সাংস্কৃতিক চর্চা ও আমাদের সাধনা

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম

বিশ্ব যখন এক টালমাটাল পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, মানুষ আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই দমবন্ধ করা নিকষ কালো অন্ধকার কূপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য, কিন্তু কোনো আশার সূর্যকণা তাদের উন্মীলিত নয়নে ধরা পড়ছে না, তখন জীবন বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়ে উঠছে অত্যন্ত বেদনাক্রান্ত ও ক্লান্তিকর। তবে মানবজাতি অত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তারা প্রয়োজনে রৌদ্র রচনা করে নেবে, আর কণ্ঠ ছেড়ে গাইবে : দুস্তর বাধা প্রস্তর ঠেলে/বন্যার মতো বেরিয়ে/যুগ সঞ্চিত সুপ্তি দিয়েছে সাড়া/হিমগিরি শুনল কি সূর্যের ইশারা।

সেই ইশারার জোরেই গোটা বিশ্ব তথা বাংলাদেশের মানুষ সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ, মৌলবাদের ঘেরাটোপ পেরুতে সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত রাখবে। গান গাইবে, কবিতা লিখবে, চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে মানুষ যখন সব আশা ও ভরসা হারিয়ে ফেলতে থাকে, তখন সাংস্কৃতিক চর্চাই মানুষকে আশার বুকে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন দেখায়। অবশ্য বিগত দিনগুলোতে যে হারে গানের অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে, সংগীত প্রশিক্ষণ ভবন ও গণমাধ্যম আক্রান্ত হয়েছে, যেভাবে চলচ্চিত্রের শুটিং বন্ধ করা হয়েছে, পালাগানের শিল্পীদের ওপর হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার চলেছে, মাজারে মাজারে অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, মৃত ব্যক্তিকে কবর থেকে তুলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ধর্ম অবমাননার নামে জ্যন্ত মানুষকে পিটিয়ে আগুন লাগিয়ে মারা হয়েছে, সেসব জানলে ও দেখলে যেকোনো মানুষের বিবমিষা জাগবে, এই সমাজ থেকে দূরে পালিয়ে যেতে মন চাইবে। আধুনিক দুনিয়ায় কে মধ্যযুগীয় বর্বরতা চাক্ষুষ করতে চায়? কে চায় নিজের কথা বলার অধিকার, গলা ছেড়ে গান গাইবার অধিকার, পছন্দ মতো পোশাক পরিধানের অধিকার ও বিশ্বাস চর্চা খর্ব করতে?

আজ যখন গ্রামেগঞ্জে, পাড়া ও মহল্লায় গানবাজনা ও জ্ঞানসাধনার পরিবর্তে উগ্র মতবাদের উল্লম্ফন বেড়ে যাচ্ছে, যখন পুনঃপুন পরিবর্তনের কবলে পড়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইগুলো বহন করছে রাজনৈতিক আদর্শ বিক্রির অভীপ্সা, যখন তরুণদের ‘জম্বি জেনারেশন’ বানিয়ে মত্ত করা হচ্ছে নানাবিধ স্বার্থ চরিতার্থ করার বিপজ্জনক খেলায়, তখন প্রয়োজন নীতিনির্ধারণী ও সামাজিক পর্যায়ে দৃঢ়তার সঙ্গে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার। তবেই মাথার ওপর চেপে বসা কালো মেঘ অপসারিত হবে।

সাংস্কৃতিক চর্চার মূলে রয়েছে আমাদের সংস্কৃতি। একটি জনপদের ভাষা, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত জীবনযাপন, রীতিনীতি, পালাপার্বণ, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি মিলিয়ে সংস্কৃতি। সংস্কৃতির ভেতর থেকেই যখন মানুষ লেখালেখি করে, গানবাজনা করে বা কোনো কিছুকে শিল্পমণ্ডিত করে উপস্থাপন করে সেটিই সাংস্কৃতিক চর্চা। সংস্কৃতির বাতায়ন হিসেবে কাজ করে সাংস্কৃতিক চর্চা। এর মাধ্যমে অন্যকে জানা যায়, আবার নিজেদেরও জানানো যায়। সাংস্কৃতিক চর্চা মানুষের মননকে শুধু গড়ে দেয় না, মানুষের ভেতরে থাকা আদিম ও কুৎসিত প্রবৃত্তিকে বন্দি করে দেয় অচেতনের কুঠুরিতে। ভালো কিছুর পালন ও মন্দকে দমন করার নামই যদি সভ্যতা হয়, তাহলে সেই সভ্যতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক চর্চার অবদান অনস্বীকার্য।

সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চার এই আলাপ করার পেছনের কারণ হলো এরা গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটিকে বেসুরো রেখে অন্যটিকে সুরে পরিচালন করা অসম্ভব। যে জাতির সংস্কৃতি ভাঙাচোরা ও হুমকির মুখে সে জাতির সাংস্কৃতিক চর্চার চেহারাও হবে মলিন। মনে জিজ্ঞাসার উদয় হতে পারে, বাংলাদেশের সংস্কৃতির হালহকিকত কেমন এখন? সেটা জানতে পারলেই সাংস্কৃতিক অবস্থারও একটি চিত্র পাওয়া যাবে। একটি দেশের নদীর দিকে তাকালে যেমন সেই দেশের প্রাকৃতিক অবস্থা আন্দাজ করা যায়, তেমনি ভাষার দিকে তাকালেও একটি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি কেমন তা অনুধাবন করা যায়। সংস্কৃতির মেরুদণ্ড হলো ভাষা, সাংস্কৃতিক চর্চা হলো তার চোখ। যে চোখ শুধু দেখেই না, নিজেকে প্রকাশ করে এবং অন্যেকেও এই চোখ অবলোকন করার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। এক্ষেত্রে ফরাসি মনোবিশ্লেষক জাক লাকাঁর ‘গেইজ’ ধারণাটি স্মর্তব্য। লাকাঁনীয় দৃষ্টিপাত যেমন শুধু দেখে না, উল্টো দেখার বস্তুতে পরিণত হয়, তেমনি সাংস্কৃতিক চর্চা শুধু আমরা করি না, সাংস্কৃতিক চর্চা আমাদেরও গঠন করে দেয়।

ফিরে আসি মেরুদণ্ড অর্থাৎ ভাষা প্রসঙ্গে—ভাষার অবস্থা যদি নড়বড়ে হয়, তাহলে সাংস্কৃতিক চর্চার ভবিষ্যৎও ঝুঁকির ভেতর পড়ে যায়। সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চা কোনোটিই স্থির বা শ্বাশত নয়, এটা বিবেচনায় রেখেই বলছি, ভাষার মাধ্যমেই মানুষ সংস্কৃতির নানা শাখায় স্বাক্ষর রাখে, নিজেদের চিন্তার উন্মেষ ঘটায়, ইতিহাস সংরক্ষণ করে। ভাষার সাহায্যেই মানবসভ্যতা তার কাঙ্ক্ষিত বন্দরের দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখে। যদিও আমরা দেখেছি এই সভ্যতা দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ, দুটো বিশ্বযুদ্ধে মানুষ মরেছে কাতারে কাতার। ধ্বংস হয়েছে নগর ও শিল্পকর্ম। এখন তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, শুধু কেউ নামটা উচ্চারণ করছে না। তারপরও মানুষ সীমান্ত ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বাঁচতে চায়, সন্তানের জন্য গড়ে তুলতে চায় নিরাপদ ও নির্মল আবাস।

পরিতাপের বিষয়, যে নগরে আমরা বাস করি, সেটি বসবাসের অযোগ্যের তালিকায় শীর্ষে। পুরো দেশের অবস্থাও তথৈবচ। এমতাবস্থায় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভাষাকেই আমরা কলুষিত করে রেখেছি বহু বছর। নদীগুলোকে আমরা যেভাবে দূষিত ও পরিচর্যাহীন করে ফেলে রেখেছি অনেকটা সেরকম। সামনের দিনগুলোতে ভাষাকে পরিচ্ছন্ন করে তুলব সেরকম কোনো সঠিক দিকনির্দেশনাও নেই। বাংলাকে অবহেলা করে আমরা ইংরেজিকে গুরুত্ব দিচ্ছি কেজো ভাষা হিসেবে, আর আরবিকে গুরুত্ব দিচ্ছি স্বর্গীয় ভাষা হিসেবে। অথচ নিজের মাতৃভাষা, যা মানুষকে তার সংস্কৃতির আবহে পুনর্জন্ম দেয়, তাকে অমর্যাদা করে চলেছি। ইংরেজিতে বানান ভুল করলে আমরা যতটা লজ্জায় মরে যাই, বাংলা বানান ভুল হলে ততটা লজ্জা পাই না। আমরা ধরেই নিয়েছি, বাংলা শেখার কোনো মানে নেই, তাই সেখানে ভুল হলেই বা কি এলো গেল! অথচ শিক্ষিত লোকমাত্রই জানেন, নিজের মাতৃভাষাকে অবহেলা করে কোনো জাতি সাংস্কৃতিকভাবে তো বটেই, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। অথচ এই শিক্ষিত লোকেরাই নিজেদের সন্তানকে বিদেশি ভাষায় পারদর্শী করতে, স্বর্গলোকে প্রবেশ নিশ্চিত করতে কত কায়দা কসরত করে, কত অর্থ ব্যয় করে।

সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চার ভেতর দিয়ে আমাদের এই জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে হলে প্রথমেই আমূল পাল্টাতে হবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে। আমাদের চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন ভাষায় শিশুরা শিক্ষাগ্রহণ করবে। একই দেশে অনেক ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান হলে প্রথমেই সংস্কৃতি বিকৃতির মুখে পড়ে, এরপর সাংস্কৃতিক চর্চার বারোটা বাজে। পৌনে বারোটা অবশ্য বেজে গেছে! দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন তো অহরহ কাওয়ালি সন্ধ্যা হয়, ওটাই নাকি আমাদের সংস্কৃতি!

শিক্ষাদানে মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি, পাঠ্যবইতে যা পড়ানো হচ্ছে সেটারও খোলনলচে পাল্টাতে হবে। শুধুমাত্র বিষয় নয়, শ্রেণিভিত্তিক ভাষা কেমন করে শিশুকিশোরদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করবে সেটিও বিশেষজ্ঞদের দিয়ে নির্ধারণ করে নিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বইতে যুক্তাক্ষরের ব্যবহার কম থাকবে, অপেক্ষাকৃতভাবে সরলবাক্য থাকবে বেশি। সহজবোধ্য করে লিখতে হবে। এ ছাড়া বারবার পাঠ্যবইতে ছুরি-কাঁচি চালিয়ে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা চালানো বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাকার্যক্রমের ভেতরেই সংগীত, নাট্যকলা, নৃত্য, আবৃত্তি যুক্ত করতে হবে।

চলচ্চিত্রসহ দৃশ্যমাধ্যমকে বিশেষ জোর দিতে হবে। রিলস ও শর্টসের এই যুগে, শিশুরা যেখানে শ্রেণিকক্ষের বাইরে নানাবিধ ভিডিও দেখছে, সেখানে শ্রেণিকক্ষে পরিকল্পনামাফিক ও বয়সভিত্তিক ভিডিও কনটেন্ট দেখানোর ব্যবস্থা করলে শিখন কার্যক্রম আনন্দময় হবে। এজন্য অবশ্য উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ থাকা জরুরি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাদি ছাড়া এই কার্যক্রম সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিতে হবে। ঘরে বসেও যেন শিশুরা উপযোগী শিক্ষামূলক ও আনন্দদায়ক কনটেন্ট দেখতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে।

প্রত্যেক মহল্লার জন্য একটি করে মাঠ ও পাঠাগার থাকা নিশ্চিত করতে হবে। সেই মাঠে নিয়ম করে খেলাধুলা তো হবেই, জাতীয় ও সামাজিক দিবসগুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেন হয় সেদিকেও সরকারের নজর দিতে হবে। পাঠাগারগুলোতে সরবরাহ করতে হবে ধ্রুপদি ও আধুনিক ভালো সাহিত্য। সেখানে যেন কোনোভাবেই আজেবাজে বই ঢুকে না পড়ে! বিদ্যালয়ের পাঠাগারকেও সক্রিয় করে তুলতে হবে, চালু করতে হবে পাঠচক্র ও বইপড়া কর্মসূচি।

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের চেয়ে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী সামাজিক উদ্যোগ। আর এই উদ্যোগ শুরু হয় পরিবার থেকে। পরিবারে যদি অন্তত একশটি বইয়ের সংগ্রহ থাকে এবং মা-বাবারা যদি মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি কমিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে নিজে পড়তে বসে, তাহলে সেটি হবে ভবিষ্যতের জন্য উত্তম। অর্থাৎ রাষ্ট্র একা নয়, এগিয়ে আসতে হবে পরিবারকেও। অন্য ভাষা শিখব, অন্য সংস্কৃতি সম্পর্কে জানব, নিজের ধর্ম পালন করে, কিন্তু সেটি যেন কোনোভাবেই নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকে লক্ষ রাখা বাঞ্ছনীয়। ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষার অগ্রসৈনিক হয়ে উঠলে সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রেও আমরা সাফল্য পেতে থাকব। কারণ বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্র যেহেতু দেশীয় ভাষা দিয়েই নির্মিত হবে এবং দেশের সংস্কৃতিকেই তুলে ধরবে, তাই ভাষা ও সংস্কৃতিকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। চীন, ইরান, ফ্রান্সের দিকে তাকালেও এই কথার সত্যতা ধরা পড়ে।

আমাদের এই ভূখণ্ডে বাঙালি সংস্কৃতির সুপ্রাচীন ও সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে, একে পরিচর্চার ভেতর রাখতে হবে, অবহেলা করলে চলবে না। এর পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রত্যেকেই যদি প্রত্যেকের জায়গা থেকে নিজেদের সংস্কৃতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় এবং সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত রাখে, বলা যেতে পারে একে সাধনায় পরিণত করে, তাহলে বাংলাদেশ অচিরেই নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের কথা জোরালোভাবে জানান দিতে পারবে বিশ্বদরবারে। আমাদের বুঝতে হবে, পদ্মার ইলিশ যেমন টেমস নদীতে জন্মানো সম্ভব নয়, তেমনি বিদেশি ভাষার বাতাবরণে দেশি সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চাও সম্ভব নয়। এই সত্যটি আমরা যত দ্রুত অনুধাবন করব, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।  

বিধান রিবেরু : প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক, কাট টু সিনেমা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত