অসুস্থতা দুই ভাগে বিভক্ত। শারীরিক ও আত্মিক। শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসা করানো জরুরি। চিকিৎসা ছাড়া মারাত্মক ক্ষতির নিশ্চয়তা শতভাগ। ঠিক তেমনি অন্তরের (আত্মা) চিকিৎসাও জরুরি। এ রোগে মানুষ অমানুষে (চতুষ্পদ জন্তুতে) পরিণত হয়। এর আবশ্যকতা বুঝাতে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘সেই সফল যে আত্মাকে শুদ্ধ করে এবং সেই ব্যর্থ যে আত্মাকে কলুষিত (রুগ্ণ) করে।’ (সুরা শামস ৯-১০) সুতরাং আত্মার পরিশুদ্ধিতেই মানুষের মুক্তি।
পৃথিবীতে যত চাহিদা রয়েছে সেসব চাহিদা মেটাতে পারলেই শান্তি আসে না। শান্তির জায়গা হচ্ছে মানুষের আত্মা। যার আত্মা যত শুদ্ধ, তার সুখ-শান্তি তত বেশি অনুভূত হয়। যা আধুনিক মেডিকেল সায়েন্স দ্বারাও প্রমাণিত। অথচ সেই ঘোষণা আরও দেড় হাজার বছর পূর্বেই আমাদের মানবতার নবী মুহাম্মদ (সা.) বর্ণনা করে গিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, ‘জেনে রেখো! শরীরের মধ্যে এমন এক টুকরা গোশত রয়েছে, যা সুস্থ থাকলে সারা শরীরই সুস্থ থাকে, আর এটা অসুস্থ হয়ে গেলে সারা শরীরই অসুস্থ হয়ে যায়। জেনে রেখো, আর তা হলো কলব (অন্তর বা আত্মা)।’ (সহিহ বোখারি)
নবীজি (সা.)-কে আল্লাহতায়ালা এ দুনিয়াতে কেন পাঠিয়েছেন? কী দায়িত্ব তাকে ন্যস্ত করা হয়েছে? কী কাজ তাকে সম্পাদন করতে হবে? কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমাদের রব, তাদের মধ্যে তাদের থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করুন, যে তাদের সামনে আপনার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবে, তাদের কিতাব ও হেকমতের শিক্ষা দেবে এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবে।’ (সুরা বাকারা ১২৯) অর্থাৎ উক্ত আয়াতে চারটি বিশেষ কাজ নবীজি (সা.)-কে দেওয়া হয়েছে। কোরআন তেলাওয়াত করা, কিতাব শিক্ষা দেওয়া, হেকমত (প্রজ্ঞা) শেখানো এবং আত্মশুদ্ধি করা।
আত্মশুদ্ধির যে কথা বলা হয়েছে, সেটা প্রয়োগ করে নবীজি (সা.) সোয়া লাখ সাহাবিকে পরিশুদ্ধ (সুস্থ) করে তুলেছেন। ফলে আল্লাহতায়ালা সাহাবিদের বিষয়ে কোরআনে আয়াত নাজিল করেন, ‘আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।’ (সুরা বাইয়িনা ৮) পরিশুদ্ধতার এ ধারাবাহিকতা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যহত থাকবে।
মানুষ যখন পরিশুদ্ধ আত্মার অধিকারীর দ্বারা এবং নিজের চেষ্টায় স্বীয় আত্মাকে সুস্থ করে, তখন সে আত্মা তার চিকিৎসার (কর্মের ফলে) পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পর্যায় ধারণ করে। আর সে ধারণের ধরন অনুযায়ী দুনিয়াবি প্রশান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়। সেই দিক বিবেচনায় আত্মাকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একাগ্রচিত্ত আত্মা, নিরাপদ আত্মা, বিনয়ী আত্মা এবং শান্তিযুক্ত আত্মা। এই চতুষ্টয় আত্মা ব্যক্তির জন্য কল্যাণজনক ও শান্তিপ্রাপ্ত। এসব আত্মা তৈরি করতে শুধুমাত্র শারীরিক চিকিৎসা দ্বারা কখনোই সম্ভব হয় না। যা ঐশ্বরিকভাবে নিজের চেষ্টায় যাবতীয় কামনা-বাসনার উপেক্ষায় অর্জিত হয়।
শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ পূর্ণ ডোজ সেবনের ফলে (যদিও তা ব্যয়বহুল ও কষ্টকর হয়) সেই রোগ যেমন বিনাশ হয়ে যায়, ঠিক তেমনি নফসের কামনা-বাসনার বিপরীত ওষুধ (মৃত্যুপূর্ব পর্যন্ত নফসের বিরুদ্ধে চলা) সেবনের ফলে মৃত্যুর সময় দুটি সুখ নিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়া যায়। এক. দুনিয়াবি যাবতীয় অশান্তি-হতাশা থেকে মুক্ত হয়ে মৃত্যু। দুই. ইমানি অবস্থায় মৃত্যু, ফলে আল্লাহর নেয়ামত জান্নাত।
পক্ষান্তরে, আত্মার অসুস্থতায় দুনিয়াবি সব কাজে আসে অশান্তি-হতাশা এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যু। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘আর যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, এটি তাদের অপবিত্রতার সঙ্গে অপবিত্রতা বৃদ্ধি করে এবং তারা মারা যায় কাফের অবস্থায়।’ (সুরা তওবা ১২৫)
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
