স্বাস্থ্যসেবায় আমরা কতদূর?

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪০ এএম

লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান নেতৃত্বের কাছে সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র সব নাগরিকের জন্য ন্যূনতম, নিরাপদ, সুলভ ও সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে। সংবিধানে স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, বাস্তবতা এখনো সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উন্নয়নের নানা সূচকে অগ্রগতি থাকলেও, স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত দুর্বলতা, সীমিত বিনিয়োগ, সেবার বৈষম্য এবং গুণগত মানের ঘাটতি আজও প্রবলভাবে প্রকট যা দৃশ্যমান। অস্বীকারের উপায় নেই, বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্য সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং টিকাদান কর্মসূচির বিস্তার আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এক সময় টিকাদান কভারেজে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হামসহ প্রতিরোধযোগ্য রোগের পুনরুত্থান, টিকার সরবরাহে ঘাটতি এবং কিছু এলাকায় টিকা গ্রহণে অনীহা সেই অর্জনের ওপর নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি সরলীকৃত ধারণা বিদ্যমান অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা এবং সুস্থ হওয়া। কিন্তু আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, পুষ্টি, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং সামাজিক আচরণের সমন্বিত কাঠামো।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি দেশের মোট রোগের প্রায় ৭০ শতাংশই জীবনযাত্রাজনিত এবং প্রতিরোধযোগ্য। তাই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার না দিলে, হাসপাতালনির্ভর ব্যবস্থার ওপর চাপ বহুগুণে বাড়ে। আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো, সচেতনতার ঘাটতি। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ, এখনো কুসংস্কার ও অপচিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল। সাপের কামড়, ডায়রিয়া কিংবা সাধারণ জ¦রের মতো সমস্যাতেও, অনেক সময় আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে ওঝা-গুণীনের ওপর নির্ভর করা হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসা গ্রহণে দেরির কারণে গ্রামীণ মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বাংলাদেশ বর্তমানে জিডিপির প্রায় ১.২-১.৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম। তুলনায় ভারত প্রায় ২.১%, শ্রীলঙ্কা প্রায় ৩% এবং থাইল্যান্ড ৩.৫% ব্যয় করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী, একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য ন্যূনতম ৫% জিডিপি স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা প্রয়োজন। এই বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। স্বাস্থ্যবাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা গেলে,  কয়েকটি কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব হবে। প্রথমত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবাকেন্দ্রগুলো কার্যকর হবে। দ্বিতীয়ত, উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল আধুনিকায়ন সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ সরবরাহ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। চতুর্থত, জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালু করা সহজ হবে, যা বর্তমানে প্রায় অনুপস্থিত। চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। উন্নত আইসিইউ (ICU), সিসিইউ (CCU), ভেন্টিলেশন সাপোর্ট, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং ইমেজিং প্রযুক্তি (CT Scan, MRI) ছাড়া আধুনিক চিকিৎসা অসম্পূর্ণ। কোভিড-১৯ মহামারী দেখিয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য  ICU  শয্যার সংখ্যা WHO মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। ফলে সংকটকালে স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাপ সামলাতে হিমশিম খায়। টারশিয়ারি বা তৃতীয় স্তরের হাসপাতাল উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে টারশিয়ারি সেবা দেওয়া হয়, কিন্তু রোগীর চাপ অত্যধিক। ফলে সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলা পর্যায়ে টারশিয়ারি হাসপাতাল গড়ে তোলা, বিদ্যমান হাসপাতালের সম্প্রসারণ এবং বিশেষায়িত কেন্দ্র স্থাপন জরুরি। মানবসম্পদ উন্নয়ন স্বাস্থ্য খাতের মূল ভিত্তি। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স, প্যারামেডিক্স, টেকনোলজিস্ট এবং স্বাস্থ্য সহকারীর ঘাটতি এখনো প্রকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী চিকিৎসক-নার্স অনুপাত ১:৩ হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে তা এখনো অনেক কম। ফলে চিকিৎসাব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যায়।

চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত উৎকর্ষ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২০টিরও বেশি মেডিকেল কলেজ থাকলেও, অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান সমান নয়। পাঠ্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে পুরনো কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক চিকিৎসা শিক্ষায় competency-based medical education (CBME) একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড, যেখানে জ্ঞান নয়, দক্ষতা ও ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশে^র উন্নত দেশে Problem Based Learning (PBL), Objective Structured Clinical Examination (OSCE বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও এসব পদ্ধতির বিস্তার প্রয়োজন। একই সঙ্গে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি করা জরুরি। চিকিৎসা শিক্ষায় নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন চিকিৎসক কেবল রোগ নিরাময়কারী নন; তিনি একজন মানবসেবক। রোগীর সঙ্গে সহানুভূতিশীল যোগাযোগ চিকিৎসার ফলাফলকে বহুগুণে উন্নত করে। তাই মেডিকেল শিক্ষায় ethics I communication training  বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। ডিজিটাল প্রযুক্তি স্বাস্থ্য খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। টেলিমেডিসিন, ই-হেলথ রেকর্ড এবং মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসা সহজলভ্য করতে পারে। তবে অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে, এর পূর্ণ সুবিধা এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।  স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের অপচয় স্বাস্থ্যসেবার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মাননিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা দরকার। পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকিও ক্রমে বাড়ছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ বিশে^ অন্যতম শীর্ষে, যা শ্বাসতন্ত্র, হৃদরোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (NCD) যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৮% এখন NCD-সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাংকের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে একটি দেশের GDP প্রবৃদ্ধি ১-২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।  কারণ, সুস্থ জনগোষ্ঠী উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।

স্বাস্থ্য খাতকে ব্যয় নয়, বরং কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অর্জনের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা ও বৈষম্য স্পষ্ট। স্বাস্থ্যবাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা, আইসিইউ ও টারশিয়ারি হাসপাতাল সম্প্রসারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করা ছাড়া একটি টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই রাষ্ট্রের মানুষের প্রত্যাশা যথার্থ। স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সংবিধানে মানবিক অক্ষরে লেখা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। যেখান থেকে পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। যে করেই হোক, স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিতে হলে আন্তরিকভাবে রাজনৈতিক আদর্শগত মতভেদ ভুলে এককাতারে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। সবার হৃদয়ে থাকুক বাংলাদেশ। মানুষ জেগে উঠুক, নতুন স্বপ্ন নিয়ে।

লেখক: ওষুধ বিশেষজ্ঞ  ক্লাসিফাইড স্পেশালিস্ট আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত