বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ার অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৪ এএম

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন এখন বহু অভিবাসীর জন্য এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি নৌকাডুবিতে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশিসহ কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা আবারও এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। গ্রিস উপকূলের ওই দুর্ঘটনায় এখনো অনেকেই নিখোঁজ। লিবিয়া থেকে যাত্রা করা নৌকাটি অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই, দুর্বল কাঠামো এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মাঝসমুদ্রে উল্টে যায়। উদ্ধার অভিযান চালানো হলেও অধিকাংশ যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

ইউরোপগামী সমুদ্রপথে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমসংক্রান্ত তথ্যের ওপর ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধের কারণে অনেক দুর্ঘটনাই যাচাই করা যাচ্ছে না। ফলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আনুষ্ঠানিক হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৬০৬ জন অভিবাসীর মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে ইতালিতে অভিবাসী আগমন প্রায় ৬১ শতাংশ কমে গেলেও মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে। অনেক ঘটনা যাচাই না হওয়ায় মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি দক্ষিণ ইতালি ও লিবিয়া উপকূলে অন্তত ২৩টি মরদেহ ভেসে আসার ঘটনা এই সংকটের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। এই অভিবাসনপ্রক্রিয়া কোনো স্বতঃস্ফূর্ত যাত্রা নয়, বরং একটি সুসংগঠিত মানবপাচার চক্রের অংশ। উৎস দেশে স্থানীয় দালালরা ইউরোপে উচ্চ আয়ের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিজনের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে। এরপর ট্রানজিট পর্যায়ে লিবিয়া বা উত্তর আফ্রিকায় অবৈধভাবে প্রবেশ করিয়ে অভিবাসীদের গেম ঘর নামে মানবপাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণাধীন বদ্ধঘরে আটক রাখা হয়; যেখানে নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় এবং পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরনো নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী তুলে সমুদ্রপথে পাঠানো হয়। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও অনেক সময় জ্বালানির অভাবে এসব নৌকা মাঝপথে দুর্ঘটনায় পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরো নৌকার যাত্রীরাই নিখোঁজ হয়ে যান, যাদের কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ডও থাকে না। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় ট্রানজিট অঞ্চলের সংগঠিত অপরাধচক্র।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসন পথের অভাবই মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ঠেলে দিচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় জরুরিভিত্তিতে মানবপাচার চক্র দমন, আন্তর্জাতিক সমন্বয় বৃদ্ধি, নিরাপদ অভিবাসন পথ সম্প্রসারণ এবং কার্যকর অনুসন্ধান ও উদ্ধারব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে থাকা ইউরোপীয় অভিবাসন রুটে অভিবাসীদের মৃত্যু নিয়ে দেশ রূপান্তর কথা বলেছে বিশেষায়িত ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্রেন্টসের সাংবাদিক মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহর সঙ্গে। উল্লেখ্য, ইনফোমাইগ্রেন্টস ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর এবং জার্মানির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ডয়েচে ভেলের একটি যৌথ উদ্যোগ।

আরিফ উল্লাহ বলেন, অভিবাসন রুটে মানবপাচার চক্রগুলো সাধারণত সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে, যেখানে প্রতিটি ধাপে আলাদা আলাদা ব্যক্তি বা গ্রুপ যুক্ত থাকে। তবে রুটভেদে কৌশলও ভিন্ন। যেমন পূর্ব লিবিয়া থেকে ইতালি আসতে ভূমধ্যসাগরীয় রুটে আধা-আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু আছে, যেখানে সমুদ্রে যাত্রার আগে অভিবাসীদের ‘গেম ঘরে’ রাখা হয়। আবার বলকান রুটের স্থলপথের কৌশল আলাদা। সেখানে মূলত প্রতিবার সীমান্ত পার হওয়ার পর দালালচক্র তাদের নির্ধারিত অর্থ নিয়ে থাকে।

২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগরীয় রুটে অভিবাসনের মোট সংখ্যা কমলেও মৃত্যুর হার এ বছরের শুরুতে ব্যাপক হারে বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে অন্তত ৫৫৯ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।

ইতালির নানা পদক্ষেপের কারণে গত বছর ভূমধ্যসাগরের অভিবাসন রুটে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। যদিও এনজিওগুলো এসব পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। ইউরোপের অভিবাসন সংস্থা, এনজিও, অধিকার সংগঠন এবং বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মতে, মানুষ নিজ ইচ্ছায় নিজ দেশ ত্যাগ করে না। যুদ্ধ, সংঘাত ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচতেই মানুষ অভিবাসন রুট বেছে নেয়। ইউরোপ তাদের মানবিকভাবে গ্রহণ না করে উল্টো কট্টর অভিবাসন নীতি প্রয়োগ করছে।

আরিফ উল্লাহ বলেন, ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের মৃত্যু আংশিকভাবে আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের অভাবের ফল, যা সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। প্রথমত, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকায় দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব হয় না। দ্বিতীয়ত, ইইউ দেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। তৃতীয়ত, লিবিয়ার মতো ট্রানজিট দেশের সঙ্গে দুর্বল ও অসম বাস্তবায়নযোগ্য সহযোগিতা নিরাপদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। চতুর্থত, বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসন পথের অভাব মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ রুটে ঠেলে দিচ্ছে, ফলে মৃত্যুহার কমছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত