নতুন অর্থবছরে (২০২৬-২০২৭) জাতীয় বাজেটে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় বিভিন্ন শিল্পের শুল্কহার যৌক্তিক করার প্রস্তব দিয়েছে, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। এ সংক্রান্ত সুপারিশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও তৈরি পণ্য আমদানি, স্থানীয় উৎপাদন ও বিপণনে মূসক ও সম্পূরক শুল্কের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে কসমেটিকস শিল্প, ফ্রিজ প্রস্তুতকারী শিল্প, অটোমোবাইল, কম্পিউটার ও মোবাইল প্রস্তুতকারক খাতের শুল্ক যৌক্তিকীকরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কমিশন মনে করছে, এ সুবিধা দেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে এ খাতের স্থানীয় বাজার বিবেচনায় রাজস্ব সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের কর জিডিপিতে ভালো ভূমিকা রাখবে।
প্রস্তাবনায় কসমেটিকস খাতকে শিশুশিল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এজন্য শিল্পটিকে ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি ২০২৩-এর আওতায় বেশকিছু সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়। সুবিধাগুলোর মধ্যে কালার কসমেটিকস ও ডার্মা স্কিনকেয়ার খাতকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুরক্ষা প্রদানের সুপারিশ করা হয়।
কমিশনে বলা হয়েছে, ভ্যাট (মূসক) নিবন্ধিত শিল্প হিসেবে যেসব কোম্পানির আমদানির লাইসেন্স আছে, তাদের কাঁচামাল আমদানির জন্য পৃথক এইচএস কোড তৈরি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া স্থানীয় শিল্প রক্ষায় আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন করা (মূসক) ও সম্পূরক শুল্ক অব্যাহতির সুপারিশ করা করেছে কমিশন।
জানা গেছে, কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ খাতের উপখাত হচ্ছে কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার। স্থানীয় বাজারে হোম কেয়ার অ্যান্ড টয়লেট্রিজ খাতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ রয়েছে। অন্যদিকে কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার খাতে সেভাবে বিনিয়োগ নেই। আমদানিনির্ভরতা কমানোর জন্য স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রিমার্ক এইচবি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন কারখানা স্থাপন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে উৎপাদন শুরু করেছে। যাকে সামনে রেখেই কমিশন এই সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে। জানা গেছে, ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কালার কসমেটিকসের বাজার সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার এবং স্কিন কেয়ার পণ্যের বাজার প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার, যা ২০২৩ সালে যথাক্রমে ১৩ হাজার কোটি এবং ২১ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
এদিকে বাংলাদেশ রেফ্রিজারেটর ম্যানুফ্যাচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বৈঠক করেছে কমিশন। তাদের দাবি অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কমপ্রেসার ব্যবহার করে যে রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশনার ও ফ্রিজার তৈরি হচ্ছে তার উৎপাদন পর্যায়ে মূসক কমিয়ে ১০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি এসআরও এর দুটি ধারা বাতিল করে কিছু শর্ত শিথিলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় শিল্পকে আরও বেশি উৎপাদনমুখী করা সম্ভব হবে বলে মনে করে কমিশন। ট্যারিফ কমিশনের প্রস্তাবে আটোমোবাইল খাতেও বেশকিছু ছাড়ের সুপারিশ করা হয়েছে। এ খাতের জন্য বিদ্যমান ১৭০ নম্বর এসআরও সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদনে ৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর এবং বিক্রেতাকেন্দ্রিক সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ট্রেড ভ্যাট ও ৩০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত রয়েছে। তবে এই শর্তগুলোর কারণে স্থানীয় উৎপাদনকে আর্থিকভাবে উৎসাহিত করছে না। তাই, স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে প্রদত্ত রেয়াতি হার পুনর্বিবেচনা বা পরিবেশক পর্যায়ে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ট্রেড ভ্যাটের সঙ্গে সমন্বয়কের বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করেছে ট্যারিফ কমিশন। কম্পিউটার ও কম্পিউটার স্পেয়ার পার্টসের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান সুবিধা ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদন, স্থানীয় কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ও বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট খাতের বিদ্যমান সুবিধাদি আগামী ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো প্রয়োজন।
ট্যারিফ কমিশনের এই প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন খাতের স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সভা করেছেন। এই সভার আলোকে সুপারিশমালা প্রস্তুত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাণিজ্য সংগঠন ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত আবেদনসমূহ কমিশন থেকে পর্যালোচনা করে এনবিআর কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভার সিদ্ধান্ত ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন আইন, ১৯৯২ (সংশোধিত আইন ২০২০) ও ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি, ২০২৩-এর আলোকে কমিশন কর্তৃক পর্যালোচনাক্রমে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, অগ্রিম আয়কর ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্য যৌক্তিকীকরণ বিষয়ে কমিশন থেকে এসব সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশ প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা, বিনিয়োগ উৎসাহিতকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রাজস্ব আহরণের বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে।
