বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত পরিদর্শকদের (ইন্সপেক্টর) দীর্ঘদিনের দাবি তাদের পদমর্যাদা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অ্যাডিশনাল এসপি) সমমানের করার। তারা মনে করেন, বাহিনীতে তারাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার। এ জন্য এবার পুলিশ সপ্তাহে পরিদর্শকরা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ষষ্ঠ গ্রেড) পদের দাবি তুলবেন। এ বিষয়ে সম্প্রতি নন-ক্যাডার পুলিশ সদস্যদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন’-এর মিটিংয়ে আলোচনাও হয়েছে।
এছাড়া উপ-পরিদর্শক (এসআই), সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ও কনস্টেবলদেরও বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আগামী ১১ মে পুলিশ সপ্তাহে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া বৈঠকে নিয়োগের আনুপাতিক বৈষম্য, সিনিয়র এএসপি পদ বিলুপ্ত, সুপারনিউমারারি পদেও অসম বণ্টন, র্যাংক ব্যাজ পরিবর্তন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ এএসআই, নায়েক ও কনস্টেবলের গ্রেড উন্নতি করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
পরিদর্শক পদমর্যাদার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এ বিষয়ে বলেন, ‘পুলিশে নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির পদ ‘পরিদর্শক’, গ্রেড-৯। আবার বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে প্রথম শ্রেণির যোগদানও হয় একই গ্রেডে। এই একই গ্রেডে বাহিনীতে রয়েছে তিনটি পদ। পরিদর্শক (এক পিপস), সহকারী পুলিশ সুপার (দুই পিপস) ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (তিন পিপস)। ফলে পদোন্নতি পেলেও আমাদের একই গ্রেডে চক্কর খেতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা পিপসের পরিবর্তন না, গ্রেডেরও পরিবর্তন চাই।’
জানা যায়, বাহিনীতে বর্তমানে এএসপি পদে সরাসরি নিয়োগ এবং পদোন্নতিপ্রাপ্ত এএসপির আনুপাতিক হার প্রায় ৭০:৩০। এই ভারসাম্যহীনতার কারণে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দ্রুত উচ্চতর পদে চলে গেলেও পদোন্নতি প্রত্যাশীদের পথ ক্রমশ সকীর্ণ হয়ে আসছে। অনেকেই ১৫-১৭ বছর একই পদে আটকে থাকছেন। আবার প্রায় একযুগ পর পদোন্নতির মুখ দেখলেও তাদের থাকতে হচ্ছে একই গ্রেডে।
এ বিষয়ে পরিদর্শকদের বক্তব্য, পরিদর্শক হওয়ার ১০ বছর পরও যদি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসপি-গ্রেড ৬) করা হয়, তবে এ জন্য সরকারের কোষাগার থেকে বাড়তি অর্থ খরচ হবে না। কারণ এ সময়ে একজন পরিদর্শকের বেতন স্কেল দাঁড়ায় ৩৫,৮৮০ টাকা। অন্যদিকে কজন নতুন ডিএসপি যোগদান করেন ৩৫,৫০০ টাকা বেতন স্কেলে।
তারা বলেন, ২০১৮ সালে প্রথমে ২৫৩টি সিনিয়র পুলিশ সুপার পদ বিলুপ্ত করে সমসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদ সৃজন করে সরকার। পরে ২০২০ সালের ১৫ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ২১৫টি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদ বিলুপ্ত করে ২১৫টি পুলিশ সুপার পদ সৃজন করে। এরপর ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর অতিরিক্ত ডিআইজি ১৪০টি, ডিআইজি ৬৫টি এবং অতিরিক্ত আইজিপি ১০টি পদ সৃজনের মাধ্যমে সিনিয়র পর্যায়ে ৪৩০টি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়। এতে ২৫৩টি সিনিয়র পুলিশ সুপার পদ বিলুপ্তি কার্যত সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদ বিলুপ্ত হয়। ফলে পরিদর্শকদের এএসপি পদ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
দাবি-দাওয়া : এএসপিদের সমসংখ্যক পদ সৃষ্টি করে পরিদর্শকদের ডিএসপি পদে পদোন্নতি দিতে হবে। এরপর এসপি পদে ৪০ শতাংশ নন-ক্যাডার (বিসিএস ৬০ শতাংশ) থেকে পদোন্নতির দাবি তাদের। এভাবে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে ৩০ শতাংশ (বিসিএস ৭০ শতাংশ), ডিআইজি পদে ২০ শতাংশ (বিসিএস ৮০ শতাংশ) কোটা ভিত্তিক পদোন্নতিসহ অতিরিক্ত আইজিপি পদে দুজন নন-ক্যাডার অফিসারের পদোন্নতি নিশ্চিত করার দাবি পরিদর্শকদের। সেইসঙ্গে পুলিশ পরিদর্শক পদে ১০ বছর চাকরির পর টাইম স্কেল প্রদানপূর্বক ৬ষ্ঠ গ্রেডে উন্নীত করারও দাবি।
এছাড়া পরিদর্শক পদে তিন ক্যাটাগরিতে (নিরস্ত্র, সশস্ত্র ও শহর-যানবাহন) পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি সম্পূর্ণ বাতিল করার দাবি তুলেছেন নিরস্ত্র পরিদর্শকরা।
র্যাংক ব্যাজ পরিবর্তনের দাবি : পুলিশ পরিদর্শকদের ১ম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে উন্নীত হওয়ার নীতিমালা অনুযায়ী তাদের ২টি পিপস প্রদান করতে হবে। এছাড়া পরিদর্শকদের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
এসআই-সার্জেন্টদের ২য় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে র্যাংক ব্যাজ পরিবর্তন করে বর্তমান ২-ফুলের পরিবর্তে এক পিপস প্রদান করতে হবে। সড়কে সংঘটিত ফৌজদারি অপরাধ ও সড়ক দুর্ঘটনার মামলার তদন্ত ক্ষমতা সার্জেন্টদেরও প্রদান করতে হবে। এছাড়া এএসআই-এটিএসআইদের সদস্যদের একীভূত করে এএসআই (নিরস্ত্র) পদে নিযুক্তসহ ভবিষ্যতে এটিএসআই পদে পদায়ন বন্ধের দাবি জানিয়েছে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।
গ্রেড পরিবর্তনের দাবি : পুলিশ সপ্তাহে এএসআই ও এটিএসআই পদে কর্মরত সদস্যদের বেতন ১৪তম গ্রেড থেকে উন্নীত করে ১২তম গ্রেড; নায়েকদের বেতন ১৬তম গ্রেড থেকে উন্নীত করে ১৩তম গ্রেডে এবং কনস্টেবল পদে কর্মরত সদস্যদের বেতন ১৭তম গ্রেড থেকে উন্নীত করে ১৪তম গ্রেডে নির্ধারণ করার দাবি-দাওয়া উঠছে।
এ বিষয়ে পুলিশের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পরিদর্শক কামরুল হাসান তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একই গ্রেডে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার পর পুনরায় সেই গ্রেডে পদোন্নতি প্রদান প্রশাসনিক নীতিমালা ও যৌক্তিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’ তিনি বলেন, ‘পদোন্নতির মূল উদ্দেশ্য দায়িত্ব ও মর্যাদার পাশাপাশি গ্রেডগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা।’ সে বিবেচনায় বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পরিদর্শক পদে ১০ বছর চাকরি করলে, একজন পরিদর্শকের বেতন স্কেল অতিরিক্ত এসপির বেতন স্কেলের সমান হয়।’ এজন্য পরিদর্শকদের ওই পদেই পদোন্নতি দেওয়ার দাবি পুলিশ সপ্তাহে আলোচনা তোলার কথাও জানান তিনি।
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া হলে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি যেমন হয় তেমনি প্রশাসনে বিশৃঙ্খলাও দেখা দেয়।’ তিনি ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের নিয়োগ প্রক্রিয়া ভিন্ন হওয়ায় অতিরিক্ত ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির বিষয়টি ঝুঁকি তৈরি করবে উল্লেখ করে বলেন, ‘পরিদর্শকদের অন্যভাবেও প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। তবে ক্যাডার বাহিনী হিসেবে র্যাংক ব্যাজ সমপর্যায় করার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।’