ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমো আত্মহত্যার আগে একই বিভাগের শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধারের পর ত্রিভুজ প্রেমের জটিলতা থেকে এই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
পরিবার, পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, মিমোর মোবাইল ফোন থেকে এমন কিছু তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, যা এ ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়। এসব তথ্য এবং সুইসাইড নোটের ভিত্তিতে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাজধানীর বাড্ডা থানায় মামলা দায়ের করেছে মিমোর পরিবার। ইতিমধ্যে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মিমোর এক সহপাঠীকে আটক করা হলেও পরে মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এর আগে গত রবিবার সকাল সাড়ে ৯টায় উত্তর বাড্ডা পূর্বাচল উদয়ন ম্যানশন ১০ নম্বর লেনের ৫৯০ নম্বর ভবনের নবম তলা থেকে মিমোর মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। মরদেহের পাশ থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করে পুলিশ। সেখানে লেখা ছিল ‘সুদীপ স্যারকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। হানি আর সুদীপ স্যার ভালো থাকো, স্যারের দেওয়া গিফটগুলো ফেরত দিও...।’
অভিযুক্ত সুদীপ চক্রবর্তী থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নাট্য পরিচালক হিসেবেও পরিচিত।
‘আরব্য রজনী’ অবলম্বনে নির্মিত একটি নাটকের পরিচালক ছিলেন সুদীপ, যেখানে পোশাক পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন মিমো। সেই সূত্রেই তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একই নাটকে বিভাগের আরেক ছাত্রীও অভিনয় করেছিলেন।
মিমোর হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের কথোপকথন উল্লেখ করে তার বাবা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার মেয়ে মিমো যে বিভাগের ছাত্রী, একই বিভাগের শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী। মিমো আত্মহত্যার আগে শনিবার (২৫ এপ্রিল) দিবাগত রাত ১টায় ওই শিক্ষকের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছে। ওই কথার পরেই আত্মহত্যায় প্ররোচিত হয়ে আমার মেয়ে মৃত্যুর পথ বেছে নেয়।
অভিযোগ উঠেছে, মৃত্যুর আগে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুরে কলা ভবনের ৬০১ নম্বর কক্ষে সুদীপ চক্রবর্তী ও এক ছাত্রীকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখেন মিমো। এ নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলতে পারেননি বিভাগের চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমা। তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন দুপুর ১টার পর আমি অফিসে ছিলাম না। তাই পরবর্তীতে কী ঘটেছে সে বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিভাগের করিডোর বা ক্লাসরুমে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। একটি আছে বাইরে, সেটির নিয়ন্ত্রণও আমাদের কাছে নেই। ওই ক্যামেরা ডিন অফিস নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেটিও আমাদের কক্ষ বরাবর নয়।’
বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদুল কবির বলেন, ‘কলা ভবনের যে কক্ষের (৬০১ নম্বর) কথা বলা হচ্ছে, সেটি মূলত একটি ক্লাসরুম। সেখানে একজন শিক্ষকের সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর এমন উপস্থিতি স্বাভাবিক নয়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি, কিন্তু এ অভিযোগের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা এখনো পাইনি। যদি এমন কিছু ঘটত, তবে বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা অন্য শিক্ষকরা অবশ্যই টের পেতেন।’ সিসি ক্যামেরার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘লিফটের কাছে সিসি ক্যামেরা রয়েছে। আমরা প্রক্টর স্যারকে অনুরোধ করেছি, ফুটেজ যাচাই করার জন্য। যাতায়াতের দিক বিশ্লেষণ করলে হয়তো সিসি ক্যামেরায় বিষয়টি ধরা পড়তে পারে।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আত্মহত্যা করা ওই ছাত্রীর কাছে একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। সেই চিরকুটের সূত্র ধরে এবং শিক্ষার্থীর ফোনে থাকা কিছু নথিপত্র বা ডকুমেন্টের ভিত্তিতেই পুলিশ ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও শিক্ষক একই বিভাগের। আমরা জেনেছি ওই ছাত্রী কিছুটা সিনিয়র ছিল। পুরো বিষয়টি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খতিয়ে দেখছে।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার এসআই ইকবাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে আমরা একটি চিরকুট (সুইসাইড নোট) উদ্ধার করেছি। সেখানে ওই বিভাগের একজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ ছিল। সেই চিরকুটের সূত্র ধরেই তার পরিবার মামলা করে। মামলায় কেবল একজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কিনা, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।’ তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে মিমোর মোবাইল ফোন থেকে কিছু তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। যেখানে ওই শিক্ষক জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এ হত্যায় মিমোর এক সহপাঠীকেও আটক করা হয়েছিল। তার সংশ্লিষ্টতা না থাকায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে মিমোর আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করে বাড্ডা থানা পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কাজী ইকবাল হোসেন তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীর পক্ষে তার আইনজীবী ফুল মোহাম্মদ জামিনের আবেদন করেন। তিনি আদালতে বলেন, আসামি একজন ভালো শিক্ষক। ঘটনার কিছুই জানেন না। তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জামিনের বিরোধিতা করেন। শুনানি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
