সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই রেকর্ড পরিমাণে গম আমদানি হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। তবু হঠাৎ করেই আটা ও ময়দার দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একইভাবে বেড়েছে চালের দাম। আটা, ময়দা বা চালের দাম এমন সময়ে বাড়ল, যখন আগে থেকেই চড়ে আছে সবজি, মাছ ও মাংসের বাজার। এবারে সেই ধারায় বেড়েছে ডিমের দামও।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গতকাল বৃহস্পতিবারের দ্রব্যমূল্যের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মাঝারি মানের চাল, খোলা ও প্যাকেটের আটা ও ময়দার দাম বেড়েছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৫ টাকায় যে চাল কেনা যেত, তা এখন কিনতে হচ্ছে ৬০ টাকায়। অর্থাৎ এক কেজি চালে দাম বেড়েছে ৫ টাকা পর্যন্ত। একইভাবে খোলা আটায় কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা এবং প্যাকেট আটায় কেজিপ্রতি বেড়েছে ৫ টাকা পর্যন্ত। দাম বাড়ার পর খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৬ টাকায় এবং প্যাকেট আটা ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অথচ কৃষি বিভাগ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে অনুকূল পরিবেশ পাওয়ায় গত আমন মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ চাল উৎপাদন হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে যা এক কোটি ৮০ লাখ টন। এর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে দুই লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্তে বিপাকে ছিলেন কৃষকরা। কারণ দেশে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পর বাইরে থেকে আমদানি করা হয়েছে।
খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আমন চালের এখনো যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। সে হিসেবে চালের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, চালের দাম বেড়েছে মূলত পরিবহন খরচের কারণে। জ্বালানি তেলের সংকটের মধ্যে অনেক ট্রাক নিয়মিত ট্রিপ দিচ্ছে না। যারা ট্রিপ দিচ্ছে তারাও ভাড়া বেশি নিচ্ছে। এ বিষয়ে কারওয়ানবাজারের আল্লাহর দান চালের পাইকারি বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম জানান, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে থেকেই ভাড়া বাড়তি। যে কারণে চালের দাম সামান্য বেড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ট্রিপে অন্তত ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে।’
একই পরিস্থিতি গমের ক্ষেত্রেও। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে ৬৮ লাখ ৬০ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে। যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৬১ লাখ ৪৪ হাজার টন। এর মধ্যে সরকারি খাতে ৭ লাখ টন এবং বেসরকারি খাতে আমদানি হয়েছে ৬১ লাখ ৬০ হাজার টন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত ভালো সরবরাহ পরিস্থিতিতে কখনোই চাল ও আটার দাম বাড়ে না। কিন্তু এবারে বেড়েছে শুধু জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে, যা সাধারণ মানুষের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং দেশেও জ্বালানি তেল কিনতে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানির দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণেই খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
শুধু চাল ও আটার বাজারেই নয়, আগে থেকেই অস্থিরতা রয়েছে ভোজ্য তেলের বাজারেও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরবরাহ সংকট থাকায় সয়াবিন তেল সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বোতলজাত তেলের দাম না বাড়লেও বেড়েছে খোলা সয়াবিন তেলের দাম। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পেঁয়াজের দাম। ঢাকার খুচরা বাজারগুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে যে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল, গত দুদিন ধওে সে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়।
এ ছাড়া শীত মৌসুম শেষে প্রতি বছরই সবজির দাম বাড়ে। কৃষি বিভাগ বলছে, শুধু শীতে যে পরিমাণ সবজি উৎপাদন হয়, তার তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসে গরমে। যে কারণে দামও থাকে চড়া। এবার এই চড়া দাম আরও আরও চড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নানা পদের সবজিতে অন্তত ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
সরেজমিনে রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি মিষ্টি কুমড়া বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। যা সপ্তাহখানেক আগেও খুচরা বিক্রেতারা ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেছেন। বেগুনের কেজি প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই বেড়ে ১০০ টাকায় ওঠে। এখন মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। এছাড়া ঝিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায়। কাঁচা পেঁপে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬০ টাকায়। একইভাবে বাজারে অন্যান্য সবজির দামও চড়া। ৮০ টাকা কেজির নিচে সবজি পাওয়া কঠিন।
কারওয়ানবাজার সবজির আড়তদার সমিতির সভাপতি ইমরান মাস্টার দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়ায় ট্রাকের ভাড়া স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ এসেছে। কারণ এতদিন তেল না পাওয়ায় যে যেভাবে পারছিল ভাড়া আদায় করছিল।’
এ ছাড়া রাজধানীর বাজারে গরুর মাংসের দামও বেড়েছে। বিক্রেতারা প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি করছেন ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা কেজি দরে, যা কদিন আগেও ছিল ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। তবে ব্রয়লার মুরগির মাংসের দাম স্থিতিশীল রয়েছে এবং প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়। এছাড়া বেড়েছে ফার্মের ডিমের দাম। প্রতি ডজন ডিম সপ্তাহের ব্যবধানে ১২০ থেকে বেড়ে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
