চট্টগ্রাম উপকূলে একসময় অবহেলিত লাক্কা মাছ ও সামুদ্রিক কোরাল মাছ এখন আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা। বিশেষ করে এসব মাছের পটকা (সুইম ব্লাডার, মাছের শরীরের ভেতরে থাকা গ্যাসভর্তি থলি) ও পাখনা ঘিরে গড়ে উঠেছে লাভজনক রপ্তানি-বাণিজ্য, যা জেলেদের আয়ে এনেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটের মাছ ব্যবসায়ী ও জেলেরা জানান, আগে সামুদ্রিক মাছ লাক্কাসহ অন্য বড় আকারের মাছ ধরা পড়লেও এর পটকা ও পাখনা তেমন কাজে লাগানো হতো না। অনেক সময় সেগুলো ফেলে দেওয়া হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বিদেশে চাহিদা বাড়ায় এখন এসব অংশ আলাদাভাবে সংগ্রহ করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে।
ব্যবসা সংশ্লিষ্টরা জানান, গভীর সমুদ্রে একসময় ব্লু শার্ক, টাইগার শার্ক, হেমারহেড শার্ক, কালা হাঙরসহ ১০ প্রজাতির হাঙর পাওয়া যেত। এই ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় এখন বেশি পাওয়া যায় না। তাই লাক্কা, কোরাল, লাল পোয়া, বোয়াল পাঙাশ ও সামুদ্রিক ইল মাছের পটকা ও পাখনা রপ্তানি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রাম উপকূল থেকে সংগৃহীত লাক্কা মাছের পটকা চীন, হংকং, জাপান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরে রপ্তানি হচ্ছে।
চট্টগ্রামে এখন পাঁচ থেকে ছয়জন ব্যবসায়ী পটকা-পাখনা রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত । বছরে এই খাতে রপ্তানির পরিমাণ চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা বলে তারা জানান।
মাছ ব্যবসায়ী মো. বশর দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি প্রায় ৬০টি বড় আকারের লাক্কা মাছ কিনেছেন, যেগুলোর ওজন প্রায় ৮০০ কেজি হবে। এগুলো খুচরা বাজারে পটকা ছাড়া বিক্রি করবেন ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে। আর পটকাগুলো বিক্রি হবে মানভেদে প্রায় ২ হাজারের বেশি দামে।
পটকা রপ্তানিকারকদের লোকজন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এগুলো কিনে নিয়ে যান বলে তিনি জানান। তারা এসব পটকা আর পাখনা শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লাক্কা মাছের পটকা শুকিয়ে ‘ড্রাইড ফিশ ব্লাডার’ বা ‘ফিশ ম’ নামে পরিচিত পণ্য তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা ব্যাপক। বিশেষ করে চীনে ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়। প্রসাধনী শিল্পে কোলাজেনের উৎস হিসেবে এবং জেলাটিন হিসেবেও এর ব্যবহার রয়েছে। অনেক দেশে এটি দামি ও বিলাসবহুল খাবার হিসেবেও বিবেচিত হয়।
মাছের পাখনাও শুকিয়ে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে স্যুপ ও বিশেষ রান্নায় এর ব্যবহার জনপ্রিয়। এসব পণ্য সাধারণত উচ্চবিত্ত ভোক্তাদের কাছে বেশি জনপ্রিয়।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) মেরিন বায়োরিসোর্স সায়েন্সের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামান জুয়েল দেশ রূপান্তরকে জানান, সামুদ্রিক মাছ লাক্কাসহ বড় জাতের যেসব মাছ আছে, সেগুলো বাইরের দেশে নানা কারণে চাহিদা আছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতে। আগে মানুষের কোথাও কাটাছেঁড়া হলে সেলাই করতে যে সুতা ব্যবহৃত হতো, তা কিছুদিন পর কেটে ফেলতে হতো। কিন্তু এখন লাক্কাসহ সামুদ্রিক মাছের পটকা থেকে যে সুতা তৈরি হয়, তা মানুষের দেহেই মিলিয়ে যায়, যার কারণে এই পটকার চাহিদা অনেক।
তিনি আরও জানান, সামুদ্রিক মাছের পটকা বা বায়ুথলি থেকে উচ্চমানের কোলাজেনসমৃদ্ধ জেলাটিন তৈরি করা হয়, যা খাদ্য, ওষুধ ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাছের পটকা থেকে যে জেলাটিন পাওয়া যায়, সেগুলো দিয়ে ভিটামিনের খোলস তৈরি হয়। এ ছাড়া অনেক দেশে স্বাস্থ্যগুণসম্পন্ন স্যুপ ও খাবারের উপাদান হিসেবেও এই পটকা ও পাখনা ব্যবহার হচ্ছে।
মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক শাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমাদের কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রায় ২০ মেট্রিক টন মাছের পটকা রপ্তানি হয়েছে, যার বাজারমূল্য ১ লাখ ৩১ হাজার ডলার। বিশেষ করে কোরাল, লাল পোয়া, বোয়াল পাঙাশ ও সামুদ্রিক ইল মাছের পটকা বেশি পরিমাণে রপ্তানি হয়। তবে সাগরে লাক্কা মাছ মাঝেমধ্যে পাওয়া যায় বলে এর পটকার দাম বেশি কিন্তু পাওয়া যায় কম। তবে অন্য সামুদ্রিক মাছের পটকা যাচ্ছে।
বিটি ফুডস নামের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম থেকে জানুয়ারিতে ২ টন সামুদ্রিক মাছের পটকা ও পাখনা রপ্তানি করেছে তাদের প্রতিষ্ঠান। হংকং ও তাইওয়ানে রপ্তানি করেন তারা। তবে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে আগের চেয়ে এখন রপ্তানি কিছুটা কমেছে। এই অর্থবছরে এখনও কোনো অর্ডার আসেনি।
এই খাতে সরাসরি রপ্তানির সুযোগ সীমিত থাকায় মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভবান হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে বলে জানা যায়। বাজারে চীনা কোম্পানিও ঢুকে পড়েছে। লাক্কা মাছের পটকা বাজারে উঠার আগেই চট্টগ্রামের অবস্থান করা চায়নার লোকজন সেগুলো সংগ্রহ করে ফেলেন, যার কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তেমন একটা পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন না।
পটকা রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন এলাকার বাজার থেকে মাছের একটি কাঁচা পটকা ২০ থেকে ১০০ টাকা, এমনকি কোনো কোনোটি ৫০০ টাকা দরে কেনেন তারা। মাছের আকারভেদে শুকনা পটকা কেজি দরেও কেনেন। দাম পড়ে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। আর শুকনো পাখনার কেজি সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা দামে কেনেন।
আরও জানা যায়, কাঁচা পটকা এনে শুকানোর পর ফিউমিগেশন (ধোঁয়া দিয়ে শোধন) করা হয়। এরপর প্যাকেটে ভরে রপ্তানি করা হয়।
লাক্কার রপ্তানিমূল্য কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৫০ ডলার। কামিলা মাছের পটকার প্রতি কেজির রপ্তানিমূল্য প্রায় ৪০০ ডলার।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ফিশারিঘাট এলাকার জেলেরা জানান, আগে যেখানে একটি লাক্কা বা লাল কোরাল, দাতিনা কোরাল মাছ যে দামে বিক্রি করতে হতো, এখন পটকা আলাদাভাবে বিক্রি করে কয়েকগুণ বেশি আয় করা সম্ভব হচ্ছে। একেকটি মাছের পটকা কেজিতে বিক্রি করে ২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তারা।
পতেঙ্গার জেলে শরিফ জানান, আগে এসব অংশ ফেলে দিতাম। এখন ব্যবসায়ীরা এসে সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। এতে আমাদের আয় বেড়েছে।’
রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা জানান, সম্ভাবনাময় এই খাত এখনও পুরোপুরি সংগঠিত নয়। সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক সময় পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা ও সরাসরি রপ্তানির সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। পাশাপাশি টেকসই আহরণ নিশ্চিত করাও জরুরি, যাতে অতিরিক্ত শিকার মাছের প্রজাতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে এই খাতকে আরও বিকশিত করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। বিকশিত হতে পারে উপকূলীয় অর্থনীতি।