অভিযোগ ছেলের বিরুদ্ধে প্রাণ গেল বাপ-চাচার

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৮ এএম

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ির পাশে পারিবারিক অনুষ্ঠানে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলছিল ৭ বছরের শিশু আতিকা আক্তার। সন্ধ্যার পর সে বাসায় না ফিরলে পরিবারে দেখা দেয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। তার সন্ধান শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। সন্ধান পেতে মাইকিং করা হয় এলাকায়। এক পর্যায়ে রাতেই শিশুটির লাশ পাওয়া যায় বাড়ির পাশে ভুট্টা ক্ষেতে। তাকে হাত-পা বেঁধে হত্যা করার অভিযোগ উঠে প্রতিবেশী পান্নু মিয়ার পরিবারের বিরুদ্ধে। আতিকার লাশ উদ্ধারের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে পান্নু মিয়ার বাড়িতে হামলা চালায় এলাকাবাসী। গণপিটুনিতে পান্নু মিয়া ও তার ভাই ফজলু মিয়ার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া আহত হয়েছেন অপর একজন। ঘটনাটি ঘটেছে মানিকগঞ্জের হাটিপাড়া ইউনিয়নের বনপারিল দক্ষিণপাড়ায়।

আতিকা স্থানীয় বনপারিল দাখিল মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির ছাত্রী এবং সৌদিপ্রবাসী দুদুল মিয়া ও আরিফা আক্তারের মেয়ে। এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। গত রাত ৮টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টা ক্ষেত থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আতিকা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গণপিটুনিতে মারা যান ইজিবাইকচালক পান্নু মিয়া (৪৫) ও তার ভাই ফজলু মিয়া (২৮)। এ ছাড়া পান্নু মিয়ার ছেলে নাজমুল (২০) গুরুতর আহত হয়েছেন।

এই বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার সারওয়ার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ময়নাতদন্তের জন্য শিশু আতিকা আক্তারসহ গণপিটুনিতে নিহত পান্নু মিয়া ও ফজলুর মরদেহ মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, পান্নু মিয়ার কিশোর ছেলে নাইম একাই শিশুটিকে ধর্ষণ করেছে বা ধর্ষণের চেষ্টা করে হত্যা করেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। যে যতটুকু অপরাধ করেছে, তার বিরুদ্ধে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু দুই পরিবারের সদস্য নিহত হয়েছেন, সেক্ষেত্রে উভয় পরিবার থেকেই মামলা হতে পারে। মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ির পাশের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে খেলছিল আতিকা। কিছু সময় পর তাকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। সন্ধ্যার পর এলাকায় মাইকিং ও সামাজিক মাধ্যমে তার সন্ধান চেয়ে প্রচারণা চালানো হয়। একপর্যায়ে প্রতিবেশী শিশু আলী জানায়, আতিকাকে কিশোর নাইমের (১৫) সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হলে সে একটি ভুট্টা ক্ষেতের দিকে নিয়ে যায় পরিবারের সদস্যদের। সেখান থেকেই উদ্ধার হয় আতিকার মরদেহ। স্বজনদের দাবি, আতিকার সোনার কানের দুল লুটের উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হতে পারে। পাশাপাশি ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার আশঙ্কাও করছেন পরিবারের সদস্যরা। পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নাইম একাই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত হত্যার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

আতিকার মরদেহ উদ্ধারের পরই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায়। ক্ষুব্ধ জনতা নাইমের বাবা পান্নু মিয়া, চাচা ফজলু ও ভাই নাজমুলকে ধরে পিটুনি দেয়। একপর্যায়ে পুকুরের পানিতে ফেলে দেওয়া হয় তাদের। এতে মারা যান পান্নু ও ফজলুর। আহত নাজমুলকে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আতিকার চাচা রবিউল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আতিকাকে না পেয়ে আমরা মাইকিং করি। পরে জানতে পারি নাইমের সঙ্গে তাকে দেখা গেছে। তাকে ধরে আনার পর প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করে ভুট্টা খেতে নিয়ে যায়। ধারণা করছি, তার সোনার কানের দুল নেওয়ার পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তার সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটেছে কিনা, সেটাও সন্দেহ করছি।’

গণপিটুনিতে নিহত পান্নু মিয়ার বাড়িতে গতকাল শুক্রবার গিয়ে দেখা যায়, শোকাহত স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। তার স্ত্রী নার্গিস বিলাপ করে কাঁদছিলেন। নার্গিসের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আসরের আজানের পর তার স্বামী ফোন করে জানতে চান, নাইম বাড়িতে আছে কিনা। তিনি জানান, নাইম বাড়িতে নেই। পরে তার স্বামী বলেন, নাইম নাকি পাশের বাড়ির শিশু আতিকাকে নিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর আতিকার বাড়ির কয়েকজন নারী এসে একই প্রশ্ন করলে তিনিও জানান, নাইম বাড়িতে নেই।’ তিনি বলেন, ‘ওর আব্বা দুই ছেলেকে ফোন দেয়, কিন্তু কেউ রিসিভ করে না। পরে নাজমুল ফোন ধরলে বলে, সে বৈশাখীর দাওয়াতে আছে। এর মধ্যে শুনি এলাকাবাসী আমার বড় ছেলের অটোরিকশা আটক করেছে এবং তার বাবাকেও দ্রুত যেতে বলছে। পরে আমি স্বামীর সঙ্গে সেখানে যাই। আতিকাদের বাড়িতে যাওয়ার পরই আমার দুই ছেলে, স্বামী ও দেবরকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তাদের মারধর শুরু করে। আমি অনেক অনুরোধ করেছি মারবেন না, পুলিশ ডাকেন। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। একপর্যায়ে আমাকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর আর কিছু দেখিনি।’

এদিকে, ঘটনার পর থেকেই মূল অভিযুক্ত নাইম পলাতক রয়েছে বলে জানায় এলাকাবাসী। ভাইরাল ভিডিওতেও দেখা যায় বাড়ির উঠানের সামনে উত্তেজিত জনতা তিনজনকে মারধর করছে।

নিহত শিশু আতিকার বাড়িতে দেখা যায় পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। সন্তানকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যান মা আরিফা আক্তার। প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত¡না দিচ্ছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, নিষ্পাপ বাচ্চাটি কী দোষ করেছে, তা জানি না। তাকে কেন হত্যা করা হলো। আমার আদরের সোনামনিকে কেন মেরে ফেলল ওরা। এসব কথা বলে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন।

মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মর্মান্তিক ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। একটি নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু এবং পরবর্তীতে গণপিটুনিতে আরও দুইজনের প্রাণহানি উভয় ঘটনাই আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত