বাঙালির উৎস সন্ধানে

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম

প্রথম দেখায় প্রশ্নটি একটু অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। যারা বাংলা ভাষায় কথা বলি, তারা কি সবাই বাঙালি নই? ভাষাকেই আমাদের পরিচয় মনে করা হয় এবং সেখান থেকেই ইতিহাসের শুরু করে অনেকে। আমরা বাঙালি, ভাষা আন্দোলন ইত্যাদি ইত্যাদি...

সরি কিন্তু এই ভাষাবিষয়ক পরিচিতি খুব স্বল্প দিনের কথা। তার বহু আগে থেকে আমাদের শুরু ও এই অঞ্চলের মানুষ, ইন্দো-আর্যদের (যাদের থেকে এই ভাষার উদ্ভব) আসারও অনেক আগে থেকেই আছে। ইন্দো-আর্য ভাষা এই অঞ্চলের প্রথম ভাষা ছিল না। কিন্তু তখন কি কোনো নির্দিষ্ট একটি অঞ্চল বা একদল মানুষ ছিল?

তাহলে আমাদের ইতিহাস কোথায়? আমরা যে আর্য বংশোদ্ভূত শিকড় থেকে বাংলার জন্ম হয়েছে বলে দাবি করি, তার বাইরে ইতিহাস কী? আর্যদের আগমনের আগে যদি অন্য মানুষ থেকে থাকে, তবে তারা কারা ছিল? আর এসব আমরা জানলামই বা কী করে?

আজকাল ভাষা দিয়ে নয়, ডিএনএ দিয়ে সব বের করা হয়। আমরা যদি ডিএনএ তথ্যের দিকে তাকাই,  তবে দেখা যায়—ইন্দো-আর্যরা আগের গোষ্ঠীগুলোকে মূলধারা থেকে সরিয়ে দিয়ে একটি আর্থ-সামাজিক আধিপত্য তৈরি করেছিল। সে বিষয়ে পরে আসছি, তবে এই অভিবাসন ও বসতি স্থাপন শুরু হলো কবে থেকে?

আফ্রিকা থেকে যাত্রা?

আফ্রিকা থেকে শুরু?

বাঙালিদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গবিরোধী বর্ণবাদী মনোভাব যথেষ্ট রয়েছে। একই সঙ্গে আমরা ‘কালো তা সে যতই কালো হোক...’ টাইপের মানসিকতারও মানুষ, তাই অনেকের কাছে এটা শুনতে ভালো নাও লাগতে পারে যে, আমরাসহ পৃথিবীর সবাই আসলে আফ্রিকা থেকে এসেছি। বর্তমান বাংলা অঞ্চলের (আদি বাসিন্দা ছিল ‘নেগ্রিটস’ (Negrito) নামক গোষ্ঠী, যারা সরাসরি সেই আফ্রিকান উপজাতিদের সঙ্গে যুক্ত—যারা বহু শতাব্দী আগে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।

গবেষণা বলছে, ‘অস্ট্রো-এশিয়াটিক’ বা ‘প্রোটো-অস্ট্রালয়েড’ গোষ্ঠী (যাদের কেউ কেউ ‘নিষাদ’ও বলে) বাংলার প্রথম স্থায়ী বাসিন্দা। তাদের সরাসরি বংশধররা কি আজও আমাদের মধ্যে আছে? হ্যাঁ, তারা হলো সাঁওতাল, কোল, ভিল এবং আরও কিছু কৃষ্ণ রঙের ‘নৃগোষ্ঠী’—যারা প্রথম এই মাটিতে পা রেখেছিল।

এরপর সিন্ধু উপত্যকা থেকে আসে ‘অ্যানসিয়েন্ট অ্যানসেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান’ (অঅঝও) নামক একটি গোষ্ঠী এবং তারাও স্থানীয় নেগ্রিটস গোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায়। তারা ছিল শিকারি-সংগ্রহকারী (hunter gatherer) যুগের মানুষ এবং পরবর্তীকালে বাংলার অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে তারা মিশে যায়। উত্তর ভারতে এদের একটি অংশ ‘ইরানি কৃষক গোষ্ঠী’ বা ‘জাগ্রোস আর্যদের’ সঙ্গেও মিশ্রিত হয়। পরে এই আদি এএএসআই (AASI) গোষ্ঠী দক্ষিণ ভারতে চলে যায় এবং সেখানে তারা ‘দ্রাবিড়’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তারা দ্রাবিড়দের মতো হলেও আসলে প্রাক-দ্রাবিড় ছিল। তারা আদি (AASI) নেগ্রিটসদের পরেই আসে ভারতে।

পূর্ব এশীয় ও তিব্বতি-বর্মি

বাংলায় পূর্ব এশীয় এবং তিব্বতি-বর্মিদের আগমন পূর্বের অভিবাসনগুলোর মতো কোনো একক বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। সেটা ছিল হাজার বছর ধরে চলা ধারাবাহিক একটি প্রক্রিয়া, যার শুরু হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। সহজ কথায়, এদের আমরা ‘মঙ্গোলয়েড’ এই নামে আর কেউ এদের ডাকে না বর্ণবাদী শোনায় বলে, বলতে পারি যাদের উৎস পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে শুরু করে চীন পর্যন্তবিস্তৃত। এদের আদিদের বলা হয় ইস্ট এশীয়।

একটু সারসংক্ষেপ করি

আদি বসতি (নব্যপ্রস্তর যুগ) : পূর্ব এশীয় বংশোদ্ভূতদের প্রথম অভিবাসন নব্যপ্রস্তর যুগে (প্রায় ৫০০০-১০,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) ঘটেছিল।

তিব্বতি-বর্মিদের আগমন : এরা মূলত বৌদ্ধ যুগে বাংলার উত্তর ও পূর্ব অংশে বসতি স্থাপন করে।

জেনেটিক বা বংশগত প্রমাণ : গবেষণায় দেখা যায় যে, পূর্ব বাংলার মানুষের জিনে পূর্ব এশীয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রভাবের বড় অংশটি (প্রায় ১৫-২৫%) যুক্ত হয়েছে আজ থেকে প্রায় এক হাজার ৫০০ বছর আগে।

ইন্দো-আর্য

প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, ২০ হাজার বছর আগে এখানে মানুষের বসবাসের চিহ্ন পাওয়া যায় এবং সংগঠিত কৃষিকাজ শুরু হয় প্রায় ২ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। ইন্দো-আর্যদের প্রভাব শুরু হয় অনেক পরে মূলত খ্রিস্টপূর্ব ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ। তারা গঙ্গা অববাহিকা থেকে পূর্ব দিকে এসে স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যায়। তারা সংস্কৃতভিত্তিক ভাষা নিয়ে আসে, যা থেকে কালক্রমে বাংলার জন্ম হয় এবং বর্ণপ্রথাভিত্তিক সমাজ কাঠামো তৈরি করে।

আমরা আসলে কারা?

সহজ কথায়, আমরা হলাম একটি মিশ্র জাতি। শংকর জারি বলে না? সেটাই আমরা। বিষয় হলো পৃথিবীর সব জাতিই শংকর আর সবার পিতৃপুরুষ কালো মানুষ ও আর্য, আদি দক্ষিণ ভারতীয়, তিব্বতি-বর্মি এবং নিগ্রিটো সবাই মিলে আধুনিক বাংলা ও বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করেছে।

 ৪,০০০ বছর আগে : তামা যুগের বসতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

 ২,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ : ধান চাষকারী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

 ১১০০-৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ : বঙ্গ, পু-্র এবং সুহ্ম-র মতো আদি রাজ্যগুলো গড়ে ওঠে।

খ্রিস্টপূর্ব ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দী : ইন্দো-আর্যদের আগমন।

মানব পরিচিতি মসলা

কে কোথাকার সেটা জানতে হলে রান্নায় মসলা দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায় :

একজন তিব্বতি-বর্মি মানুষের ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন, এমনি একটা মসলার ফর্দি পাওয়া যাবে।

মূলত প্রাচীন উত্তর চীন বা তিব্বতি (প্রধান ভিত্তি) ।

আংশিক : স্থানীয় দক্ষিণ এশীয় (স্থানীয় মিশ্রণ) ।

সামান্য : দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় (ভ্রমণ পথের প্রভাব) ।

পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ

পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মানুষের ডিএনএকে একটি রান্নার রেসিপি হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে। দুই পারের মানুষের মধ্যেই প্রায় একই উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, তবে সীমানার এদিক-ওদিক ভেদে সেই উপাদানগুলোর ‘পরিমাণ’ বা মাপে কিছুটা তারতম্য রয়েছে।

বিশ্লেষণটি নিচে দেওয়া হলো

‘পূর্ব এশীয়’ মসলার প্রভাব

এটিই হলো সবচেয়ে বড় পার্থক্য। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ যেহেতু মিয়ানমার এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়গুলোর একেবারে কাছে, তাই সেখানকার মানুষের ডিএনএতে পূর্ব এশীয় বংশগতির প্রভাব কিছুটা বেশি।

বাংলাদেশ : সাধারণত ১৫% থেকে ২৫% পূর্ব এশীয় বংশগতি দেখা যায়।

পশ্চিমবঙ্গ : এখানেও একই ডিএনএ আছে, তবে পরিমাণে কিছুটা কম, সাধারণত ৫% থেকে ১৫%।

‘পশ্চিম’ বনাম ‘পূর্ব’ পৈতৃক ধারা

পৈতৃক দিকের ডিএনএ মার্কারগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায় :

পশ্চিমবঙ্গ : এখানে এমন অনেক মার্কার পাওয়া যায়, যা মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের দিকে নির্দেশ করে (প্রাচীনকালে পশ্চিম দিক থেকে আসা পরিযানের সঙ্গে যুক্ত) ।

বাংলাদেশ : এখানে এমন মার্কার বেশি পাওয়া যায়, যা পূর্ব এশিয়া (চীন, তিব্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) থেকে এসেছে।

বদ্বীপের সুরক্ষা কবচ (যৌথ ডিএনএ)

পার্থক্য থাকলেও উভয় অঞ্চলের মানুষ যেহেতু একই রকম জলাভূমি ও নদীবহুল পরিবেশে বাস করে, তাই তাদের ডিএনএতে কিছু অভিন্ন ‘সুরক্ষা কবচ’ তৈরি হয়েছে :

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা : কলেরা ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ থেকে বাঁচতে দুই পারের মানুষের ডিএনএতেই বিশেষ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যা এই বদ্বীপে হাজার বছর ধরে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।

রক্তের গ্রুপ : এই রোগগুলোর সঙ্গে লড়াই করার কারণেই এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ‘ঙ’ পজিটিভ রক্তের গ্রুপ হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কম এবং ‘অ’ অথবা ‘ই’ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

মূল বিষয়টি হলো ম্যাপে দেখলে এই ডিএনএর পার্থক্য কোনো ধারালো সীমানা রেখা দিয়ে আলাদা করা যাবে না। বরং এটি একটি ক্রমপরিবর্তনশীল বিষয়।

কলকাতা থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে ‘পশ্চিমা’ ডিএনএর প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসে এবং ‘পূর্ব এশীয়’ ডিএনএর প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মানুষ একে অপরের চাচাতো বা মামাতো ভাইবোনের মতো। তাদের চেহারা এবং পারিবারিক ইতিহাস প্রায় এক, তবে একজনের মধ্যে ‘পাহাড়ি বা পুবালি’ ছাপ কিছুটা বেশি, আর অন্যজনের মধ্যে ‘স্টেপ বা পশ্চিমা’ ছাপ কিছুটা বেশি।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত