মুখটি থাক অম্লান

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম

দেশ যে কেবল কোনো ভূমি নয়, বরং এটা একটা ধারণা, একটা অনুভূতি—এই বোধটা প্রথম আসে দেশ থেকে বহু দূরে থাকতে গেলে। দেশে থাকলে শুধু এর উপরিভাগ, একটা জমি, একটা রাস্তা কিংবা একটা ইমারতের দিকে চোখ যায়। একে কেবল আবাস মনে হয়, জন্মস্থান বলে সেখানে থাকার অভ্যাস তৈরি হয়, কিন্তু দূরে গেলে পাখির চোখে স্পষ্ট দেখা যায় ফেলে আসা দেশটা কেমন আর তা জীবনে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই দেশটা কেবল ভূমি নয়, বরং মাথার ভেতরে মানুষ সেটা বহন করে।

এমন নয় যে, দেশের বাইরে মানুষ যেখানে থাকে, সে জায়গাটা দেশের চেয়ে অসুন্দর বা সুযোগ-সুবিধায় নগণ্য। বরং উল্টোটাই। দেখা যায় ঝকঝকে আকাশের নিচে, পরিষ্কার রাস্তা আর সুসজ্জিত বাড়িঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অকারণে দূষিত বাতাস, দরিদ্র জনগোষ্ঠী পরিপূর্ণ রাস্তাঘাট আর নানা অসুবিধায় জর্জরিত দেশটিতে এক দৌড়ে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে। দেশের জন্য প্রাণ কাঁদে যখন তখন।

বস্তুত মানুষমাত্রই নিজের নিজের জন্মভূমির অভাব বোধ করে। আর সেই ভূমিটি যদি হয় বাংলাদেশ? বাংলাদেশের মানুষ এই অঞ্চলের মানুষের স্বভাবজাত কারণেই আবেগী হয়ে থাকে। তারা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, নিজের দেশের অভাব তাদের মনে থেকেই যায়; যাকে বলে ‘হোমসিকনেস’। দেশের কথা যখন তার মনে আসে তখন সে কী ভাবে? যেমন, একজন দূর দেশে বসে গুগল ম্যাপে তার বিদ্যায়তনের ছবিটা খুলে বসে থাকতে পারে। হয়তো সে সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে সরু রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, ক্লাসরুমে ঢোকে, ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে। স্মৃতিকাতর মানুষের স্মৃতিচারণের মূলেই থাকে শৈশব আর কৈশোর, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে কাটায় জন্মভূমিতে। একেকজনের কাছে জন্মভূমির আবেদন একেক। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে নাড়ির যোগাযোগের কথা ভাবতে গেলে অনেকের মনেই একটি কথা ভেসে উঠবে, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।’ কারণ এ তো কেবল কবিতা নয়, দেশপ্রেমের এক আধ্যাত্মিক তথা জাগতিক দর্শন। এমন একটা পঙ্ক্তি যা একবার পড়লে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক মানুষের আত্মায় বসে যেতে বাধ্য। যখন উচ্চারণ করা হয়, ‘হৃদয়ে বাংলার মুখ’ তখন সেভাবেই তা কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা বা মানচিত্রের কথা দিকে নির্দেশ করা হয় না। বরং নির্দেশ করে দেশটির অপূর্ব প্রকৃতি, ঋতুবৈচিত্র্য, হাজার বছরের উত্থান-পতনের ইতিহাস আর জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামের কথা। তাই হৃদয়ের আয়নায় সেই দেশের মুখটা যখন পড়ে তখন এটাকে কেবল প্রতিচ্ছবি বলা যাবে না, বরং তা হৃদয়ের গহিনে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের মতো।

বিষুবীয় বা মেরু অঞ্চলের অনেক দেশ আছে যেখানে সারা বছর কেবল একটিই ঋতুর আধিক্য। মানুষের মনও তাই প্রকৃতিক পরিবর্তনের জন্য উপযুক্ত নয়। অথচ বাংলাদেশের প্রকৃতি জড়বস্তু নয় মোটেই, যেন জীবন্ত সত্তা। এখানে আসে একের পর এক চমক যা যেমন প্রকৃতিকে নতুন রূপে সাজায়, তেমনি মানুষের মনস্তত্ত্বে আনে নবীন অনুভূতি। ‘কান্নাহাসির দোলদোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা, তারই মধ্যে চিরজীবন বইব গানের ডালা’ এই করেই যেন জীবনের একেকটা বছর জন্মভূমির প্রকৃতির আরও কাছে আসার সুযোগ পাওয়া যায়। বাংলার মানুষের জন্ম-মৃত্যু, কৃষি আর আর্থিক-মানসিক টনাপড়েন সবই ঋতুনির্ভর।

এ অঞ্চলের মানুষ বারবার পুরনো সবকিছু ঝেড়ে ফেলে, জরা-ব্যাধিকে ভুলে মানুষ আবারও নতুনের আহ্বানে উঠে দাঁড়ায়। তাই তো বৈশাখকে আহ্বান জানিয়ে তারা বছর শুরু করে, যে আহ্বানে থাকে অবারিত উচ্ছ্বাস-আনন্দ। আবার গ্রীষ্মের খরতাপে দগ্ধ হয় তারা, সঙ্গে প্রকৃতিও। ‘দারুণ অগ্নিবাণে’ তৃষ্ণায় তখন একদিকে যেমন প্রকৃতি কাতর হয়, হয় মানুষও। অথচ খরতাপের মধ্যেই গুটি আমগুলো ডালে ডালে ঝুলে থাকে, ঝড়-বাতাসের দোলায় দোলে, আসন্ন পাকা আমের মধুর সময়ের ইঙ্গিতে প্রকৃতিতে চারদিক আনন্দে মুখর থাকে। তারপর বর্ষা আসতে আসতে পাকা আম ঘরে আসে। পারিবারিক সুন্দর সময় যেমন কাটে তেমনই রাস্তাঘাটে বৃষ্টির পানির আধিক্য জনজীবনে নানা দুর্ভোগও আনে। বৃষ্টি নিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের আবেগের শেষ নেই তবু। বিশেষ করে গ্রীষ্মের খরতাপের পরে প্রাণের আরাম বৃষ্টির জলীয়বাষ্প আর তার ঝরঝর টুপটাপ শব্দ। কমবেশি বৃষ্টি হতে হতেই কবে যেন শরৎ উঁকি দেয়। যখন রাত শেষে ভেজা ভেজা কিছু শিউলি পড়ে থাকে ঘাসের ওপরে, তখন বলা যায়, ‘আমার রাত পোহাল শারদ প্রাতে।’ মাথার ওপরে চকচকে সাদা আর নীল আকাশ তখন সারাদিন। তারপর একদিন  সকাল সকাল কুয়াশার মতো শিশিরে ভিজে যায় ঘাস। মাঠের ফসলে সোনালি রঙ ধরে। কৃষকের ব্যস্ততা বাড়ে সে ফসল ঘরে তোলার আয়োজনে। হেমন্ত সবদিক দিয়ে প্রাচুর্যময় ঋতু। শুধু যে জানে হেমন্তের আবেগ, সে ‘শিশিরের শব্দ’ শুনতে পায় কবির মতো হৃদয়ের গহিনে। শেষে একদিন এসব কিছুর মধ্যে দিয়েই কোথা থেকে যেন এক অনন্য গন্ধের বাতাস আসে। সে বাতাস আগের সব শীতের স্মৃতি বয়ে আনে। কোথা থেকে আসে ওরকম বাতাস, হিমালয়? হিম হিম শীতল দিনগুলো ক্রমাগত ধূসর হতে থাকে। নাতিদীর্ঘ দিন চোখের পলকে উবে যায় আর দীর্ঘ শীতল রাত গৃহহীন আর সংগতিবিহীন মানুষকে ফেলে চরম দুর্দশায়। তবে বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তনের ধারায় এখন শীতকাল এতই ক্ষণস্থায়ী যে, ভালোমতো আসতে না আসতেই বিদায়। সবার শেষে বসন্ত এসে নানা রঙের ফুলে ফুলে সারা বছরের ক্লান্তি ঝরিয়ে দেয়। উদাস বাতাস আর কী যেন নেই, কী যেন হারিয়ে গেল এই ভাবনার মাঝখানে কখনো চৈত্রের দাবদাহ, কখনোবা কালবৈশাখীর ভয়াল রূপ এসব মিলিয়ে বাংলার ষড়ঋতুর একটা ছবি বাঙালির হৃদয়ে থাকে।

আবার বাঙালির হৃদয়ে যে কেবল বাংলার পেলবিত স্নিগ্ধ রূপটিই থাকে, তা নয়। ঐতিহাসিকভাবে বাংলায় যে দীর্ঘ সংগ্রামের ও আক্রমণ বা পরাধীনতা থেকে উত্তরণের ইতিহাস আছে, তার আছে এক রক্তিম রূপ। ইতিহাস সাক্ষী, এই জনপদের মানুষ বারবার পরাধীনতার কবলে পড়েছে, কিন্তু কখনো চিরকালের জন্য মাথা নত করেনি। বখতিয়ার খলজির আগমন থেকে শুরু করে তিতুমীর, সূর্য সেনের লড়াইয়ের মহিমা চিরকাল বহন করে বাংলার ইতিহাস। বাঙালির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভাষা। ভাষার অধিকারের জন্য লড়াই করেছে, পৃথিবীতে এ রকম আর একটিও জাতি নেই। ১৯৫২ সালের ভাষা সংগ্রাম তাই এই জাতির জন্য অনন্য এক সংগ্রামের স্মৃতি, যা বাংলার সত্যিকারের রূপ। এরপর ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লাখ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় এই জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পরও বারবার নিজের অধিকারের জন্য দাঁড়াতে ভোলে না বাংলাদেশের জনগণ। তাই তো, নব্বইয়ে একবার, চব্বিশে আরেকবার জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে শোষককে রুখে দিয়েছে। হৃদয়ে বাংলার রূপ বলতে তাই বাংলার সংগ্রামী এক প্রতিচ্ছবি খেলা করে।

বাংলার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ছবিটি ধরা পড়ে এর সংস্কৃতির প্রকাশে। বাংলার সাহিত্য, চিত্রশিল্প, সংগীত, চলচ্চিত্র ইত্যাদি নানা মাধ্যমে দেশের যে রূপ আঁকা আছে তা অবিস্মরণীয়। জাতীয় সংগীতের কথাই যদি ধরি, ‘কী শোভা কী ছায়া গো, কী স্নেহ কী মায়া গো, কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে নদীর কূলে কূলে।’ বাংলার দেশাত্মবোধক গানে গানে এভাবেই দেশের স্নিগ্ধ ছবি আঁকা আছে। তাই তো এর অধিবাসীরা জানে, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।’ বাংলা সাহিত্যে কী গল্প-কবিতা, কী উপন্যাসে বাংলার মানুষের ব্যবহার, স্বভাব, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক আর সৌন্দর্যের বর্ণনা মিশে আছে। আছে এ অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক টানাপড়েনের কথা। সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে ব্যক্তি মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়ে, তার কথা। ইতিহাস সন-তারিখ দিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা বলে, কিন্তু একটি চলচ্চিত্র, একটি উপন্যাস সুনির্দিষ্ট একটি পটভূমিতে নারী-পুরুষের জীবনযাপন দেখায়, দেখায় কী আনন্দ-বেদনার মধ্য দিয়ে প্রতিটি জীবন অতিবাহিত হয়। তাই ব্যক্তি-মানসের প্রাপ্তি বা অবদমন বেরিয়ে আসে গানের একটি কলিতে, চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে কিংবা উপন্যাসের কাহিনির উত্থান-পতনে। এ দেশের মাটির কাছাকাছি যে ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালী গান, লালন-রবীন্দ্র-নজরুল আর যুগে যুগে গীতিকার-সুরকারের বুক চিরে সৃষ্টি হওয়া শব্দ-সুর মানুষকে চিরকাল উদ্বেলিত করে। দেশের সংস্কৃতির এই রূপটি তাই মানুষের হৃদয়ে বহমান।

এই অঞ্চলের মানুষ মূলত শ্রমজীবী। কৃষি এদেশের প্রধান আয়ের উপায়। তাই এদেশের একটা ছবি ভাবতে গেলে সামনে আসবে অবারিত ধানক্ষেত আর তাতে কর্মরত মাথাল মাথায় কাদামাখা কৃষক। সারা দেশের মানুষের মুখে ভাত-ডাল, সবজি, মাছ তুলে দিতে উদয়াস্ত পরিশ্রম যে জনগোষ্ঠীর। সামনে আরও আসবে ছোটখাটো কলকারখানা থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্প-কারখানায় মেশিন-টুলস আর কেমিক্যাল নিয়ে কাজ করা অসংখ্য মানুষের মুখ। কেউ ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করছে, কেউবা দিনভর সেলাই মেশিনের সামনে বা কাঁচি হতে খ্যাচ খ্যাচ কাপড় কাটছে। রিকশাওয়ালা-মুচি-কামার-কুমার-জেলে আরও আরও কত মানুষ যে বাংলাদেশের প্রকৃত প্রতিচ্ছবিতে গেঁথে আছে তার ইয়ত্তা নেই। গ্রীষ্মপ্রধান তপ্ত এলাকায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষের শক্ত সুগঠিত পেশি যেমন শিল্পী সুলতানের চিত্রকল্পে উঠে আসে, বাংলার প্রতিচ্ছবি ঠিক তাই।    

এখন বিশ্বায়নের যুগ। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে বিশ্বের বিচিত্র সংস্কৃতির উপাদানের আদান-প্রদান এখন এত ব্যাপক হারে ঘটছে যে, কোথাও জাতীয়তাবাদী চেতনাকে কট্টর হয়ে ধরে রাখা কঠিন। এক জাতির পোশাক বা খাবারের সঙ্গে অন্য জাতির পোশাক-খাবারের মিশ্রণ হচ্ছে। ধীরে ধীরে এমনও দিন আসতে পারে যে, সামান্য আলুভর্তা বানাতে গেলেও তরুণ প্রজন্ম মাখন-পনির খুঁজবে। পৃথিবীময় জনপ্রিয় পোটেটো ম্যাশের প্রভাব এসে পড়ল বলে! আগে তরুণরা রাতে ঘুমাত, দিনে কাজ করত। এখন মঙ্গোলিয়ানদের ‘নাইট লাইফ’ এখানে জনপ্রিয়, তাদের মতো রাতের বেলা ঘোরাঘুরি, খাওয়ার চর্চা চলছে। এভাবে বদলে যেতে যেতে হয়তো একদিন আর একচ্ছত্র বাংলার মুখ হৃদয়ে ভেসে উঠবে না। আবার এসব ‘ফিউশন’ হতে হতেও কিছু না কিছু বাঙালির হৃদয়ে আজন্মের মতো থেকে যাবে, এটাও নিশ্চিত। যতই ফিউশন হোক, আবার প্রকৃতি যতই নিঃস্ব হোক নদী হারিয়ে যাক, বাতাস দূষিত হোক, এখনই যদি একটা আন্তর্জাতিক খেলা জমে তবে তরুণদের লাল-সবুজের পতাকা হাতে সেখানে দেখা যাবে। দেশের প্রতি ভালোবাসা বাঙালির হৃদয়ে সহজাত।

এভাবে হৃদয়ে বাংলার যে মুখটি আঁকা আছে, তা কোনো অলীক কল্পনা নয়, বরং এ এক শাশ^ত অনুভূতি। এই ছবিটিকে রক্ষা করতে নিশ্চয়ই বাঙালি জাতি পরিবেশ আর সংস্কৃতি রক্ষায় সতর্ক হবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত