বৈশাখে সূর্য বন্দনা

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৯ এএম

বৈশাখ মানেই খরতাপ, বৈশাখ মানেই তাপপ্রবাহ, আবার বৈশাখ মানে তাপহরা কালবোশেখির ঝড়ঝঞ্ঝা, আবার ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন করে যোগ-বিয়োগের, হিসাব মেলানোর পালা। সে জন্য বাংলা বর্ষের এই প্রথম মাসটা এদেশের মানুষের জীবনে এক ধরনের নতুনত্ব, এক ধরনের আশা-ভরসার উদ্যম ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে বৈকি। কিন্তু বৈশাখের এই নতুন করে শুরু করার পেছনে যে নক্ষত্রটির অবদান সবচেয়ে বেশি সে আমাদের সূর্য। লক্ষ-কোটি নক্ষত্রের মধ্যে আমাদের সীমিত জ্ঞানে বলতে পারি এই একটি নক্ষত্রের পরিবারে রয়েছে পৃথ্বী নামের একটি গ্রহ যেখানে অন্য কোটি জীবনের সঙ্গে হুটোপুটি করে বাস করছে মানুষ নামের একটি জীবন। এবং আমাদের সীমিত জ্ঞানে এই একটি গ্রহেই পরিবারের জনক নক্ষত্রের তাপমাত্রার সুষম বণ্টনে বেঁচে থাকে এতসব প্রাণ।

তাপের রকমফেরে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে মানুষের সঙ্গে বেবাক জীবজন্তু, গাছপালা, পশুপাখি আর সুফলা বিশ্ব পরিবর্তিত হতে পারে তার অন্যান্য সহদোরার মতো স্তব্ধ, বিরান, শীতল একটি গ্রহে। এজন্য পূজাপাট্যলাভের অধিকার আসলেই যদি কারও থাকে তো সে আমাদের এই দিনকে দিনের জীবনদায়ী নক্ষত্রটির। আদিমকালের মানুষেরা হয়তো সূর্যের এই বিপুল সৃষ্টি শক্তি দেখে, সুফলা বিশ্বের জন্য তাকে এককভাবে অপরিহার্য ভেবেই তাকে ডেকেছে বিভিন্ন গালভরা নামে, করেছে তার পূজা, শীতে দেখেছে তার ক্ষয়, গ্রীষ্মে বৃদ্ধি। তাকে ক্ষয়ে যেতে দেখে পেয়েছে ভয়, আর বৃদ্ধি পেতে দেখে হয়েছে উৎফুল্ল, আশ্বস্ত।

স্বাভাবিকভাবে সূর্যের প্রভাব পড়েছে শিল্প-সাহিত্যেও। শিল্পীরা যে কত নামে তাকে ডেকেছে, কত রূপে তাকে এঁকেছে, কত ভঙ্গিতে, কত সুরে তানে তার বন্দনা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। বিশ্বের তাবৎ কাব্যমহাকাব্যে এই সূর্য এসেছে এক জীবনদায়িনী প্রতীক হিসেবে। এখানে আমি একটি আধুনিক মহাকাব্যের কথাই বলব যা শুরু থেকে শেষতক বাঁধা সূর্য প্রতীকে। আলো, উজ্জ্বলতা, রঙ আর তপ্ত জীবনের উপমা উৎপ্রেক্ষার এমন বিচিত্র সমাহার এককভাবে আর একটি কাব্যে দেখা যায় কি না তা আমার জানা নেই। এই মহাকাব্য গ্রিক সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি অডিসির উত্তরকান্ড। কবি নিকোস কাজানজাকিস। হোমারের কাহিনিকেই তিনি বুনেছেন তিনগুণ ঢাউস আকারে। এই মহাকাব্যের শুরুতে যেমন সৌর বন্দনা, শেষেও তেমনি সরাসরি একটি অভিমানী চরিত্র হিসেবে সূর্যের আবির্ভাব। 

সূর্য নিয়ে এত কথা কারণ বৈশাখ মাসটা সুরুজেরই মাস। তার উজ্জ্বলতা, তার দারুণ অগ্নিবাণ, তার দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখি এই মাসেই। আবার এ মাসেই অবধারিতভাবে আসে ঝড়ঝঞ্ঝা, কালবোশেখি, বজ্রবিদ্যুৎ, চকিত চিকুর। বছরের শুরুটাই যে জাতির জন্য এমন দুরন্ত, দুর্দান্ত তার যত জড়া, ক্ষয়, নষ্টামি, ধূর্তামি, অনৈতিকতা সব উড়ে যাক, ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাক—এমন প্রার্থনা তো প্রতিবছরের মতো এ বছরও করাই যায়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত