মা-বাবার দোয়া শ্রেষ্ঠ সম্পদ

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৭ এএম

গত শুক্রবার মসজিদে হারামের জুমার খুতবায় শায়খ ড. সালেহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হুমাইদ মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বন, সত্যবাদিতা এবং দারিদ্র্য ও সচ্ছলতা উভয় অবস্থায় মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানান এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক ব্যবহার, যাচাইহীন তথ্য প্রচার এবং নৈতিক অবক্ষয় রোধে সতর্ক করেন। উত্তম চরিত্রকে শ্রেষ্ঠ সঙ্গী আখ্যা দিয়ে তিনি মাতা-পিতার দোয়া এবং হৃদয়ের পবিত্রতাকে শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন।

শায়খ বলেন, হে লোকসকল! গোপনে ও প্রকাশ্যে মহান আল্লাহকে ভয় করুন। রাগ ও সন্তুষ্টি উভয় অবস্থায় সত্য বলুন। দারিদ্র্য ও সচ্ছলতা উভয় অবস্থায় মিতব্যয়ী হোন এবং বন্ধু ও শত্রু সবার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করুন। জান্নাত ছাড়া সব নেয়ামত তুচ্ছ এবং জাহান্নাম ছাড়া সব বিপদই সহনীয়। যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে, তবে সে যা হারিয়েছে সেটার জন্য দুঃখিত হয় না। যে নিজের গুনাহ ভুলে যায় সে অন্যের গুনাহকে বড় মনে করে। শিষ্টাচার শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার এবং উত্তম চরিত্র শ্রেষ্ঠ সঙ্গী। ক্ষমা করুন, সৎকাজের আদেশ দিন এবং মূর্খদের এড়িয়ে চলুন।

হে মুসলিম সম্প্রদায়! মহান আল্লাহর কিতাব এবং তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতে উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য অনেক নসিহত ও সতর্কবাণী রয়েছে। এর মধ্যে এমন কিছু আছে, যা মৃত অন্তরকে জাগ্রত করে এবং অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তির হৃদয়কে প্রভাবিত করে। প্রবৃত্তি দমনের মাধ্যমে অন্তর জীবিত হয়, আল্লাহর ভয়ের মাধ্যমে উদাসীনতা দূর হয় এবং সতর্কতার মাধ্যমে অলসতা বিদায় নেয়। পাপিষ্ঠ ব্যক্তি যখন তার ভুল স্বীকার করে তখন লজ্জিত হয় এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তি যখন তার শেষ পরিণতির কথা চিন্তা করে তখন সতর্ক হয়। সুতরাং আপনাদের অন্তরগুলোকে নসিহতের মাধ্যমে জীবিত করুন এবং হেকমতের মাধ্যমে আলোকিত করুন।

আপনারা তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না, যারা নসিহতকারীদের অপছন্দ করে। মহান আল্লাহ কোরআনে এক সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করেছেন, ‘তারা বলেছিল, আপনি উপদেশ দিন বা না দিন আমাদের কাছে সবই সমান, এটি তো পূর্ববর্তীদের অভ্যাস ছাড়া আর কিছু নয় এবং আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না।’ (সুরা শুআরা ১৩৬-১৩৮)

সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে সুযোগ শেষ হওয়ার আগেই তার ভুল সংশোধন করে। সুসংবাদ তার জন্য, যে তাকওয়া অবলম্বন করে সৎকাজ করে। মোবারকবাদ তার জন্য, যে মন্দ কাজের পর ভালো কাজ করে। আর ধ্বংস ওই ব্যক্তির জন্য, যে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার বিনিময়ে তার আখেরাতকে বিক্রি করে দেয়। আক্ষেপ তার জন্য, যে আল্লাহর নির্দেশ পালনে অবহেলা করে। এই দুনিয়া একটি সফর, সুতরাং অযথা সময় নষ্ট করা থেকে সতর্ক থাকুন। দিনগুলোর পরিবর্তনই সবচেয়ে বড় উপদেশদাতা। আর কেয়ামত তো চোখের পলকের মতো বা তার চেয়েও নিকটবর্তী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে সক্ষম। মৃত্যু ওত পেতে আছে, আমলগুলো সংরক্ষিত হচ্ছে। মানুষ নেক কাজের প্রতিযোগিতায় বিমুখ হয়ে পড়েছে। অন্তর্দৃষ্টি কি অন্ধ হয়ে গেছে নাকি তারা বিপদ থেকে নিরাপদ হয়ে গেছে?

হে আল্লাহর বান্দারা! দুনিয়ার জীবন যেন আপনাদের প্রতারিত না করে, কারণ এর সুখ চিরস্থায়ী নয়। দীর্ঘ আশা যেন আপনাদের বিভ্রান্ত না করে, কারণ মৃত্যু অবধারিত। আল্লাহর কসম! আপনাদের অবশ্যই রাসুল সম্পর্কে, আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। কেয়ামতের দিন আমল ছাড়া আর কিছুই সাথী হবে না। এই হায়াতই মূলধন, যা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। আজ আমল করার দিন, হিসাব নেই। আর আগামীকাল হিসাবের দিন, আমল করার সুযোগ নেই। কবরের ভয়াবহতা ও ফেরেশতাদের সওয়ালের জন্য প্রস্তুতি নিন। সেদিন কার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে আর কার আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে তা ভেবে দেখুন। আপনারা এখনো সুযোগ ও বেঁচে থাকার সময় পাচ্ছেন। আপনারা এই আয়াতের কথা চিন্তা করুন, ‘আর তারা অবশ্যই তাদের নিজেদের পাপের বোঝা বহন করবে এবং তাদের বোঝার সঙ্গে আরও অনেক বোঝা বহন করবে। তারা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করত কেয়ামতের দিন সেই সম্পর্কে অবশ্যই তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা আনকাবুত ১৩)

এরপর লক্ষ্য করুন সেসব ব্যক্তির দিকে, যারা মানুষের হক নষ্ট করে, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করে এবং মানুষকে সম্মানহানি করে। বিশেষ করে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের কথা চিন্তা করুন, যারা যাচাই না করে খবর ছড়ায়, নিশ্চিত না হয়ে কথা বলে এবং পরীক্ষা না করে তথ্য প্রচার করে। চিন্তা করে দেখুন, সেই ব্যক্তির অবস্থা কেমন হবে, যে কেয়ামতের দিন তার আমলনামায় এমন সব গুনাহ দেখতে পাবে, যা সে নিজে সরাসরি করেনি। কিন্তু সেগুলো প্রচার করার কারণে যারা সেগুলো বিশ্বাস করেছে তাদের গুনাহ, যারা শুনেছে বা দেখেছে তাদের গুনাহ তার ওপর বর্তাবে। হে মুসলিমগণ! অনেক পুরুষ আছে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে তার নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে। অনেক সম্মানিত নারী আছে যারা তাদের পর্দা ও লজ্জাশীলতায় অবহেলা করে। অনেক ব্যক্তি আছে যারা অনলাইনে খুব কঠোর, কিন্তু বাস্তবে খুব শিথিল।

হে মুসলিমগণ! দৃঢ়তা যাচাই হয় পরীক্ষার সময়, আর সুস্থ অবস্থায় সবাই নিজেকে দৃঢ় দাবি করে। সন্তুষ্টি প্রকাশ পায় বিপদের সময়, আর সুখের সময় সবাই সন্তুষ্ট থাকে। বাহ্যিকভাবে সবাইকেই নেককার মনে হয়, কিন্তু নির্জনে তারা কী করে তা মহান আল্লাহ ভালো জানেন। আল্লাহর রহমত ওই সম্প্রদায়ের ওপর, যারা নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করে, যাদের অন্তর পরিচ্ছন্ন এবং যারা আল্লাহর শরিয়ত মেনে চলে। আপনারা তাদের অনুসরণ করুন।

হে আল্লাহর বান্দারা! মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্য বাড়িয়ে বললেন না এবং মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য রঙ বদলাবেন না। বান্দাকে যা দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো মনের প্রশান্তি এবং হৃদয়ের পবিত্রতা। শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো পিতা-মাতার দোয়া, একনিষ্ঠ বন্ধু এবং স্বচ্ছ হৃদয়ের ভাই। আপনি অনুপস্থিত থাকলে যারা আপনার অভাব বোধ করে, ভুল করলে সতর্ক করে এবং দোয়ায় ভুলে না।

কৃপণ ব্যক্তি সম্পদ জমা করে, কিন্তু তা ভোগ করে অন্য কেউ। গিবতকারী অনেক নেকি কামাই করে, কিন্তু তার নেকিগুলো চলে যায় অন্যের আমলনামায়। ইবাদতের কষ্ট দূর হয়ে যায়, কিন্তু তার সওয়াব বাকি থাকে। আর গুনাহের স্বাদ মিটে যায়, কিন্তু তার শাস্তি বাকি থাকে। ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) বলেন, গুনাহ তোমার কাছে যত ছোট মনে হবে, মহান আল্লাহর কাছে তা তত বড় হবে। সৌভাগ্যের লক্ষণ হলো আল্লাহর আনুগত্য করা এবং ইবাদত কবুল না হওয়ার ভয় রাখা। আর দুর্ভাগ্যের লক্ষণ হলো গুনাহ করা এবং নাজাতের আশা করা। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর। তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি যে কোরআন শেখে ও শেখায়। (সহিহ বুখারি) আপনাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের কাছে শ্রেষ্ঠ। মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। নামাজে যারা সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে, তারা সবার মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

মোবারকবাদ সেই ব্যক্তির জন্য, যার হৃদয়ে কোনো বিদ্বেষ নেই এবং যে শত্রুতার পথ চেনে না। সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য, যে বুঝতে পেরেছে আয়ু যতই দীর্ঘ হোক তা আসলে সংক্ষিপ্ত। এখানে ঝগড়া বা প্রতিশোধ নেওয়ার সময় নেই। সে নিজের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত। সে তার ভাইদের সঙ্গে পরিচ্ছন্ন মনে ও ক্ষমাশীল হৃদয়ে বসবাস করে। হে আল্লাহর বান্দারা! নেক আমলের মাধ্যমে নিজেদের সংশোধন করুন। দান-সদকার মাধ্যমে নিজেদের সম্পদের পবিত্রতা রক্ষা করুন। একে অপরের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে আত্মীয় ও বন্ধুদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করুন। সৎকাজের দিকে ধাবিত হোন। মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চান এবং অলসতা করবেন না। কারণ আল্লাহর কাছে শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে অধিক প্রিয় ও উত্তম। (সহিহ মুসলিম)

আল্লাহ কোনো বান্দাকে ভালোবাসলে তাকে হেদায়েত দান করেন এবং হেফাজত করেন। শয়তানের হাত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘নিশ্চয় যারা তাদের রবের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত, যারা তাদের রবের আয়াতসমূহে ইমান আনে, যারা তাদের রবের সঙ্গে শিরক করে না, যারা তাদের রবের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে, এই বিশ্বাসে তাদের যা দান করার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে, তারাই কল্যাণসমূহের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং তাতে তারা অগ্রগামী।’ (সুরা মুমিনুন ৫৭-৬১)

আপনারা সমাজে ঐক্য বজায় রাখুন। অনৈক্য সৃষ্টি করে এমন কাজ থেকে দূরে থাকুন। ষড়যন্ত্রকারী ও ছিদ্রান্বেষীরা সংখ্যায় অনেক। মুনাফিকরা অশ্লীলতা ছড়ায় এবং সুযোগসন্ধানীরা ভুলগুলোকে বড় করে দেখায়। আনুগত্য ও ঐক্য বজায় রাখুন। হে আল্লাহর বান্দারা, আপনারা নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করুন, যেমনটি আপনাদের রব নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ইমানদাররা! তোমরাও তার প্রতি দরুদ ও যথাযথভাবে সালাম পাঠ করো। (সুরা আহজাব ৫৬) এখানে নবীজির প্রতি মহান আল্লাহর দরুদ পাঠ করার অর্থ হলো, আল্লাহ নবীজির প্রতি অনুগ্রহ করেন।

১০ এপ্রিল শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন

মুফতি আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত