চার দিন আগে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে প্রতি মণ চিনি বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৬৪০ টাকায়। গতকাল শনিবার সেই চিনির দাম উঠেছে ৩ হাজার ৭৪০ থেকে ৩ হাজার ৭৬০ টাকায়। প্রতি মণে বেড়েছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত। হঠাৎ এই দাম বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলেন, পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিগত এক সপ্তাহ ধরে চাহিদানুযায়ী চিনি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। বাজারে চিনির দামের ওপর এর প্রভাব পড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারের চিনির চাহিদা অনেকটা পূরণ করত চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় অবস্থিত এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। গত ৩১ জুলাই কাঁচামাল সংকটের কারণে চিনি পরিশোধনকারী কারখানাসহ এস আলম গ্রুপের ১১টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে চিনির সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এ পরিস্থিতিতে মেঘনা গ্রুপের চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা সুগার রিফাইনারি লিমিটেড ও সিটি গ্রুপের সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের চিনি দিয়ে এ ঘাটতি পূরণ করতে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি দেশে গ্যাস সংকটের কারণে এ দুটি রিফাইনারিতেও উৎপাদন কমে গেছে। এ ছাড়া ইগলু ব্র্যান্ড চিনির উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী আরএম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আলমগীর পারভেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে গত কয়েক দিন ধরে চিনির সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হচ্ছে। ‘ইগলু ব্র্যান্ডের চিনি পরিশোধনকারী কারখানার উৎপাদন চার দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফ্রেশ ব্র্যান্ডের চিনিও রেশনিং করে দেওয়া হচ্ছে। আগে দৈনিক ৬-৭ হাজার টন ফ্রেশ ব্র্যান্ডের চিনি সরবরাহ করা হতো। এখন সরবরাহ করা হচ্ছে দেড়-দুই হাজার টন। এ ছাড়া সিটি গ্রুপ থেকে দৈনিক ১০০-১৫০ টন চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির আইনবিষয়ক সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বাজারে চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। একই কারণে চিনি ছাড়াও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দামেও প্রভাব পড়ছে বলে জানান তিনি। এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, আগের মজুদের কারণে এখনো বাজারে চিনির পুরোপুরি সংকট তৈরি হয়নি। তবে এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে সংকটের সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী হলেও এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। নগরীর আসকার দীঘিরপাড় কাঁচাবাজারের সুধীর স্টোরের স্বত্বাধিকারী সুধীর ধর এ প্রতিবেদককে বলেন, খোলা চিনি প্রতি কেজি ১০৫ টাকায় এবং ফ্রেশ ব্র্যান্ডের প্যাকেট চিনি ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া লাল চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা কেজি। একই দামে চিনি বিক্রি হতে দেখা গেছে লালখানবাজার এলাকার ফাহিম স্টোরেও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের চিনির চাহিদার জোগান আসত পাঁচটি শিল্প গ্রুপের রিফাইনারি থেকে। এগুলো হলো সিটি গ্রুপের ‘তীর চিনি’, মেঘনা গ্রুপের ‘ফ্রেশ চিনি’, এস আলম গ্রুপ, দেশ বন্ধু সুগার মিল ও আবদুল মোনেম লিমিটেডের ইগলু ব্র্যান্ড। এর মধ্যে ইগলু ব্র্যান্ডের চিনি পরিশোধন কারখানা আবুল খায়ের গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ওই কারখানা থেকে ‘স্টার শিপ’ ব্র্যান্ডের চিনি উৎপাদন করা হচ্ছে। এর মধ্যে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারের চিনির চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখত এস আলম গ্রুপের উৎপাদিত চিনি। কিন্তু কাঁচামাল সংকট, সম্প্রতি সৃষ্ট গ্যাস সংকটসহ নানা কারণে একাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ও হ্রাস পায়। গ্যাস সরবরাহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক পর্যায়ে না এলে চিনির সাপ্লাই চেইনে আরও সংকট তৈরির আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।