দল নয় সরকার হোক জনগণের আস্থাভাজন

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৭ এএম

সামাজিক সুরক্ষা বা বৃহত্তর অঙ্গনে সামাজিক কল্যাণ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্ব নিহিত রয়েছে নিজের জন্য নয়, বরং তা মানুষের হাতে একটা অস্ত্রের মতো যা পছন্দমতো কিছু করার জন্য নিজেকে সমর্থ করে তোলে।’ এটি সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যার মতো বিষয় জীবনের গুণগতমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এগুলো মানুষকে নিজের এবং বড় পরিসরে সমাজের চাহিদা ভালোভাবে পূরণে সক্ষম করে তোলে। দিন শেষে, প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন একটা উদ্দেশ্যসাধনের জন্য এবং সে উদ্দেশ্যটি হচ্ছে মানবজীবনের মান উন্নীত করা। বাংলাদেশ গেল কয়েক দশকে সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে কিন্তু প্রবৃদ্ধির সুফল সবার ঘরে পৌঁছেনি বলে অরক্ষিত ও বঞ্চিতদের জন্য সরকারিভাবে বিশেষ বন্দোবস্তের অন্য নাম সামাজিক সুরক্ষা। বাংলাদেশে সব নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করে না এবং প্রত্যেকে সমানভাবে উন্নয়নের সুযোগ পায় না। এখানে আয়-বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। দেশের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী উন্নয়নের সুফল থেকে বহুলাংশে বঞ্চিত থাকছে। এদের প্রতি রাষ্ট্রের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বেগবান করার জন্য বর্তমান সরকার দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করে মানবিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সবার কল্যাণ সাধন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কিন্তু এখানে বেশ কিছু উদ্বেগের বিষয় আছে। গত সরকারের আমলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক গবেষণায় বলেছিল ‘স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং উপকারভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাজেটের ৬৫ শতাংশ গিয়েছে দরিদ্র নয় এমন মানুষের হাতে।’ গবেষণা অনুসারে দেশের মাত্র ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ দরিদ্র পরিবার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে কিছু সাহায্য পেয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জীবন-জীবিকার জন্য ব্যাপকহারে বাজেট কমে যাওয়া আরেকটি উদ্বেগের বিষয় ছিল। আশা করি, নতুন সরকার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখবে।

বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে অনিশ্চয়তা যেন স্থির বাস্তবতা। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কঠোর মুদ্রানীতি সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক পরিবেশ জটিল হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরকের কর্ণধার ল্যারি ফিংক সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছে, তাহলে বিশ্বঅর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তার বক্তব্য নেতিবাচক অনুমান হলেও, এটি বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার গভীর বিশ্লেষণ। তেলের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে বলার নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তেলের বাজারে অস্থিরতা প্রায়ই বড় অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস হয়ে উঠেছে। ১৯৭০ দশকের তেল সংকট বিশ্বঅর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছিল। একইভাবে ২০০৮ সালের গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস-এর সময় তেলের উচ্চমূল্য অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছিল। যদিও সংকটের মূল কারণ ছিল আর্থিক খাতের দুর্বলতা। কিন্তু জ্বালানির উচ্চব্যয় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছিল।

বর্তমানে বিশ্বঅর্থনীতি দুর্বল অবস্থায়। অনেক দেশ এখনো মহামারীর ধাক্কা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের মতো সংঘাত, যা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। যদি এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছে, তাহলে তা অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করবে এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। এর ফলে তেলের উচ্চমূল্য সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে, যা ভোক্তা ব্যয় হ্রাস করবে। আর ভোক্তা ব্যয় কমে গেলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হবে। শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হবে। এতে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, যা অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা সুদহার বাড়াতে পারে, কিন্তু এতে বিনিয়োগ ও ঋণ গ্রহণ কমে যায়। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়ে। এই দ্বৈত সংকট উচ্চমূল্যস্ফীতি ও কম প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ। এতে রিজার্ভ কমবে, মুদ্রার মান হ্রাস পাবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হয়, যা বাজেট ঘাটতি বাড়াবে।

বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণে জ্বালানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা, সেখানে এই প্রভাব আরও গভীর। ফসলের দাম বাড়বে এবং ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যক্রয় ব্যয়বহুল হবে। সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উল্লম্ফন এবং অভ্যন্তরীণ খাদ্য ও জ্বালানিনীতির দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করলে, নতুন ধরনের খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হতে পারে দেশ। এর ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের নতুন সরকারকে জনকল্যাণে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় অটুট রাখার জন্য জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য মজুদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বাংলাদেশ সরকারকে মনে রাখতে হবে। দেশের লাখ লাখ নারী শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী নারীর সুরক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারের শুধু প্রশংসা করা, গণমাধ্যমের কাজ নয়। সরকারের যেকোনো সমালোচনার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী বিরোধী দল পায়নি। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার প্রধান স্থান গণমাধ্যম। ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা, সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা গণতন্ত্রকে কেবল সংহত করবে না বরং সরকারকে জনপ্রিয় করবে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির মূল স্লোগান ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। অন্যদিকে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক উক্তি হলো ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’। এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে বিএনপির নেতাকর্মীদের। মনে রাখতে হবে বিএনপি দল নয়, জনগণের সরকার।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

 [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত