ফেরি ব্যবস্থাপনায় সারাদেশে চরম অব্যবস্থাপনা চলছে। নৌপথে চলাচলকারী বেশিরভাগ ফেরি মেয়াদোত্তীর্ণ। অনেক সময় পদ্মা নদী পাড়ি দিতে গিয়ে মাঝপথে যান্ত্রিক বিকল হয়ে আটকে যাচ্ছে। নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতি নজর না থাকায় অহরহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরুপায় মানুষ ও যানবাহনকে এসব ফেরি দিয়ে পারাপার করতে হচ্ছে।
গত ২৬ মার্চ ঈদের ছুটি শেষে ঢাকা ফেরার পথে ফেরি ঘাটে জীবন দিতে হয়েছে অন্তত ২৬ জনকে। এর আগেও অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেরি থেকে একটি প্রাইভেট কার পড়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলেও এখনো অনেক অঞ্চলে নদী পারাপারে ফেরিই অন্যতম ভরসা। ফেরি ঘাট ও ফেরি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন না করায় দুর্ঘটনা ও জীবনহানির ঘটনা ঘটছে। বড় দুর্ঘটনার পর সবাই নড়েচড়ে বসলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না, যার ফলে আসন্ন কালবৈশাখীসহ বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) তথ্য অনুসারে, দেশের বিভিন্ন নদীতে যানবাহন পারাপারের জন্য বড় ফেরি-রুট রয়েছে ৯টি। এর মধ্যে ফেরিতে করে ৩ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিতে হয় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে। আরিচা-কাজিরহাট ফেরি রুট দিয়ে ১৪ কিলোমিটার, রৌমারী-চিলমারী ২৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার, ধাওয়াপাড়া-নাজিরগঞ্জ ৬ কিলোমিটার, হরিণাঘাট, চাঁদপুর-শরীয়তপুর দিয়ে ১০ কিলোমিটার, ভোলা-লক্ষ্মীপুর দিয়ে ২৮ কিলোমিটার, লাহারহাট-ভেদুরিয়া দিয়ে ১০ কিলোমিটার, বামনা-বদনীখালী দিয়ে ২ কিলোমিটার এবং বাঁশবাড়িয়া-সন্দ্বীপ দিয়ে ১৭ কিলোমিটার নদী পাড়ি দিতে হয়। এসব রুটে ফেরি দিয়ে ভারী যানবাহন, মালামাল এবং যাত্রী পারাপার করা হয়।
সরকারি হিসাব বলছে, এসব রুটে পারাপারের জন্য ফেরি রয়েছে ৫৯টি। এর মধ্যে অকেজো আছে ৯টি। বাকিগুলো বিভিন্ন ঘাটে চলছে। তবে এর মধ্যে আরও ১০টি ফেরির বয়স ৪০ বছর পার হয়েছে। নানা জোড়াতালি দিয়ে এগুলো চলছে। বিভিন্ন সময় মাঝ নদীতেও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। পদ্মায় ফেরি বিকল হওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এই ‘লক্কড়-ঝক্কড়’ ফেরিগুলো ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছে হাজার হাজার যাত্রী ও যানবাহন।
ফেরির এই অব্যবস্থাপনায় প্রাণ দিতে হচ্ছে অসংখ্য মানুষকে। গত ২৬ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় পদ্মা নদীতে ‘সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় অন্তত ২৬ জনের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করা এ ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন এবং কিছু নির্দেশনা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে এগুলোর তেমন বাস্তবায়ন নেই।
এর আগে এ বছরই অনেকগুলো ফেরি দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত ১১ মার্চ রাতে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ফেরি ঘাটে পল্টুন থেকে নেমে উঁচু সংযোগ সড়ক দিয়ে মূল সড়কে ওঠার সময় সয়াবিন তেলবাহী একটি লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পেছনের দিকে গিয়ে নদীতে ডুবে যায়। এতে অল্পের জন্য গাড়িচালক ও সহকারী প্রাণে বেঁচে যান। এর আগে গত ১১ এপ্রিল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার পাটুলী ফেরি ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি মালবাহী ট্রাক দৈরা নদীতে পড়ে যায়। এ ঘটনায় ট্রাকচাপায় আপন (৩৫) নামে এক যুবক নিহত হন।
গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেরি থেকে একটি প্রাইভেট কার পানিতে পড়ে যায়। দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার কারণে জীবনহানির ঘটনা ঘটেনি। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গাড়িচালককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ছাড়া, বিভিন্ন সময়ে ফেরিতে ওঠানামার সময় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সালে কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া রুটে ট্রাক পিছলে নদীতে পড়ে দুইজন নিহত হন। ২০১৪ সালে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে ব্রেক ফেল করে বাস নদীতে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়। ২০১৩ সালে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ফেরি ঘাটে একই ধরনের ঘটনায় দুইজন নিহত হন। এ ছাড়া ২০০৮ সালে পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে ঘন কুয়াশার মধ্যে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে তিনজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
কর্র্তৃপক্ষ বলছে, ফেরিতে ওঠানামার ক্ষেত্রে গাড়ির চালক ও যাত্রীরা নিয়ম মানেন না। তাদেরকে বারবার সতর্ক করা হলেও গাড়ি থেকে কেউ নামতে চান না। তাছাড়া ফেরিতে ওঠার আগে কোনো কোনো যানবাহন অপেক্ষাও করে না।
চালকরা জানান, ফেরিতে ওঠানামার সড়কগুলো খাড়া ঢালু। লোড নিয়ে ফেরিতে গাড়ি ওঠানামা করতে অনেক সময় ব্রেক নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ব্রেক ফেল করলেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। সব পন্টুনে উপযুক্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী বা রেলিং নেই। যে কারণে ব্রেক ফেল করলে আর রক্ষা পাওয়া যায় না।
পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে আনিসুর রহমান নাবিল নামের এক ট্রাক চালক জানান, অধিকাংশ ঘাটে ওঠানামার সড়কগুলো খানাখন্দে ভরা। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করার কারণে সামান্য অসতর্কতায় দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয়। যে কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা।
আসিফ আহমেদ নামের আরেক চালক জানান, অনেক ঘাটে তদারকির জন্য বিআইডব্লিউটিএর দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজে থাকেন না। তাদের পরিবর্তে ‘অপরিপক্ক’ কর্মচারীদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
এ বিষয়ে আমরা কথা বলি যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হকের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফেরি ঘাটে যে অবকাঠামো আছে, সেখানে নিরাপত্তার কোনো আয়োজন নেই। কোনো গাড়ি ব্রেক ফেল করলে, সেটা আটকানোর কোনো উপায় নেই। অদক্ষ এবং দায়সারা কাজের ফসল হিসেবে মানুষের জীবন যাচ্ছে। তিনি বলেন, যেখানে ঝুঁকি বেশি থাকে, সেখানে কাউন্টার ব্যবস্থা থাকতে হয়। নির্মাণ খাতের স্লোগান হলো ‘সেফটি ফাস্ট’। এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। নিরাপত্তাই প্রথম গুরুত্বের বিষয় হতে হবে। এজন্য সরকারের উচিত ফেরি ঘাটগুলোতে সেফটি অডিট করা।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে ব্যারিয়ারের হাইড বাড়িয়ে ঘাটগুলোর নিরাপত্তার বাড়ানো যেতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য এখনই পরিকল্পনা নিতে হবে। এই সেক্টরে পেশাদার লোকজনের দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব দরকার। এক বা দুই বছর পরপর নেতৃত্ব পরিবর্তন করে এখানে ভালো ফল আসবে না। ফেরি পারাপারের পথে ঝুঁকি সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. ছলিম উল্লাহ কিছু সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, ফেরি ঘাটের পন্টুনগুলোতে নিরাপত্তার স্বার্থে রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। যারা ফেরি ও ঘাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আধুনিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
ফেরি পারাপারের ক্ষেত্রে রয়েছে পর্যাপ্ত ফেরি সংকট। ফেরি সংকটের কারণে অনেক ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন আটকে থাকতে হয়। বিশেষ করে ঈদের সময় মানুষে সঠিক সময়ে যাতায়াতও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
ফেরি পথে যান্ত্রিক যন্ত্রণা ছাড়াও প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। শীত মৌসুমে কুয়াশা ও নাব্য সংকটের কারণে অনেক স্থানে ফেরি পারাপারা ব্যাহত হয়। বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌ রুটে এ সংকট প্রকট।
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার পর প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান কর্মকর্তাদের নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া, দৌলতদিয়া, সদরঘাট, বছিলা, হাতিয়াসহ এক ডজনের বেশি ফেরি ঘাট পরিদর্শন করেছেন। যেখানে অনেক ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনা পেয়েছেন। এগুলো ঠিক করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।