সাতচল্লিশে যুদ্ধ হয়নি দাঙ্গা হয়েছিল

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৬ এএম

একাত্তরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীনতা এসেছে। কিন্তু সাতচল্লিশে যুদ্ধ হয়নি, দাঙ্গা হয়েছিল। শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, দুই ভ্রাতৃপ্রতিম সম্প্রদায়ের মধ্যে। প্রকৃত শত্রু ইংরেজ দাতার বেশে তাদের অনুগত কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে মানে মানে কেটে পড়েছিল, রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বাধিয়ে। কলকাতায় আমাদের থাকা সাত মাসও হয়নি, এমন সময় খবর এলো স্বাধীনতা আসছে এবং তাতে দেশটি ভাগ হয়ে যাবে এবং আমাদেরকে কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হবে ঢাকায়। ব্রিটিশ-বিদায়ে স্বাধীনতা আসবে এটা জানা ছিল, কিন্তু দেশ যে ভাগ হয়ে দুই টুকরো হয়ে যাবে, এটা আমাদের কারও সুদূরপ্রসারী কল্পনার মধ্যেও ছিল না। বড়দের নয়, আমরা যারা ছোট তাদের তো নয়ই। আমরা জানতাম কলকাতায় এসেছি, বসবাসের ও পড়াশোনার একটা ব্যবস্থা হয়েছে, এটাই দীর্ঘস্থায়ী হবে। কলকাতায় দাঙ্গা হয়েছে, নিরাপত্তার সমস্যা ১৯৪৭ সালেও ছিল, তাই বলে কলকাতা যে আমাদের শহর নয়, এমনটা মনে হয়নি। কলকাতায় এসে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যতটা যোগাযোগ ঘটেছে, সেটা গ্রামে তো নয়ই, অন্য কোনো শহরেও সম্ভব ছিল না। কলকাতায় কত কিছু আছে দেখার, জায়গা আছে ঘুরার, অনুভব করার সুযোগ আছে ইতিহাসের নায়কদের অদৃশ্য ঐতিহাসিক উপস্থিতি, আশা রয়েছে ওই মহানগরে থেকে পড়াশোনা করব প্রেসিডেন্সি কলেজে, দেখব বড় একটা জগৎকে। সেই শহর ছেড়ে চলে যাওয়া যে সত্যি সত্যি ঘটবে, সেটা প্রথমে ধারণার মধ্যে আনতে পারিনি। ব্যাপারটা পরে যতই স্পষ্ট হয়েছে, অস্বস্তি ততই বেড়েছে।

স্বাধীনতা তো উল্লাস আনবার কথা। তার জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম চলেছে, প্রতীক্ষা ছিল সর্বজনীন ও আন্তরিক; কিন্তু স্বাধীনতা যে অখণ্ড বাংলাদেশকে দুই টুকরো করে ছাড়বে এটা মনে হয় কেউই ধারণা করতে পারেনি। উল্লসিত নিশ্চয়ই কেউ কেউ হয়েছিলেন। যেমন দুপক্ষের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা। এদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরাই ছিলেন প্রধান। তারা খুশি হয়েছেন উঠতি মুসলমান প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রস্থান ঘটবে ভেবে। বিপরীত দিক থেকে উঠতি মুসলিম ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরাও স্বস্তি পেয়েছেন প্রতিষ্ঠিত বড় প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে উন্নতির জন্য তাদের পথটা প্রশস্ত হয়ে যাবে মনে করে। পেছনে তাকিয়ে পরিষ্কার বুঝি যে বিড়লা, ডালমিয়া, টাটা এসব শিল্পগোষ্ঠী যে কংগ্রেসকে অর্থানুকূল্য সরবরাহ করত তার ভেতরে মুনাফার স্বার্থ মোটেই অকার্যকর ছিল না। অপরদিকে এটাও তাৎপর্যহীন মনে হয় না যে, দেশভাগের সময়ে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ যারা মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ এবং এম এ এইচ ইস্পাহানী উভয়েই ছিলেন ব্যবসা-বৃদ্ধি এবং শিল্প গড়ার ব্যাপারে উদ্যোগী। মওলানা আকরম খাঁ সাহিত্যিক, রাজনীতিক ও পত্রিকা প্রকাশনার জন্য বিশিষ্ট ছিলেন, কিন্তু বাংলা-ভাগে তার পত্রিকা আজাদ ও মোহাম্মদী যে একচেটিয়া হওয়ার সুযোগ পাবে, এটা ছিল নিশ্চিত। আর ইস্পাহানীরা তো ছিলেন পেশাগতভাবেই শিল্পপতি, তাদের খুবই সুবিধা হওয়ার কথা এবং তেমনটা যে ঘটেনি এমন নয়। যুদ্ধে-নিয়োজিত দুপক্ষের একত্রে যুদ্ধবিজয়ের এমন ঘটনা সচরাচর দেখা যায় কি? কিন্তু এরা তো ছিলেন প্রায় ভিন্ন গ্রহেরই অধিবাসী; সাধারণ মানুষ যারা চাকরিজীবী, ছোটখাটো ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, কর্মজীবী, তাদের মধ্যে উল্লাস দেখেছি বলে মনে পড়ে না। জুন মাসের ৩ তারিখে ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন যখন বেতার ভাষণে জানালেন যে, বাংলাদেশ খণ্ডিত হয়ে যাবে এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সভাপতিদ্বয় পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেই ‘স্বাধীনতা’ মেনে নিয়েছেন, তখন সামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে সব মানুষই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।

হিন্দু মহাসভাপন্থিরা অবশ্য বলে আসছিলেন যে, ভারতবর্ষ ভাগ হোক বা না হোক বাংলাকে অবশ্যই দ্বিখণ্ডিত করতে হবে। তাদের ছিল দুটি ভয়। একটা ভয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে কলকাতাসহ গোটা বাংলাদেশই হয়তো পাকিস্তানে চলে যাবে। আরেকটা ভয় অখণ্ড থাকলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাংলার প্রধানমন্ত্রিত্ব মুসলমানদের হাতেই থাকবে। হয় খাজা নাজিমুদ্দীন, নয় তো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হবেন। দুটি সম্ভাবনার কোনোটাই তারা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। হিন্দু মহাসভা যে তখন খুব বড় আকারের রাজনৈতিক দল ছিল তা মোটেই নয়, তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের জমিদার, মহাজন, মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, সর্বোপরি সংবাদপত্রের মালিক-গোষ্ঠীর মধ্যে দলটির ভালো সমর্থন ছিল এবং জাতীয় কংগ্রেসের ভেতরেও হিন্দুমহাসভামনস্ক নেতারা বেশ শক্তিশালী ছিলেন। ফলে কলকাতাবাসী হিন্দুরা হয়তো কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন; কিন্তু বাংলা যে সত্যি সত্যি দুই টুকরো হয়ে যাবে এমনটা তারাও নিশ্চয়ই ভাবেননি। মাউন্টব্যাটেনের ঘোষণা শুনে তারাও হকচকিয়ে গিয়েছিলেন বৈকি। তবে বাংলার কোন কোন এলাকা পাকিস্তানে পড়বে, কোনাংশ থাকবে ভারতের সঙ্গে, এটা অনিশ্চিত থাকায় তাদের কারও কারও মধ্যে অনিশ্চয়তার উদ্বেগও তৈরি হয়েছিল বটে। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে জানার পরও মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা যে উল্লসিত হয়েছিলেন এমন নয়। কলকাতা শত্রুপক্ষের করতলগত হয়ে যাবে, এটা মোটেই সুসংবাদ নয়, দুঃসংবাদই ছিল। তা ছাড়া কংগ্রেসের নেতাদের পক্ষ থেকে যে বলা হচ্ছিল বিভাজনটা সাময়িক, অচিরেই পূর্ববঙ্গ বুঝবে যে তার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়, তখন আকুতি দেখা দেবে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার, সে প্রচারণা যে একেবারেই প্রভাব ফেলেনি তাও নয়। কারণ শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ, বন্দর সবদিক থেকেই পূর্ববঙ্গ ছিল উপেক্ষিত এবং দুর্বল। আমরা কিশোররা নিশ্চুপ, আর বয়স্করাও এসব বিষয়ে যে খুব একটা আলাপ করতেন তাও নয়; কারণ তারা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন দেশভাগ তাদের জীবন ও জীবিকার ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে। এরই মধ্যে বাংলার ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশনে যখন ভোটাভুটিতে এটা স্থির হয়ে গেল যে, দ্বিখণ্ডিকরণ অনিবার্য এবং ব্যবস্থাপক সভায় মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যরা যখন সোহরাওয়ার্দীর পরিবর্তে খাজা নাজিমুদ্দীনকে নেতা নির্বাচিত করলেন এবং সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খাজা নাজিমুদ্দীন যখন ঘোষণা দিলেন ঢাকা হবে পূর্ব বাংলার রাজধানী, তখন আমাদের বয়স্ক আত্মীয়স্বজন ও জানাশোনাদের সবার মুখেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল।

ঢাকা তো একটা মফস্বল শহর বৈ নয়, ঢাকায় গিয়ে কোথায় বাসা পাওয়া যাবে, কেমন হবে থাকার ব্যবস্থা এসব নিয়ে তারা যে আলোচনা করবেন এমন অবস্থাও রইল না। কারণ সবাই ছিলেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং অনেকেরই ঢাকার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না। কলকাতায় কিন্তু কেউ কেউ ভালো অবস্থাতেই ছিলেন। কারও ছিল ব্যবসা, কারও পেশাগত প্রতিষ্ঠা, কেউ কেউ বসবাসের জন্য বাড়ি পর্যন্ত তৈরি করেছেন, আরেকাংশ তেমন সচ্ছল না হলেও গুছিয়ে বসেছিলেন। তারা কেউই এই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলতে পারলেন না যে, তাদের উদ্বাস্তু হয়েই প্রস্থান করতে হবে। মুসলমানদের স্বতন্ত্র বাসস্থান বলতে অবিভক্ত ভারতের কোন কোন এলাকা বোঝাবে মুসলিম লীগের নেতারা সেটা কখনোই স্পষ্ট করে বলেননি, হতে পারে বলতে সাহসও পাননি; তবে একটা প্রচার তো ছিল, বিশেষ করে প্রভাবশালী আজাদ পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয় স্তম্ভের ওপরে যে মানচিত্রটা ছাপত তদানুযায়ী, যে বাংলা ও আসামের পুরোটা নিয়েই গঠিত হবে পূর্ব বাংলা। তেমনটা না ঘটায় সার্বিকভাবে হতাশ হওয়ার কারণ ঘটেছিল অবশ্যই। দেশের স্বাধীনতা যে দেশের মানুষের জন্য এমন উল্লাসহীন হবে, সেটা কে কবে ভেবেছিল! এক কথায় বলতে গেলে, উদ্বাস্তুদশায় কলকাতা ছেড়ে যেতে হতে পারে, এটা ছিল কল্পনাতীত। মধ্য-কলকাতার মার্কুইস লেনে নিজেদের বাড়িতে থাকতেন, এক আত্মীয়-পরিবার। ছুটির দিনে সেখানে অন্যরাও যেতেন, বেশ একটা আনন্দের ঘটনা ঘটত। বাড়িটা ছোটই ছিল, তবু নিজেদের তো। এখন তারা কোথায় গিয়ে পড়বেন এই দুর্ভাবনায় বাড়ির হাসিখুশি ভাবটা মিলিয়ে গেল। কলকাতা শহর ইতিমধ্যেই হিন্দু এলাকা মুসলমান এলাকায় ভাগ হয়ে গিয়েছিল, হিন্দুপাড়ায় যে মুসলমানরা বংশানুক্রমে বসবাস করতেন দাঙ্গার ধাক্কায় তারা উৎপাটিত হয়ে পড়েছিলেন, দাঙ্গার পরে শান্ত অবস্থা দেখে যারা ফেরত গেছেন। কলকাতা ভারতের দখলে চলে যাবে, এই ভেবে তারা পড়লেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। কারও চেষ্টা দাঁড়াল, বসতবাড়ি বিক্রি করে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার। সবাই সফল হলেন না, যারা হলেন তারা দাম পেলেন না উপযুক্ত।

ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দাদের সঙ্গে যারা বাড়ি বদলের ব্যবস্থা করতে পারলেন, তারা মনে করলেন কপাল ভালো; যারা তখনো কলকাতা শহরে পাড়া-ছাড়া হয়ে পড়েছিলেন, তারা ভয় পাওয়া শুরু করলেন, বসতবাড়িতে আর ফেরত যেতে পারবেন না ভেবে। সবচেয়ে করুণ অবস্থাটা সৃষ্টি হলো কলকাতার উর্দুভাষী বাসিন্দাদের জন্য। আমরা নিজেরাও তেমন একটা ঘটনার সাক্ষী হয়ে গেলাম। খিদিরপুরে আমাদের বাসার যিনি বাড়িওয়ালা তাকে আমরা হাজী সাহেব বলতাম; তারা ওই শহরের অনেককালের বাসিন্দা, পাকিস্তান দাবির পক্ষে তাদের ভেতরে লড়কে লেঙ্গে মনোভাব সংক্রমিত হওয়ার কথা। হয়তো হয়েছিলও। এখন যখন পাকিস্তান একেবারে দোরগোড়ায় এসে হাজির হয়েছে, তখন তারা আবিষ্কার করলেন যে, তারা রয়ে যাবেন পাকিস্তানের বাইরে। তাদের আশা পরিণত হলো আতঙ্কে। আমরা ওই বাসা ছেড়ে চলে এলাম, কিন্তু বাড়িওয়ালাদের অবস্থাটা কেমন দাঁড়াল সেটা আর জানা হয়নি। তবে বেশ কয়েক বছর পরে আমার মেজ ভাই বলেছে ঢাকাতে সে হাজী সাহেবের একমাত্র নাতিকে দেখেছে ট্যাক্সি চালাতে। দূর থেকেই দেখেছে, কাছে গিয়ে বিড়ম্বিত করেনি। বেচারারা স্বপ্ন দেখেছিলেন পাকিস্তানের, আন্দোলনের মুখে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দাঙ্গায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখলেন, স্বাধীন পাকিস্তান চলে গেল তাদের নাগালের বাইরে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত