের বসতি ছিল।

লন্ডনের বৈশাখী মেলা শুধু বাঙালিদের জন্য নয়; বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মিলনস্থল। তাই এটি এখন এক বহুমাত্রিক পরিচয় বহন করে। এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা ভাষার উৎসব নয়—এটি সর্বজনীন। এই মেলা সম্প্রীতির প্রতীক, যা আমাদের বিভাজন থেকে মুক্তির পথ দেখায়। প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখাই এর অন্যতম লক্ষ্য। গত কয়েক বছরে নানা কারণে মেলাটি আগের মতো বড় পরিসরে হয়নি। আগে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় এটি আরও ব্যাপকভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে আবারও সেই পরিসরে ফিরে আসতে পারে। আর না হলেও ক্ষতি নেই—সময়ের দাবি এটি পূরণ করেছে, সেটাই বড় কথা।

লেখক: কবি ও সস্কৃতিকর্মী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত