নদীরা আমার বুকের ভেতর কেমন যেন করে! নদীর পাড়ে গেলেই টের পাই এক অজানা অনুভূতি ও রহস্যময় অসীম শূন্যতা আমাকে ঘিরে ধরছে, আমার ভেতর তৈরি করছে স্বপ্নের ভুবন। নদীকে কখনো মনে হয় ফ্রক পরা কিশোরীর উঠতি উন্মাদনা, কখনো মনে হয় পূর্ণ যৌবনা যুবতীর অহংকার কিংবা কখনো মনে হয় প্রৌঢ়া নারীর কুচকানো কপোলে বিকেলের ম্লান রোদ। যার মন-বারান্দা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নের ঘুঙুর। যে নারী একদিন জানালার জীবন নিয়ে সুখী ছিল কিংবা পায়নি কখনো জানালা জীবন। চূড়ান্ত দেখি—নদী ও নারী দুজনেই ঋতুবতী জীবন ধারণ করে। আমার স্মৃতিমাখা নদের নাম ব্রহ্মপুত্র। হিমালয় পর্বত থেকে নেমে আসা যে চুয়ান্নটি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে তৈরি করেছে আরও শত শত নদী, সেখানে রয়েছে কয়েকটি নদ—ব্রহ্মপুত্র, কপোতাক্ষ, আড়িয়াল খাঁ, কুমার, পায়রা, নাগর ও কংস। ব্রহ্মপুত্র আমাকে বারবার টানে, বারবার ডাকে, আমার বুকের ভিতর কেবল খেলা করে, খেলা করে নদের তীর, জল, জলের ঘূর্ণি, জলের ফেনা, উত্তাল ঢেউ, ধাবমান স্রোত, স্রোতের কলকল-ছলছল ধ্বনি, পাড় ভাঙার নীরব শব্দ, পলি-মাটি-কাদা আর বালি। মনে পড়ে, নৌকার
কথা। পাল তোলা নৌকা, দাঁড়টানা নৌকা, গুনটানা নৌকা, যাত্রীবোঝাই নৌকা, মালবাহী নৌকা, বধূবাহী নৌকা, জেলে নৌকা। ভরা বর্ষায় উত্তাল ঢেউয়ে হেলেদুলে যাওয়া নৌকা, শীতের শান্ত নদীতে ধীরে ধীরে বয়ে যাওয়া নৌকা। নৌকায় চড়ে আমিও বহু বার বহু নদী পার হয়েছি। পায়ে হেঁটে পার হয়েছি আরও আরও নদী। কখনো কখনো শীতাক্রান্ত একাকিত্ব নিয়ে শুয়ে থাকা নদী—মনে পড়ে—পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা, ঠাকুরগাঁওয়ের পুনর্ভবা, নেত্রকোনার সোমেশ্বরী, যশোরের কপোতাক্ষ, লালমনিরহাটের তিস্তা, কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, বান্দরবানের সাঙ্গু, মানিকগঞ্জের যমুনা, মুন্সীগঞ্জের পদ্মা, চাঁদপুরের ডাকাতিয়া, ভোলার মেঘনা, খুলনার ভৈরব, সাতক্ষীরার খোলপেটুয়া, কুষ্টিয়ার গড়াই, কালিগ্রামের নাগরনদ, ফরিদপুরের মধুমতি, সিলেটের সুরমা, টাঙ্গাইলে ধলেশ্বরী, কলাদিয়ার ইছামতি, হবিগঞ্জের খোয়াই, কক্সবাজারের কালি, টেকনাফের নাফ নদীকে। ওদের শরীর আমাকে শিহরিত করে, পুলকিত করে, নস্টালজিক অনুরণন জাগায়। মাস্টার্সের এক মৌখিক পরীক্ষায় আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বাংলাদেশে কটি নদ রয়েছে? আমি বলেছিলাম, ছয়টি—ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, কপোতাক্ষ, কুমার, নাগর ও কংস নদ।
আমার বুকের ভেতর সবচেয়ে খেলা করে শৈশবের ব্রহ্মপুত্র ও তার শাখা নদীটি। শাখা নদীটির কোনো নাম নেই। আমার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। এই শাখা নদীটির উৎপত্তি জামালপুরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রিয় ব্রহ্মপুত্র নদ থেকেই। এটি সামান্য কয়েক মাইল অতিক্রম করে গিয়ে মিশেছে শেরপুরের দশানি নদীতে। বর্ষায় নদীটি কানায় কানায় ভরে যায়, কখনো পাড়-উপচে জল চলে আসে শস্যক্ষেতে, বসতবাড়িতে। বেশি বন্যা হলে প্রবল জলে ভাসিয়ে দেয় গ্রাম। তখন নদীর স্রোতের বেগে বন্যার জল ব্যাঘ্ররূপে ভাটির দিকে যায়। কখনো কখনো জলের ঘূর্ণিভরা নদীর চেহারাকে ভয়াবহ করে তোলে। স্রোতের সঙ্গে খড়-কুটো, শেওলা-কচুরিপানাসহ নানা রকম আবর্জনাও ভেসে আসে। এই যে এত জল কোথা থেকে আসে, কোথায় যায় ভাববার বয়স কী তখন হয়ে উঠেছে? তবে ব্রহ্মপুত্রের কাছ থেকেই জল এনে নিজেকে গর্ভবতী করে তোলে এটিও কেউ কেউ বলত, যা তখন বোঝার বয়স হয়ে ওঠেনি। বন্যা ধেয়ে এলে সত্যি ওই বয়সে ভয়ই পেতাম। আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলাম, নদীটিও আমার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠল। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় নদীর তীর, নদীর জল বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিল। নদী যেন নেশা। কোনো কোনো সকালেই খেলার সাথিদের নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিতে, সাঁতার কাটতে নেমে যেতাম। আমাকে সাঁতার শিখিয়েছেন আমার আব্বা। সম্ভবত চার-পাঁচ বছর আমার বয়স তখন। আব্বা একদিন নদীতে নিয়ে গিয়ে তার কোমর পানিতে নেমে আমাকে মাছের মতো সোজা করে পেটে দু হাত রেখে ভাসাতে লাগলেন। আমি কিছুতেই সোজা হয়ে ভাসতে পারছি না। বারবার বেঁকে যাচ্ছি। হাত-পা দিয়ে সাঁতারের কলা-কৌশলও রপ্ত করতে পারছি না। আব্বা ধৈর্যধারণ করে পর পর কয়েকদিন অনুশীলন করাতে লাগলেন। এরপর একদিন সত্যি সত্যি জলে ভাসতে শুরু করলাম। কারণ জলাঞ্চলে বসবাস করতে হলে সাঁতার শেখা একান্ত জরুরি এই বিষয়টি আব্বা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছেন। যা হোক সেই যে শুরু আর থামিনি। জলে সাঁতার আর জীবন সাঁতার একই সঙ্গে যেন শুরু হলো। এরপর নদীকে নিয়ে প্রতিদিনের ঘটনা জড়িয়ে গেছে জীবনের সঙ্গে।
আমার জন্ম ব্রহ্মপুত্র নদের শাখার তীরে। সে সূত্রে আশৈশব কেটেছে নদীর সঙ্গে খেলা করে। কত সকাল, কত দুপুর, কত সন্ধ্যা নদীর কাছে গিয়েছি সেই হিসাব আজ আর এই ষাটে জমা নেই। নদীতে ঝাঁপ দিয়েছি, সাঁতার কেটেছি, মাছ ধরেছি, নদী পার হয়ে স্কুলে গিয়েছি, হাটে গিয়েছি, শহরে গিয়েছি। নদীর স্বচ্ছ জল, ঘোলা জল, স্রোত, ঢেউ, পাল তোলা নৌকা, খেয়াঘাট, ঘাটের মাঝি, পারাপাররত বিভিন্ন প্রকৃতির মানুষ, বিভিন্ন সময়ের নদী দেখে দেখে কৈশোর পার করেছি। নদীতে বনভোজন কি যে আনন্দের! কিংবা মাইকে গান বাজিয়ে ছইওয়ালা নৌকায় করে বর বা কনের এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাত্রা সে আরেক স্মৃতিময় দৃশ্য। বর্ষার নদী না শরতের নদী সুন্দর—সেটি আপেক্ষিকই বটে। তবে বন্যার পানি যখন ধাই ধাই এসে টুপটুপ করে নদীর কিনার ছুঁয়ে দেয়, তখন এক রকম ভালো লাগা। বর্ষার ভরা নদীতে যখন টিপটিপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে, তখন কোনো নৌকায় বসে বা কোনো ঘরের জানলা দিয়ে অপলক তাকিয়ে থেকে তখন সেই বৃষ্টিমুখর কলরব দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকতাম। কিশোর মন কত বর্ষার বৃষ্টিতে এমন আকুল হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। যৌবনের প্রথমপাদে দেখেছি বৃষ্টিভেজা অসংখ্য নারী। আবার ফাল্গুনে হলুদ শাড়ি। তারপর বাড়ি বাড়ি আম-কাঁঠালের ধুম। পিঁড়িতে বসে পিঠা-পুলি আর শীতের রাতে কাঁথা গায়ে মজার ঘুম।
আমি যেদিন প্রথম কলেজে যাই, সেদিন আব্বা বলেছিলেন—‘বাবা, তিনটি জায়গায় যাবে না—থানা, কোর্ট-কাছারি ও হাসপাতালে আর তিনটি জায়গায় যাবে বইয়ের দোকান, ফলের দোকান এবং নদী বা সমুদ্রের কাছে’। সেদিন বুঝতে না পারলেও, পরে বুঝতে পেরেছি তিন+তিনের অর্থ। শিক্ষক বাবার সন্তান হিসেবে চেষ্টা করেছি, সেদিনের উপদেশ যথাসাধ্য পালন করতে।
শামসুর রাহমানের কবিতার একটি চরণ এরকম: ‘ভয়ে ভয়ে থাকি, কখন অরণ্যে হারায় পথরেখা’। অরণ্যকে না, আমার ভয় অন্ধকারকে। বরাবরই কৃষ্ণপক্ষের রাতে গা ছমছম করে আমার—কবরস্থান কিংবা শ্মশানের পাশ দিয়ে যেতে তো আগে ভীষণ ভয় পেতাম। তবে মুক্তিযুদ্ধ সে ভয়কে দূর করে দিয়েছে। মহান বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন অন্ধকারকেও আমরা জয় করে ফেললাম। নদীর নির্জন জায়গাগুলোতে আগে যে ভয় লুকানো ছিল, তা ধীরে ধীরে দূর হয়ে গেল। অন্যদিকে রোদের মাতামাতি। প্রখর রোদের তাপে চিনেছি ব্রহ্মপুত্রের ধু ধু বালিরাশি। তখন বুঝেছি ঋতুবৈচিত্র্যের বাংলাদেশকে। মনে মনে হয়তো বলেছি, এ কেমন খরার দেশ। ফুল, পাখি, নদী আর গানের দেশে প্রকৃতির এমন বিরূপ রূপ কেন? কেন তাপে চৌচির হয় মাটি, কেন শীতে কষ্ট পায় মানুষ, কেন বন্যায় ভাসিয়ে দেয় ঘর বাড়ি, কেন ঝড়ে তছনছ হয় লোকালয়? কেন আমার প্রিয় ব্রহ্মপুত্র বর্ষায় কেন বদলে যায়? আবার যখন শরৎ আসে, তখন ব্রহ্মপুত্র শান্ত হয়ে আসে। স্বচ্ছ জলে নীলাকাশ দেখা যায় তার শরীরে, সেটিও অন্য রকম ভালো লাগে। আর প্লাবিত জ্যোৎস্নার নদী যিনি এখনো দেখেননি, তাকে কি বোঝানো যাবে রূপময় নদীর কথা? শীতের শুকনো নদীর শুকনো বালিতে যখন পূর্ণিমার আলো পড়ে, নির্জন নদী যখন একা একা ভেসে বেড়ায়, তখন সেই নদীর সঙ্গী হওয়া কী যে আনন্দের, সেটিই বা কী করে বোঝাব!
নদীতে বৃষ্টি দেখা আমার শখ। কতবার নদীতে বৃষ্টি দেখেছি, তার হিসাবও রাখিনি। একবার বন্ধুরা মিলে কলকাতা যাচ্ছি। যাওয়ার পথে পার হচ্ছি যমুনা ও পদ্মা। গোয়ালন্দ ঘাটের কাছাকাছি যেতে যেতে বৃষ্টির দেখা পেলাম। আহা কী যে অপূর্ব দৃশ্য, উপলব্ধি করা ছাড়া উপায় নেই। ওপরের জল নিচের জলকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। ঘন-সাদা মেঘের ক্রন্দন। মনের ভেতর মায়াময় শিহরণ। এ রকম নান্দনিক দৃশ্যে মনে শিহরণ জেগেছে বহুবার বহুদিন। আবার নদীতে ঝড়-বৃষ্টির তাণ্ডবও দেখেছি। আমি তখন নান্দিনা এম এইচ কে পাইলট স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। একদিন স্কুল শেষে সহপাঠীদের নিয়ে বাড়ি ফিরছি। নৌকা দিয়ে পার হচ্ছি ব্রহ্মপুত্র। সন্ধ্যার আগে আগে। ব্রহ্মপুত্র সেদিন পূর্ণ যৌবনা। থৈ থৈ করছে নদী জল। নান্দিনা নদীঘাট থেকে আমাদের গ্রাম চরখার চর প্রায় সাত কিলোমিটার দূরত্ব। বর্ষা মৌসুমে পুরো রাস্তায় যেতে হয় নৌকা দিয়ে। আমার নৌকার প্রতিদিনের মাঝি বেচু। কিন্তু সেদিন বেচু ছিল না। ছিল ওর চৌদ্দ বছরের পুত্র। ঘাট থেকে আমাদের নিয়ে নৌকা ছাড়বার দশ মিনিট পর শাখা নদীর মোনায় আসার সঙ্গে হঠাৎ শুরু হলো তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। আমরা যাচ্ছি স্রোতের অনুকূলে, কিন্তু তাতে কী! প্রবল বাতাস ও বৃষ্টির ঝাপটা এসে প্রথমেই আমাদের নৌকার হালকা লাল রঙের পালটি ছিড়ে ফেলল। তারপর বৃষ্টির জলে ভরে গেল নৌকা। জল সেচে কোনো লাভ হচ্ছে না। স্রোত ও বাতাসের অনুকূলে নৌকাটি ছুটে চলেছে দ্রুত। বাঁক ঘুরে আমরা প্রায় আমাদের গ্রামের ঘাটে এসে গেছি, এমন নৌকাটি দুলতে দুলতে জলের ভারে তলিয়ে গেল। আমরা বই-পুস্তক ভেসে গেল নদীতে, আমরা সাঁতরে তীরের দিকে যেতে থাকলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে সবাই তীরে উঠলাম। কিন্তু মাঝি ছেলেটি উঠতে পারল না। হঠাৎ ভাটির দিকে দেখলাম নৌকাটি উল্টিয়ে গিয়ে ভেসে যাচ্ছে আর সেই নৌকাটি ধরে আছে মাঝি ছেলেটি। আমরা দুজন আবার ঝাঁপ দিলাম নদীতে। সাঁতরে গিয়ে নৌকা ও মাঝিকে ঠেলে ঠেলে পাড়ের দিকে আনলাম। তখনো বৃষ্টির মৃদু ফোঁটা পড়ছে নদীজলের শরীরে। বাতাসের দাপট কমে গেছে। আস্তে আস্তে থেমে গেল ঝড়। তীরে কিছুক্ষণ বসে থেকে বৃষ্টির টপটপ পতন শেষ করে ভিজে শরীরে সন্ধ্যার আবছা আলোয় বাড়ি ফিরলাম। মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানালাম আব্বাকে, যিনি আমাকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন। বাড়িতে ঢুকতেই আম্মা কাতর কণ্ঠে বললেন, কী হয়েছে বাবা! বললাম, নৌকা ডুবে গিয়েছিল। আম্মার অস্থির চোখের দিকে চেয়ে, মনে মনে ভাবলাম—প্রকৃতির বিরূপ রূপ! বাংলাদেশের প্রতিটি নদ-নদীই ভরা বর্ষায় এমন রূপ ধারণ করে। বন্যার জল কখনো কখনো নদীর কূল ছাপিয়ে দুপাড়ের মাঠ-ঘাট, বাড়ি-ঘর ভাসিয়ে দেয়—সে আরেক অন্য রকম দৃশ্য। নদী নিয়ে কত কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাসের পাতা পড়ে শেষ করেছি, তার হিসাবও রাখিনি। আর সব নদী গিয়ে মিলেছে যে সাগরে তার নাম বঙ্গোপসাগর। ব-দ্বীপ বাংলাদেশ তার বুকেই জেগে আছে। শ্যামল-সবুজের পাশেই অথৈ জলরাশি। নদীমেখলা ছোট্ট দেশের এত বৈচিত্র্য। পাহাড়ি ছড়া বা ঝরনা আপনাকে যেমন মন ভরিয়ে দেয় সাগরও। নদীর শান্ত রূপ আর অশান্ত রূপ দুটোই আমার দেখা আছে। অসংখ্য শরৎ এবং শীতের বিকেল আমি কাটিয়েছি ব্রহ্মপুত্রের শাখার পাড়ে। শীতের মরা নদীর বুকে ঘাসের ওপর শুয়ে থেকে অসংখ্য সন্ধ্যার সঙ্গে কথা বলেছি। জীবনানন্দ দাশকে তখনো আমার অজানা। বড় হয়ে বুঝেছি, সেই শীতের সন্ধ্যায় শাখা নদীর পারে আমার পাশ দিয়ে বহুবার হেঁটে গেছেন কীর্তিনাশার জীবনানন্দ। তখন চিনতাম—শেওড়া, মান্দার, ফণিমনসা, বট, অশ্বত্থ, দূর্বা, ডাহুক, শালিক, দোয়েল, চড়ুই, বাঁশঝাড়, সরিষা ক্ষেত, গরুর গাড়ি আর ধুলাওড়া দূরের পথ।
আব্বা যে বছর বলেছিলেন নদী বা সমুদ্রের কাছে যেতে, তার পরের বছরই সমুদ্রে যাবার আমার সুযোগ হয়। ১৯৮১ সাল—আমি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। প্রায় পঁচিশজন কলেজ বন্ধু মিলে প্রথম সমুদ্রযাত্রা করি। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার কী যে আনন্দ, তা বলা যাবে না। ঢাকা থেকে কক্সবাজার দীর্ঘ যাত্রা। সে সময় চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়ার রাস্তা খুব খারাপ ছিল। আমরা শীতের এক সকালে ঢাকা থেকে একটি ভাড়া করা বাসে হৈ হৈল্লোড় করে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ রাতে সমুদ্রসৈকতে গিয়ে পৌঁছুলাম। ছয়লাব করা জ্যোৎস্না। সম্ভবত তখন জোয়ার চলছিল। ঢেউয়ের মহাগর্জন। ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে অজস্র বালি রাশিতে। কে কখন আগে সমুদ্রের জলে নামব, তারই প্রতিযোগিতা। রাত বলেই গভীর সমুদ্রকে দেখা যাচ্ছে না, তবে অনুভব করা যাচ্ছে সমুদ্রের গভীরতা। আমরা সেই রাতে কাটিয়ে দিলাম সৈকতে।
এরপর বহুবার গিয়েছি কক্সবাজার। মনে হবে, একই সাগর, জোয়ার-ভাটা, এক রকমের ঢেউ, ঢেউয়ের লোনা জলে ঝাপাঝাপি, জলের কিনারে দীর্ঘক্ষণ হেঁটে বেড়ানো, প্রতিদিনের সূর্যাস্ত দেখা, গভীর জ্যোৎস্নার আলোয় জলের গর্জন শোনার মধ্যে কতটুকু ভালো লাগা আছে, কতটুকু বৈচিত্র্য আছে? মানুষ কেন যেতে চায় বারবার, কেন যায় বারবার। আমিও কেন যাই বহুবার!
সমুদ্রের সীমাহীন জলরেখা দেখেও আমি ভুলে যাইনি আমার প্রিয় নদ ব্রহ্মপুত্রকে। কী করে ভুলি? সেখানে যে পড়ে আছে আমার স্মৃতিময় শৈশব। মানুষ কেন ফিরে পায় না তার হারানো শৈশবকে—এই না পাওয়ার বেদনা আমাকেও তাড়ায়। আমিও ফিরে যেতে চাই প্রিয় ব্রহ্মপুত্রের কাছে। কিন্তু পারি না। এই না পারার বেদনা আমাকে কুরে কুরে খায়। হয়তো আমিও নেই আগের মতো, হয়তো ব্রহ্মপুত্রও নেই আগের মতো। সময়ের স্রোতে সেও বদলে গেছে। আমিও আছি অনেক অনেক দূরে... তবু বলি—‘এই নদী এমন নদী...’। যদি আবার সেই নদীর পার ধরে, পেটের বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে পারতাম, যদি ডুবসাঁতার খেলতে পারতাম... আহা!
শিহাব শাহরিয়ার : কবি
