হামে মৃত্যুর অধিকাংশই পুষ্টিহীনতায়

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৩ এএম

গত ৩৩ দিনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, মৃত শিশুর অধিকাংশই ছিল পুষ্টিহীনতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মায়ের গর্ভ থেকে যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মানোর কথা, শিশুরা সেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মাচ্ছে না। এর নেপথ্য কারণ হতে পারে মায়েদের রোগপ্রতিরোধে ঘাটতি থাকা। মায়েদেরও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় শিশুরও সুরক্ষায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। সেজন্য পুষ্টির দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার পরামর্শ জনস্বাস্থ্যবিদদের। পাশাপাশি তারা বলছেন, সরকার ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর হামের টিকা দেওয়ার পরও যদি হাম নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে মায়েদেরও টিকার বিষয়ে ভাবতে হবে।

গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস অ্যান্ড কন্ট্রোলরুমের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে তার আগের ২৪ ঘণ্টায় হামে তিন শিশু এবং হামের লক্ষণ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে ২১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে মৃত্যু হয়েছে ৩৭ শিশুর এবং লক্ষণ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৭৪ শিশুর। হাম সন্দেহজনক রোগী ২১ হাজার ৪৬৭ জন, হাসপাতালে ভর্তি ১৩ হাজার ৮৯৮ এবং ছাড়পত্র পেয়েছে ১১ হাজার ২৪৩ জন। হাম শনাক্ত হয়েছে তিন হাজার ১৯২ শিশুর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্তি মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘যারা মারা গেছে, বেশিরভাগই পুষ্টিহীন। স্বাস্থ্যবান শিশু মারা যাচ্ছে না বললেই চলে। অপুষ্টির কারণে এদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সারভাইভ করতে পারছে না। দেশে পুষ্টির ঘাটতি আছে। এখন সমন্বিত ড্রাইভ না দিলে এখান থেকে আমাদের রেহাই নেই। যে ভাইরাল অ্যাটাকই হোক না কেন, পুষ্টিহীন শিশুরা সবার আগে সাফার করবে। শুধু মিজেলস না। অন্য কিছু হলেও তারা ঝুঁকিতে পড়বে। সে ক্ষেত্রে পুষ্টির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। মায়ের যে গর্ভ থেকে যে পুষ্টি পেত, সেই পুষ্টি পাচ্ছে কি না তা গবেষণার বিষয়। দেড়-দুই মাসের শিশুর হাম হচ্ছে, এটা আমাদের কাছে একেবারেই নতুন বিষয়।’

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মায়ের গর্ভ থেকে রোগ প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি নিয়ে এরা তো জন্মাচ্ছে না। মায়েদেরও হামের অ্যান্টিবডি নেই। মায়েদের টিকা দিতে হবে। মায়েদের টিকা দিলে, মায়ের গর্ভ থেকে অ্যান্টিবডি নিয়ে জন্মাবে। তখন ছয় মাস, নয় মাস পর্যন্ত সুরক্ষিত থাকবে। অনেক ঘাটতি হয়ে গেছে। আমাদের দেশে এটা নিয়ে স্টাডি নেই কেন এমন হচ্ছে। এটা নিয়ে স্টাডি দরকার। হামে এর আগে এত শিশু মারা যায়নি। এই যে সমস্ত কিছু এক বছর, দুই বছর, তিন বছর ধরে মানে জমা হয়ে গেছে। ইউনূস সাহেবের সরকারের সময় এগুলোতে খুব ঘাটতি হয়েছে। কাজ হয়নি। অন্য জিনিস নিয়েই সবাই ব্যস্ত ছিল।’

তিনি বলেন, ‘যদি নিউট্রিশন কমে যায় বা কোন কোন বাচ্চার ডায়রিয়া হলো, ডায়রিয়া হয় আগেই দুর্বল হয়ে গেল, তখন সেই বাচ্চার যদি হাম হয়, তার জন্য সিরিয়াস ব্যাপার। দেশে নিউট্রিশনের অভাব আছে। লো ইনকাম গ্রুপে নিউট্রিশনের অভাব। এখন জানি না নিউট্রিশনের আরও অভাব হয়েছে নাকি। আমাদের বস্তি এরিয়াতে কি অবস্থা আমার এখন আইডিয়া নেই। ওদের খাওয়া দাওয়া, জিনিসপত্রের দাম বাড়লে ওরা খেতে পারে না। পুষ্টির ঘাটতি পড়ে যায়। আরেকটি হলো যে, ডায়রিয়া যদি হয়। ডায়রিয়া হয়ে গেলে খুব দ্রুত পুষ্টির ঘাটতি হয়ে যায়। তখন মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। নিউমোনিয়া হলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। আর নিউমোনিয়া হলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।’

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জীবাণুবিদ (লিড ভাইরোলজিস্ট-এনপিএমএল ল্যাব) ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, বিভিন্ন কারণ হতে পারে। আক্রান্ত শিশুর মায়ের হয়তো হামের টিকা নেওয়া ছিল না কিংবা মায়ের হয়তো পার্শিয়ালি টিকা নেওয়া ছিল কিংবা মায়ের নিউট্রিশন ঠিকমতো মেনটেইন হচ্ছিল না, শিশুটিও হয়তো সে রকম পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল অথবা শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হয়নি, বিভিন্ন কারণে এটা মাল্টিফ্যাক্টরিয়াল হয়। ‘শিশুরা ইমিউনিটি পায় মা থেকে। মা যদি নিজেই ইমিউন না থাকে, হামের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা যদি না থাকে, তাহলে শিশু কীভাবে অ্যান্টিবডি পাবে? ’

যে কোনো বয়সে হামের টিকা নেওয়া যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, টিকা অনেক সেফ কিন্তু মা এখন হয়তো হামের নিতে পারবে না? সরকার প্রথমে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস পর্যন্ত দিচ্ছে। এরপর ১০ বছর বয়স পর্যন্ত দেবে। মাকে নিতে হলে কিনে নিতে হবে। এটা অনেক ব্যয়বহুল। আগে শিশুদের দেওয়া হোক তারপর পরিস্থিতি বুঝে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার সরকার হয়তো সেই সিদ্ধান্ত নেবে। তবে গর্ভবতী মা টিকা নিতে পারবে না। নিলে আগে নিতে হবে।’

ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল মায়েদের পুষ্টির বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, ‘মা যদি একটু পুষ্টির দিকে নজর রাখে, খাবার-দাবার ব্যাপারে যেমন ডিম-দুধ-ডাল খাওয়া, বেশি পরিমাণে ডাল খেতে পারে কিংবা শাকসবজি খেতে পারে। রোদে একটু হাঁটতে পারে। ভিটামিন ডি ডফিশিয়েন্সি কমে গেলে এগুলো এমনিতেই কমে যাবে। ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়।’

দেশে হামের প্রকোপ কিছুটা কমেছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

এদিকে গতকাল শুক্রবার বিকেলে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দেশে হামের প্রকোপ কিছুটা কমেছে। তিনি বলেন, আমরা অতি স্বল্পসময়ের মধ্যে ইউনিসেফ, গ্যাভি, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের সহায়তায় দেশব্যাপী টিকা কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু করেছি। এবং আগামী ২০ এপ্রিল বৃহৎপরিসরে শুরু হবে। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকা কার্যক্রম শুরু করলে এটা আরও কমে যাবে। আশা করি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

টিকার কোনো ঘাটতি নেই জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো টিকার ঘাটতি নেই। সব ধরনের টিকার পর্যাপ্ত মজুদ আছে। গ্রাম এলাকায় ও আমাদের হাতে যে পরিমাণ ভ্যাকসিন মজুদ আছে তা দিয়ে আগামী জুন মাস পর্যন্ত বিনাবাধায় আমরা ভ্যাকসিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারব। তবে আগামী মাসে একটা জায়গায় আমাদের কিছু ঘাটতি দেখা দিতে পারে, সেটি হলো .০৫ সিরিঞ্জ। সে ঘাটতি পূরণ করতে আমরা ইতিমধ্যে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখছি। বর্তমানে এটি পাইপলাইনে আছে। আগামী দেড় মাসের মধ্যে আমরা সিরিঞ্জের এ ঘাটতিও পূরণ করতে পারব। ইউনিসেফের মাধ্যমে আমরা আংশিক সিরিঞ্জ আগামী সাত দিনের মধ্যে নিয়ে নেব। আর বাকিগুলো মে মাসের মধ্যে তারা আমাদের সরবরাহ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেভাবে হামের রোগী নিয়ে ঢাকায় আসে, এ জন্য ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর কিছুটা চাপ পড়ে। সে সমস্যা সমাধানে আমরা রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। আমাদের কিছু জনবলের ঘাটতি আছে, সেগুলোই ইতিমধ্যে চিহ্নিত করেছি। খুব শিগগির এ সমস্যার সমাধান হবে।

এ সময় স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসসহ মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও ইপিআইর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত