অংশগ্রহণের অনুপস্থিতি নাকি ঠিকঠাক ডাকের অপেক্ষা

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম

‘হৃদয়ে বাংলার মুখ’ বাক্যটি আমাদের আবেগের অংশ, পরিচয়ের অংশ, এমনকি কখনো কখনো গর্বেরও প্রতীক। কিন্তু এই উচ্চারণের ভেতরে যে মৌলিক প্রশ্নটা থেকে যায়, সত্যিই কি বাক্যটাকে হৃদয়ে ধারণ করি আমরা? নাকি কেবল একটি ধারণা আগলে পুনরাবৃত্তিতে অভ্যস্ত হয়েছি ক্রমশ? যে অভ্যেসের কারণে আমাদের বাস্তব জীবনের সংযোগ ক্ষীণ হয়ে এসেছে একটু একটু করে? এমন নয় যে এটা নিয়ে কিছু বলছে না, কিন্তু কথাটা বহুবার শুনলেও সত্যিই কি অনুভব করেছি?

সুতরাং আত্মপরিচয় কিংবা আবেগীয় আশ্রয়ের বাক্য উচ্চারণের সঙ্গে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সবসময় মিলছে না! এক সময় এটা এক ধরনের নীরব সরে যাওয়া মনে হলেও এখন অনেকটাই দৃশ্যমান ভাঙন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনৈক্যের হাহাকার স্পষ্ট হলেও শক্তিশালী কোনো উদ্যোগ নেই উল্টোদিকে হাঁটার। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত এই অমিল মেনে নিয়ে কোনো একটা বোঝাপড়ার প্রক্রিয়া শুরু না হলে যোগফল অমীমাংসিতই থেকে যাবে।

সমস্যাটা কোথায়? দেশাত্মবোধের যে আলাদা শক্তি এবং অনুপ্রেরণা থাকে; যে কারণে যে যার অবস্থান থেকে নিজের দেশটাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, নিজ দায়িত্বে উদ্যোগী হতে মন সাড়া দেয়। তেমন কারণ খুঁজতে হচ্ছে কেন? শহরের রাস্তার দুপাশে তাকালে সারি সারি উঁচু ভবন, চলমান যানবাহন, মানুষ... সবমিলিয়ে গতি আর ব্যস্ততার অদৃশ্য চাপ উপস্থিত। কিন্তু সেই উপস্থিতির ভেতরেই এক ধরনের অনুপস্থিতির অনুভূতি! আমরা আছি, কিন্তু একসাথে নেই। চলছি, কিন্তু একই পথে না। এই বিভাজনই হয়তো আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট এবং এই সময়ের বাংলাদেশে এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ চারপাশের বাস্তবতা আমাদের সামনে অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরছে, আমরা ক্রমশ একটি অংশগ্রহণহীন সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছি।

কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো? আমাদের সামাজিক মানসিকতার এত বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে কি অদৃশ্যভাবে? ধীরে ধীরে কেন আমরা ‘অংশগ্রহণকারী নাগরিক’ থেকে ‘দর্শক নাগরিক’-এ পরিণত হলাম? ব্যক্তিগতভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, অর্থনৈতিক চাপ, নানামুখী অনিশ্চয়তা, আদর্শহীনতা-দায়িত্বহীনতার প্রভাব এসবের ভেতর দিয়ে এদেশের মানুষ এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে সামাজিক বা সমষ্টিগত বিষয়ে সম্পৃক্ত হওয়াটকে অনেক ক্ষেত্রেই একটি অতিরিক্ত বোঝা বলে মনে হয়। ‘আমি কী করব?’ ‘আমার কিছু করার নেই।’ এমন ধারণা এখন কেবল বাক্য নয় বরং একটি মানসিক কাঠামো, যা আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপন এবং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। এই মানসিকতা তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার প্রভাব। ছোট ছোট অন্যায়, যেগুলো আমরা প্রতিদিন দেখি—রাস্তাঘাটের বিশৃঙ্খলা, পরিকল্পনার অভাব, পরিবেশের অবনতি—অব্যবস্থাপনা এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হলে মানুষ একটা সময় নির্বিকার—নিশ্চুপ হয়ে যায় ধীরে ধীরে, যেটা স্বাভাবিক। এই নীরবতা প্রথমে একটি আত্মরক্ষা, আরপর অভ্যাস এবং অবশেষে একটা বিশেষ পরিচয়ে পরিণত হয়। এই মানসিকতা কেবল সামাজিক আচরণেই সীমাবদ্ধ নয়; আমাদের আত্মনির্মাণ, সামগ্রিক পরিকল্পনা এবং সংস্কৃতির ভেতরেও গভীরভাবে স্থায়ী হতে শুরু করেছে বলেই সর্বনাশের অনেকগুলো দরজা খুলতে শুরু করেছে।

চলমান স্থাপত্যের দিকে তাকালে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। একটা সমাজের স্থাপত্য তার মানসিকতার প্রতিফলন, স্থাপত্য কেবল ইট, বালি, সিমেন্টের সমষ্টি নয়, বরং মানুষের সম্পর্ক, অংশগ্রহণ এবং অভিজ্ঞতার দৃশ্যমান রূপ। কিন্তু আমাদের বর্তমান বাস্তবতায় স্থাপত্যের মুখ্য অংশ শাসক শ্রেণি এবং পুঁজির নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ। যেখানে ‘ব্যবহারকারী’ আছে, কিন্তু প্রকৃত ‘অংশগ্রহণকারী’ নেই। মানুষগুলো শেষপর্যন্ত একটি স্থানের ভেতরে বসবাস করে, তাদের কণ্ঠস্বর প্রায়শই নকশার সব স্তরেই অনুপস্থিত। এখানে সিদ্ধান্ত আসে জীবনের মোড়ক থেকে, জীবনযাপন থেকে নয়। যে কারণে স্থাপত্য যতটা শো-কেস বা বিশেষ প্রদর্শনভঙ্গি বিবেচনা করে বাস্তবায়িত হয়, ততটা জীবনচর্চায় নয়। যে কারণে শহর গড়ে উঠলেও কমিউনিটি গড়ে উঠছে না। উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ হচ্ছে, কিন্তু মানুষের মধ্যে সম্পর্কের অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে না। তেমন সব অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিসর যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিলিত হতে, অংশ নিতে পারে। তেমন বিবেচনা বোধ ক্রমশ প্রভাবিত হচ্ছে বাণিজ্যিক শক্তি কিংবা উন্নয়ন দখলদারিতে। যে কারণে স্পষ্ট হচ্ছে ব্যক্তিগত সীমারেখা, আলাদা থাকা এবং এক ধরনের নীরব সহাবস্থান।

অংশগ্রহণহীন স্থাপত্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটি বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করছে। আমরা একই শহরে বাস করেও একই সমাজে বাস করতে পারছি না। আমরা একই ভবনে থাকছি, কিন্তু একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না। এই বিচ্ছিন্নতা শেষ পর্যন্ত আমাদের মানসিক কাঠামোর অংশ হয়ে যাচ্ছে বলেই তাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শিখছি।

সত্যিকারের বিবেচনাবোধ নিয়ে ঠিক কারা উদ্যোগ নেবে বা এগিয়ে আসবে, বলা মুশকিল। জরুরি প্রয়োজন ছিল আগ্রহী দলের। ছোট ছোট উদ্যোগ, আনুষ্ঠানিকতা, বিশেষ কিছু উদযাপনের আয়োজন আছে হয়তো বা, কিন্তু সেটা কি তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারছে? বিশ্বায়নের যুগে অনেক স্তরে নানান ভঙ্গিতে অ্যাডাপ্টেশন হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু বিশ্বকে জেনে নিজ জাতিসত্তা আগলে রাখার কেবল লোক দেখানো অভ্যেস হবার কথা নয়। এসব নিয়ে একই সংকট আমরা আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসরের সর্বত্র। একটি শক্তিশালী জাতির অন্যতম ভিত্তি তার নিজস্ব গল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রসহ শিল্পের অন্যান্য মাধ্যম, শাখাপ্রশাখা এবং সমাজচর্চা। ধর্ম এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর আরোপিত সংঘাত, ইতিহাসকে সার্কাসের অংশ বানানো এবং সেই অনৈতিক শক্তির উত্থানের কারণে কিছু ব্যক্তিগত কণ্ঠস্বর থাকলেও ভরসা করার মতো কোনো আগ্রহীদল খুঁজে পাওয়া যায় না। এক ধরনের নেতিবাচক আবহ সবসময় আচ্ছন্ন করে রাখছে। এটা আগামী প্রজন্মেও জন্য ঠিক কতটা হতাশার সেটা নতুন করে ব্যাখ্যা করারও প্রয়োজন নেই।

ব্যক্তিস্বার্থ এবং দলীয় দখলবাজির দাপটে সার্বজনীন সংযোগ স্থাপন সবসময় ব্যর্থ হচ্ছে। যে যার মতো নিজ নিজ রাস্তা খুঁজে নিচ্ছে শুধু নিজ স্বার্থের কারণেই। আমাদের গল্পগুলো বাস্তবতার প্রতিফলন এড়িয়ে অধিকাংশই বাজারের চাহিদার দিকে ঝুঁকে পড়ছে, কিংবা নিরাপদ গল্প বেছে নিচ্ছে, নিজেদের অভিজ্ঞতাকে উচ্চারণ করার সাহস হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে একটি অদ্ভুত দূরত্বের বাস্তবতা সবকিছুর ভেতর। যে দূরত্বের ফল একটি দুর্বল সাংস্কৃতিক মেরুদন্ড। একটি জাতির শক্তি তার গল্প মানুষকে নিজের সঙ্গে সংযুক্ত করে প্রশ্ন করতে শেখায়, যৌথ চেতনা তৈরি করে। সেই জায়গায় আমাদের ঘাটতি স্পষ্ট এবং এটা নতুন কোনো কথা নয়। এই ঘাটতির প্রভাব আমরা প্রতিদিনের জীবনে দেখতে পাই। নগর বিশৃঙ্খলা, পরিবেশগত অবক্ষয়, অব্যবস্থাপনা এসব শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং অংশগ্রহণহীন সমাজের লক্ষণ। যখন কেউ দায়িত্ব নেয় না, তখন সবাই তার ফল ভোগ করে। যখন কেউ প্রশ্ন করে না, তখন ভুলগুলো স্থায়ী হয়ে যায়।

আমাদের সমস্যা এতটাই বহুমাত্রিক যে, একক কোনো সমাধান দিয়ে এগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, এই সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হলে আমাদের একটি ভিন্নধর্মী সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যা হলো একাত্মতার সংস্কৃতি। এই একাত্মতা মানে একমত হওয়া নয়; বরং ভিন্নমতের ভেতরেও একটি মৌলিক সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়। মতভেদ থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই মতভেদের মধ্যেও শুধু দেশাত্মবোধের জায়গায় অভিন্ন দায়িত্ববোধ, যেখানে ব্যক্তি, দল, বা মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা একটি বৃহত্তর স্বার্থকে স্বীকার করি। এই জায়গাটি তৈরি না হলে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্ভব নয়। যখন প্রতিটি উদ্যোগ দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থের বলয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা কখনোই একটি সামষ্টিক শক্তি সফলতা পায় না, পরিণত হতে পারে না। বরং তা বিভাজনকে আরও গভীর করে। সুতরাং, এত সব নেতিবাচক বাক্যের খাঁচায় বাস করে যদি আমরা সত্যিই একটি পরিবর্তনের দিকে যেতে চাই, তাহলে এই সংকীর্ণ বলয় থেকে বেরিয়ে আসার সাহসের বিকল্প নেই। এই সাহস কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসহ সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

তবে এই বিশ্লেষণ কেবল একটি হতাশার চিত্র আঁকার জন্য নয়। বরং উপলব্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার তাড়না, কাকে বলব? কাকে লিখব? না ভেবে বলে যাওয়া। এই অভ্যেস বরং আরও বিস্তৃত হয়ে যদি কখনো কোনো সত্যিসত্যিই কারও উপলব্ধির সূচনা হয়। সেটাই অবস্থার পরিবর্তন এবং আশাবাদের শুরু হতে পারে। সময় চলেই যায়, তাই ‘এখনো পুরোপুরি দেরি হয়ে যায়নি। কিংবা সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে’ না বলে উপলব্ধির কথাই বারবার বলব। এর কোনো বিকল্প নেই, পরিবর্তন শুধু কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসবে না। মানসিকতার পরিবর্তন শুধু সমষ্টির উপলব্ধিতেই ঘটা সম্ভব।

এই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে খুব সাধারণ কিছু জায়গা থেকে। ছোট পরিসরে হলেও অংশগ্রহণমূলক চর্চাকে উৎসাহ দিতে নিজের মতামত দিয়ে যুক্ত হওয়া, সংলাপ তৈরি করা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজের কাজের ভেতরে সততা বজায় রাখা।

স্থাপত্যের ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে মানুষ কেবল ব্যবহারকারী নয়, বরং সিদ্ধান্তগ্রহণের অংশ। যেখানে একটি নকশা কেবল একটি ফর্ম নয়, বরং একটি গল্প; সেই জায়গার মানুষদের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয়। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে নিজের গল্প বলার সাহস অর্জন করা। সেই গল্প নিখুঁত না হলেও সত্য হোক, অসম্পূর্ণ হলেও প্রাসঙ্গিক হোক। কারণ একটি সমাজের রূপ শেষ পর্যন্ত তার গল্পের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। গল্প না থাকলে ফর্ম ফাঁপা হয়ে যায়; আর ফর্ম ফাঁপা হলে সেই সমাজের ভেতরে স্থায়িত্ব তৈরি হয় না।

‘হৃদয়ে বাংলার মুখ’ কথাটা নিয়ে ভাবলে হুট করে নির্দিষ্ট উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন মনে হলে ভাবা যায় এটা আসলে এক ধরনের চলমান অনুসন্ধান। এই মুখ কখনো সম্পর্কের ভেতরে, কখনো অভিজ্ঞতায়, কখনো দায়িত্ববোধে। এই অনুসন্ধান অনুভব করা, কৌতূহলী হওয়া এবং মাঝেমধ্যে নিজের অবস্থানটিকে নতুন করে বোঝার চেষ্টা করাও বিশেষ এক দায়িত্ব। বাংলার মুখ এদেশের সব মানুষের অস্তিত্বের মধ্যে লুকিয়ে আছে। প্রয়োজন অংশগ্রহণের সুযোগ কিংবা এমন এক ডাক, যে ডাকে সবাই সাড়া দিতে চাইবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। প্রয়োজন যথাযথ মহপরিকল্পনার কিন্তু উদ্যোগটা কে কবে নেবে?

এই সময়টাকে যদি খানিকটা দূর থেকে দেখা যায়, তাহলে একটি প্রশ্নই বারবার ফিরে আসে, আসলে এই সমাজের দিকনির্দেশনা আসছে কোত্থেকে? রাষ্ট্র, রাজনৈতিক শক্তি, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর, নাকি কোনো অদৃশ্য স্বার্থের বলয় থেকে? প্রশ্নটার সরাসরি উত্তর যেমন পাওয়া যায় না, কিন্তু উপস্থিতিও অস্বীকার করা যায় না। চারপাশে তাকালে মনে হয়, মানুষ খুব একটা ভালো নেই। শুধু অর্থনৈতিক অর্থে নয়, মানসিক অর্থেও এবং এই অস্বস্তি কেবল একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধনী কিংবা গরিব সবার মধ্যেই এক ধরনের অস্থিরতা, অনিরাপত্তা এবং ক্লান্তি কাজ করছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ, ঘৃণার চর্চা, যা অনেক সময় অপ্রকাশ্য হলেও সব ধরনের সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে। এই পরিবেশের সবচেয়ে নীরব ভুক্তভোগী শিশু, কিশোর এবং তরুণরা। তারা এই সময়টাকে গ্রহণ করছে, কিন্তু নিজেদের অবস্থান কীভাবে নির্ধারণ করবে, সেটা স্পষ্ট নয়। ভবিষ্যৎ তাদের কাছে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি হিসেবে হাজির হয় না; বরং সবকিছুই অনিশ্চিত সম্ভাবনা হিসেবে ঝুলে থাকে।

এক সময় রাজনৈতিক শক্তির প্রতি মানুষের এক ধরনের আস্থা ছিল। বিশেষ করে যখন সেই শক্তি আদর্শিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে কথা বলত। এমনও সময় ছিল, যখন কোনো বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিলে মানুষ বিশ্বাস করত হয়তো তা ইতিবাচক রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আস্থার জায়গায় একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কথা এবং কাজের মধ্যে অমিলের বাস্তবতা হয়তো একদিনে হয়নি। কিন্তু তা এখন এতটাই স্পষ্ট যে, আর উপেক্ষা করা যায় না। এই পরিস্থিতিকে কোনোভাবে ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রয়োজন একটা যথার্থ পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া গড়ার আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই ভাবা প্রয়োজন, তাতে কতটা বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে।

অনেক সময় মনে হয়, আমরা হয়তো কারও জন্য অপেক্ষা করছি, কেউ একজন আসবে, দিক দেখাবে। আবার অন্যদিকে, এমনও মনে হয় সম্ভবত এই অপেক্ষাটাই সমস্যার অংশ। হয়তো পরিবর্তন কোনো একক ব্যক্তির মাধ্যমে নয়, বরং ছোট ছোট উপলব্ধির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যেখানে মানুষ নিজের অবস্থানটাকে নতুন করে চিনে নেয়, সামান্য হলেও সংশোধন করে। এই দুই অবস্থানের মাঝখানে একটি দোলাচল তৈরি হয়, অপেক্ষা নাকি অংশগ্রহণ?

এসব প্রশ্নের ভেতর দিয়েই বারবার মনে হয়, অংশগ্রহণের অনুপস্থিতিটা যদি সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করা যায়, তাহলে পরিস্থিতির ভেতরে কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই আহ্বানটি কোথা থেকে আসবে, এবং যারা আহ্বান জানাবে তাদের অবস্থান কতটা স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য হবে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আহ্বান তখনই কার্যকর হয়, যখন তার ভেতরে কোনো দ্বৈততা থাকে না। তা নাহলে, তা আর পথ দেখায় না, বরং আরও একটি শব্দ হিসেবে থেকে যায়, যাকে মানুষ শোনে, কিন্তু আসলে গ্রহণ করে না।

এনামুল করিম নির্ঝর : স্থপতি, চলচ্চিত্র নির্মাতা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত