ভয়, নির্ভয় আর আশ্বাসে আজ থেকে শুরু হচ্ছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। পরীক্ষায় হলে ঘাড় ঘোরানো যাবে না কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কেন্দ্রের পুরো চিত্র শিক্ষা মন্ত্রী নজরদারি করছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে পরীক্ষার হল পর্যবেক্ষণ করছেন। এমন অনেক নিয়মের কড়াকড়িতে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ভয় বা শঙ্কা কাজ করছে। আবার অনেকের মতে এই ভয় কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারলেই পাবলিক পরীক্ষায় একটি সুন্দর পরিবেশ ফিরে আসবে।
সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, আজ মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) থেকে শুরু হতে যাওয়া এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সবচেয়ে নতুনত্ব হলো পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো সিসি ক্যামেরার আওতাধীন। শুধু কি পরীক্ষার কেন্দ্র? প্রতিটি কেন্দ্রে যতোগুলো রুমে পরীক্ষা হবে সবগুলো রুমে সিসি ক্যামেরা থাকতে হবে। আবার সেসব সিসি ক্যামেরার মডেল নম্বর, আইডি নম্বর, পাসওয়ার্ড শিক্ষাবোর্ডের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইটি সেলেও পাঠানো হয়েছে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগরীর বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল অ্যান্ড কলেজের কেন্দ্র সচিব ও প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক সুকুমার দেবনাথ বলেন, এবারের পরীক্ষায় এই সিসি ক্যামেরার ইস্যুটি শুধু নতুন। অন্য সব নিয়ম আগে যা ছিল তেমনি আছে। তবে এবার সকল নিয়মাবলী মেনে চলার জন্য জোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং আমরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের তা মেনে চলার জন্য বলেছি।
সিসি ক্যামেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা আমাদের কেন্দ্রের সবগুলো রুমের সিসি ক্যামেরার আইডি ও মডেল নম্বর, পাসওয়ার্ড শিক্ষাবোর্ডের কাছে জমা দিয়েছি।
এই আইডি বা পাসওয়ার্ড দিয়ে কি হবে? এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে শহরের বাইরে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের রাউজান নোয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব ও প্রধান শিক্ষক বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রী হয়তো সিসি ক্যামেরাগুলো একটি কন্ট্রোল রুম থেকে মনিটরিং করবেন। এজন্যই এই আয়োজন। তবে এতে যাতে শিক্ষার্থীরা ভয় না পায় সেজন্য আমরা তাদের নির্ভয় দিয়েছি এবং শিক্ষকদেরও পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করতে বলা হয়েছে।
গোপন বহিষ্কার এবারই নতুন নয় কিন্তু নির্ভয়ের কথা বলা হলেও শিক্ষার্থীদের অনেকে ভয় পাচ্ছে বলে জানান বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
পরীক্ষার হলে ঘাড় ঘোরালেই গোপন বহিষ্কার কিংবা কথা বললে বহিষ্কার এসব বিষয় নিয়েও ভয় কাজ করছে। আর এই ভয়কে শিক্ষক ও অভিভাবকরা আরও বহুগুনে বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সত্যিই কি হিডেন বা গোপনে বহিষ্কার বলতে কি কিছু আছে? কিংবা এটা কি এবারই নতুন?
এ প্রসঙ্গে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, গোপন বহিষ্কারের বিষয়টি পরীক্ষার হলে কিন্তু নতুন কিছু নয়। পরীক্ষা কেন্দ্রের কোনো পরীক্ষার্থী যদি অসুদোপায় অবলম্বন করে তখন পরিদর্শক বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিজের নিরাপত্তা কিংবা পরীক্ষার হলের পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে গোপনে বহিষ্কার করতে পারেন। এটা অনেক আগের নিয়ম।
সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে থাকবে ৩ হাজার ৮৮৫ কেন্দ্র
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, আমরা চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের আওতাধীন ২১৮টি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। বোর্ডের কর্মকর্তারা বিভিন্ন টিমে বিভক্ত হয়ে রাঙামাটি বান্দরবানের মতো দুর্গম অঞ্চলের কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি শহরের কেন্দ্রগুলোও পরিদর্শন করেছি। সকল কেন্দ্রেই সিসি ক্যামেরা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড নয় দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ড মাদরাসা ও কারিগড়ি শিক্ষাবোর্ডের কেন্দ্রগুলোও সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে। আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের ৩০ হাজার ৬৬৬ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ পরীক্ষার্থী ৩ হাজার ৮৮৫ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছে।
এই সিসি ক্যামেরার কাজ কি হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং কক্ষ থেকে দেশের প্রতিটি কেন্দ্র দেখা যাবে। কোন কেন্দ্রের কোন কক্ষের পরিবেশ কেমন তা সহজেই জানা যাবে। এজন্য আমরা প্রতিটি কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরার ইন্টারনেট লাইন সচল রাখতে নির্দেশনা দিয়েছি। একই সঙ্গে যাতে বিদ্যুৎ থাকে সেজন্য জেনারেটর কিংবা ব্যাটারি ব্যাকআপ রাখতে বলা হয়েছে।
পরীক্ষায় ভয়ের কোনো কারণ নেই
সিসি ক্যামেরা বা পরীক্ষার হলের পরিবেশ নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ নেই এই আশ্বাসে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন,পরীক্ষার হলে প্রতিটি শিক্ষার্থী যাতে নির্ভয়ে সুন্দর পরিবেশে পরীক্ষা দিতে পারে আমরা সেই ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিচ্ছি এবং এই আলোকে আমি আমার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদেরও নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন,কোনো পরীক্ষার্থী কিংবা পরিদর্শকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক যদি অসুদোপায় অবলম্বন করে তাহলে পরীক্ষা বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে কাজ করা চট্টগ্রাম সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে কর্মরত শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. শামসুদ্দীন শিশির বলেন,পরীক্ষা নিয়ে প্রকৃতপক্ষে ভয়ের কিছু নেই। শিক্ষকরা যখন শ্রেণিকক্ষে সঠিকভাবে পাঠদান করাবে এবং শিক্ষার্থীরা যদি যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার হলে আসে তাহলে কোনো ভয় নেই। আর এবার পরীক্ষার নিয়মগুলো যথাযথ বাস্তবায়ন করা হলে আগামীতে শিক্ষা একটি প্রকৃতরেখার মধ্যে চলে আসবে এবং সুফল বয়ে আনবে।
পরীক্ষা কেন্দ্রে সাড়ে ৮টা থেকে প্রবেশ করা যাবে
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় আরেকটি নতুন নির্দেশনা হলো পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের সময়। প্রতিবছর আমরা দেখি পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জটলা লেগে থাকে। পরীক্ষা কেন্দ্রের গেট ৯টার আগে খুলছে না। তবে এবার এই সময় আধা ঘণ্টা এগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে বলে জানান ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার।
তিনি বলেন, যানজট নিরসন এবং তীব্র গরমের কারণে শিক্ষার্থীরা যাতে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে না হয় সেজন্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান গেট খুলে দিতে হবে সকাল সাড়ে আটটায়। তবে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করবে সাড়ে ৯টায়।
এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। মাদরাসা বোর্ডে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ এবং কারিগড়ি শিক্ষাবোর্ডে এক লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে।