বিবিধ বিহ্বল মুখ

শিক্ষাবিদগণে আমি সদাই প্রণমি

আপডেট : ০৩ মে ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম

মার্কিন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার দাসখতমূলক চুক্তি করেছে। এই সুবাদে আমার পরিচিতদের অনেকেই সংক্ষুব্ধ, সংগতকারণেই। অনেকেই বর্তমান সরকারের কাছে আশা করছেন যাতে তারা এই চুক্তির পর্যালোচনা ও বাতিল করেন। বিএনপির কাছে এ রকম আশা করতে পারাটা একটা অমিত-সামর্থ্য হিসেবে দেখা দরকার। বিএনপির উৎপত্তির বনিয়াদ ও কর্মতৎপরতা লক্ষ করলে এসব আশায় গুড়েবালি হওয়ার কথা। হয়তো এসব মিত্রেরা আগামীতে দাবি করবেন যে তার প্রস্তুতি হিসেবেই এখন কেবল আশা করছেন। এদিকে পত্রিকার বর্ষপূর্তি সংখ্যার মূলভাব হচ্ছে ‘হৃদয়ে বাংলার মুখ’। দৈনিক পত্রিকার কাব্যময়তায় আমি মারাত্মক পেরেশানি বোধ করি। তবে পত্রিকাকুলের সঙ্গে আমার তেমন কোনো সদ্ভাব না থাকাতে এসব কাব্য-উৎপীড়ন আমার কম বলেই মানতে হবে। তারপরও বর্ষপূর্তি এলেই যে পত্রিকাগুলোর মাথায় কবিতা কিলবিল করতে থাকে, সেটাকে একটা জাতীয় সমস্যা হিসেবেই আমি চিহ্নিত করতে চাই।

অধিকন্তু আমার আজকে বলার বিষয়বস্তুতে পাঠকের মনে হতে পারে যে, আমি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি কিছু দয়ালু ধরনের মানুষ। আমি একেবারেই তা নই; সরকারটির প্রথম সপ্তাহেও ছিলাম না। এমনকি সরকারটির যখন ফ্র্যান্সে অভ্যুদয় ঘটছিল, তখনো ছিলাম না। ড. ইউনূসের ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা রাখা নয়, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে তাকে ও তার পারিষদের গ্রহণ করাটা আমাদের অনেকের জন্যই ছিল ঢেঁকি-গেলা। ঢেঁকিটা আমরা গিলেছিলাম উত্থানপর্বের যুবকরা তার বৈশ্বিক স্টারভ্যালুতে মোহগ্রস্ত ছিলেন বলে। তাদের এই মোহগ্রস্ততার আরও কিছু কারণ ইতিহাসবিদগণ আগামীতে আবিষ্কার করতে পারেন বটে। সারাংশে, আমরা কেউ কেউ নিরুপায় ছিলাম মাত্র। আমার প্রাথমিক বলার বিষয়টা হলো, কিছু কিছু মৌলিক বিষয়ে নানান সরকারের মধ্যে তেমন কোনো ভেদবিচার করা যায় না। এটাকে প্রিমাইস বা তর্কভিত্তি বলতে পারেন। আওয়ামী লীগ হোক বা বিএনপি, উদ্দিনবৃন্দের সরকার হোক বা ইউনূস সরকার, সকলেরই বিচারবোধ এবং কর্তব্য পালন কিছু মৌলিক বিষয়ে কাছাকাছি ধরনের। এ বিষয়ে নাগরিক মননে সবচেয়ে কর্কশ উদাহরণ হতে পারে র‌্যাবের মতো বাহিনীগুলো এবং এদের কর্তৃক নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। বেগম খালেদা জিয়া যদি এই রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতার গুণ্ডাবাহিনী উদ্বোধন করে থাকেন, তাহলে শেখ হাসিনা একে পুরাপুরি উসুল করে ব্যবহার করেছেন। তবে আমার আজকের উদাহরণটা হচ্ছে শিক্ষা, বিশেষে উচ্চশিক্ষা।

হেকেপ (HEQEP) বলে যে বস্তুখানি পরিচিত তার নাম বাংলা করলে দাঁড়ায় মোটামুটি এ রকম : উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি প্রকল্প। কাছাকাছি নামেই গুগল অনুবাদ করে থাকে, উইকিপিডিয়াও অনুবাদ করে থাকে। আমার পরিচিতদের সিংহভাগই এর উৎপত্তি সন হিসেবে ২০০৮ বা ২০০৯-কে উল্লেখ করে থাকেন। এঁদের মধ্যে কিছুটা ক্রিটিক্যাল হওয়ার দাবিদার যারা, তারা সনটিকে ২০০৬ হিসেবেও দেখাতে পারেন। কারণ ওই সময়েই ‘উচ্চশিক্ষার কৌশলগত পরিকল্পনা’ (SPHE) তৈরি হয়। স্মর্তব্য যে, এটা ছিল একটা ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা যার প্রায়োগিক দিক হলো হেকেপ। সেই অর্থে, ২০ বছর ব্যাপী ‘পরিকল্পনা’র প্রথম দুই বছর যদি পরিকল্পনা গ্রহণ সুপারিশ পেশ করা হয়ে থাকে এসপিএইচই নামে, পরের বছরগুলোতে আচ্ছামতো তার প্রয়োগ ঘটানোর জন্যই হেকেপ নামে কর্মকাণ্ডটি আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু ‘বন্ধু’দের যখন মনে করিয়ে দিতে চেষ্টা করি যে এগুলো এর আগে থেকেই শুরু, তখন কেউ কেউ বিশেষজ্ঞের গাম্ভীর্য সমেত আমাকে পাল্টা মনে করিয়ে দেন যে, আসলে ২০০৬-কেই দেখতে হবে হেকেপের শুরু হিসেবে। বটেই! বৃক্ষ হয়ে গেলে বীজকে আর কে-ই বা মনে রাখে!

এসব ‘বন্ধু’দের দোষ নেই। তারা জানেন যে বিশেষজ্ঞ হতে গেলে গাম্ভীর্যই নয় কেবল, আরও থাকতে হয় একটা নির্দিষ্ট সময়কালে মনোনিবেশ, নামকরণের প্রতি আনুগত্য। এমনকি খোদ বিশ্বব্যাংকের প্রতি আনুগত্য। হেকেপের আগে তারা বড়জোর ২০০৬-০৮ কালের ‘উচ্চশিক্ষার কৌশলগত পরিকল্পনা’ বা SPHE-কে বিবেচনায় রাখতে ইচ্ছুক থাকেন। কিন্তু তার আগে ২০০৩ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত যে এডুকেশন সেক্টর রিভিউ বা ঊঝজ ছিল সেটার কী হবে? সেটাই তো পরের পরিকল্পনার ভিত্তিকারণ সরবরাহ করেছে। তারও আগে বিশ্বব্যাংকের একটা বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, ২০০০ সালে। ‘পেরিল অ্যান্ড প্রমিস’ নামের এই প্রতিবেদনটি অনেকগুলো তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশের উচ্চশিক্ষার নিম্নমান নিয়ে দরদি মাথাব্যথা প্রকাশ করে। দরদি বিশ্বব্যাংকের উচ্চশিক্ষা খাতে লগ্নি করার তাহলে ওটাই প্রারম্ভিককাল হিসেবে ধরতে হবে। আন্দাজ করা যায়, ২০০০-এর এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুতের আগে প্রতিষ্ঠানটির হোমওয়ার্ক ছিল আরও কয়েক বছরের। ফলে গম্ভীর পণ্ডিতদের কুলুজিবোধকে প্রশ্ন করতে চাইলে আমার এখন উকিলের মুহুরির মতো বগলের নিচে কাগজপত্র সমেতই হাঁটাচলা করতে হবে।

এ কথা এখন আর পাঠকের বাহুল্য মনে হবে না যে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মোড়লীপনার আমি নিন্দুক। আমি আসলে কঠোর সমালোচক। পাঠক পাছে ভেবে না বসেন যেন আমি তাহলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার নিম্নমানের বিষয়ে সহমত নই। আমি সহমত। প্রসঙ্গটা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার উচ্চমান বিষয়ে আমার আস্থা নয়, বরং বিশ্বব্যাংক যেকোনো একটা ‘উন্নয়নশীল’ দেশে উচ্চশিক্ষার ‘গুণ’ বৃদ্ধিতে আন্তরিক সেই বিষয়ে আমার অনাস্থা। ‘গুণে’র যে বাহার তারা প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হন সেই বিষয়ে সন্দেহ এবং অতি অবশ্যই আমার গুণী বন্ধুদের বিশ্বব্যাংক প্রস্তাবিত উৎকর্ষের মানদণ্ডের প্রতি হতবিহ্বল আনুগত্য। আনুগত্যটা কখনো কখনো তারা প্রকাশ করেন আন্তর্জাতিক প্রকাশনা চক্রের অপ্রশ্ন প্রজা হওয়ার বাসনার মধ্য দিয়ে। এই বিষয়ে আমার স্পষ্ট আলাপ আছে; দরকার মতো আবার কখনো করব। আজকের বিষয়টা ঠিক এটাই নয়।

হেকেপ প্রকল্পটির প্রকল্প ব্যয় ছিল ২০০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। এর মধ্যে ১৮০০ কোটি টাকার বেশি ছিল বিশ্বব্যাংকের ঋণ। এগুলো কোনো গুপ্ত তথ্য নয়। হাতাহাতি, খোঁজাখুঁজি করলে পেয়ে যাবেন। আমি একটা সরল গোলাকার অঙ্কে বললাম, নিখুঁত থাকতে চাইনি, সেটা জরুরিও নয়। যদি এআই ইত্যাদির সঙ্গে আলোচনা করতে বসেন, আপনি ধমক না দেওয়া পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বব্যাংকের অংশগ্রহণ বলতে গিয়ে ‘কর্জ’ শব্দটা উল্লেখ করবে না সম্ভবত। কৃত্রিম হলেও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের তাঁবেদারিতে অকৃত্রিম বৈশিষ্ট্য দিয়েই এসব প্রোগ্রাম বানানো। কিন্তু টাকাটা নিখাদ কর্জই, ঋণ। ২০০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প যে ২০ বছর মেয়াদি ছিল তা আপনারা ভুলে যাননি নিশ্চয়ই। কিন্তু ২০০৬ ধরলেও, ২০২৬ পর্যন্ত ধাবমান প্রকল্পটি শেষ হয়েছে ২০১৮-তেই; নির্দিষ্ট মেয়াদের আট বছর আগে। কেন শেষ হলো? বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা উচ্চমানসম্পন্ন হয়ে গেছে বলে? বিশ্বব্যাংক আমাদের শিক্ষামানে সন্তুষ্ট হয়ে গোল্ড মেডেল দিয়েছে বলে? বাস্তব কারণটা আপনারা যা আশঙ্কা করছেন একদম তাই-ই ঘটেছে। টাকা শেষ হয়ে গেছে।

ফলে এখন আপনারা শুনতে পাচ্ছেন হিট (HEAT) প্রকল্পের নাম। হায়ার এডুকেশন এক্সেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফর্মেশন। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘উচ্চশিক্ষা ত্বরান্বিতকরণ ও রূপান্তর’। তবে আগের প্রকল্পগুলোর বাংলা যদিও কালেভদ্রে এদিক-সেদিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে, এটার একেবারেই হয় না। এটা ডাইরেক্ট হিট নামেই হিট। আমি অনেক ভেবেছি, ২০ বছরের প্রকল্প যারা ১২ বছরে (প্রকৃত হিসেবে ১০) যেসব বিদ্বান শেষ করতে পারেন, তাদের আরও ত্বরান্বিতকরণের আবশ্যিকতা কী! হতে পারে হিটের ক্ষেত্রে ‘আগেই টাকা শেষ হওয়ার’ একটা আগাম বার্তা তারা সংশ্লিষ্ট জনগণকে দিয়ে রাখছেন। একটা প্রস্তুতিমূলক বার্তা হয়তো। সেই বিচারে হিট প্রজেক্ট হয়তো হিন্ট প্রজেক্টও বটে। ২০২৩ থেকে ২০২৮ অবধি চলমান এই প্রকল্পের ব্যয় আরও বেশি। গোল অঙ্কে বললে ৪০০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। তবে এ দফা বাংলাদেশের স্বাবলম্বিতাতে আপনারা গর্ববোধ করতে পারেন। প্রকল্প ব্যয়ের অর্ধেকের কিছু বেশি বাংলাদেশ সরকার বহন করছেন। তাতেও বিশ্বব্যাংক ২০০০ কোটি টাকার মতো ঋণ দিচ্ছে। এ দফা আইডিএর নামে। এর বাইরে আরও একটা প্রকল্প চলছে ইউজিসির ‘তত্ত্বাবধানে’ যা ২০১৯ সাল থেকে শুরু হয়েছে। ICSETEP নামের এই প্রকল্প প্রকৌশল ও আইটি শিক্ষাকে ‘টার্গেট’ করেই কেবল চালিত। এটাতে আরও টাকা কর্জ আসবে বলেও কানাঘুষা আছে।

এসব হিসাব পেলেন উচ্চশিক্ষাতে বিশ্বব্যাংকের দরদ বিষয়ে। নিম্নশিক্ষাতে সমান্তরাল সব দরদের কাহিনি আছে, যা আজকে আলোচনার বাইরে রাখলাম। কিন্তু পাঠক জানতে চাইতেই পারেন আমার সমস্যাটা কী!

২০২৪ সালের আগস্ট মাসে সরকার পতন হলো। এর নাম যা-ই দেন আর একে যতই আওয়ামী বিশ্বস্ত অংশ ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলুন, বাস্তবে এ রকম ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’য়েও লাখ লাখ লোকের নামতে হয়েছে। এই উত্থান নিয়ে সুযোগ থাকলেই আমি আমার ব্যাখ্যা দিই। আবারও দেব। আজকে বলার বিষয় হচ্ছে, বদলটার পর ইউজিসির এই কোমরভাঙা বিশ্বব্যাংক-চাটুকর ভূমিকা বদলাতে পারার ভিত্তিভূমি ছিল। আরও বিশেষভাবে ছিল এই কারণে যে, কমরেড শিক্ষকদের কেউ কেউ পদে আসীন হয়েছিলেন। অন্যরা তাতে শিক্ষা উন্নতির খাব দেখছিলেন। আমি নিজে হাফপ্যান্ট ছাড়ার পর থেকেই ওই পর্যায়ের বেকুব আর নাই যাতে কোনো খাতে বা কার কাছে কী আশা করা যায় না তা না-বুঝতে পারি। কিন্তু বিতর্কের জায়গাতে পেশাগতভাবে ‘দাবি’ না করার কারণ দেখি না। আমি আগের বছরগুলোতে লাগাতার এসব মোড়লীপনার সমালোচক ছিলাম। আমি নগণ্য বিধায় আপনারা তা না জানতে পারেন, কিন্তু নিকটজনরা তা জানতেন। আমার বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই। আগস্ট-২০২৪ পরবর্তীকালে, আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করে আমি ইউজিসির সদ্য-পদচ্যুত চেয়ারম্যানকে একটা পত্র লিখি। পত্রটির অনুলিপি পর্যাপ্ত পক্ষের কাছেও পাঠাই। আমার জিজ্ঞাস্য ছিল, এখনো কেন বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা ও পরিপত্র তারা পর্যালোচনা করবেন না।

আমি জানি, কেন তারা করবেন না। তারা কেউ কেউ করবেন না এই প্রকল্প ডিম পাড়ে বলে। এই প্রকল্পের টাকা আট বছর আগেই খেয়ে শেষ করা যায় বলে। কেউ কেউ করবেন না স্থিতাবস্থার কোনো বদল তারা চান না বলে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক কী জানেন? কেউ কেউ করবেন না আসলেই তারা উচ্চশিক্ষার মান এভাবে বিশ্বব্যাংকের দাওয়াই খেয়ে ‘উন্নত’ হবে ভাবেন বলে। আর এর মধ্যে মুখস্থটাইধারী বিদ্বানরাই কেবল নেই, কমরেড ও সেমি-কমরেড শিক্ষকবৃন্দও আছেন।

[২৪/২৫ এপ্রিল ২০২৬। রাত্রি ১.৪০। আদাবর।]   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত