আইসক্রিমের প্রতিটি স্বাদ যেন আনন্দের গল্প

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৪ এএম

‘আইসক্রিম দেখলেই আমার মনে হয়, ছোট্ট একটা আনন্দ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি’, আইসক্রিম খেতে ঠিক কেমন লাগে, জানতে চাইলে এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলেন মুমতাহিনা খান তাহা, যিনি বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি ভার্সনের দ্বিতীয় গ্রেডের শিক্ষার্থী।  

আইসক্রিম খেতে খেতে গলে হাত বেয়ে নেমে এলেও খুব মজা লাগে, এমনটি জানিয়ে মুমতাহিনা বললেন, ‘দোকানে গেলে কোন স্বাদের আইসক্রিম খাব, সেটা ঠিক করতেই অনেক সময় লাগে। চকোলেট, স্ট্রবেরি, আবার কখনো কোন আইসক্রিম আমার খেতে ভালো লাগে। বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে আইসক্রিম খাওয়ার আনন্দটা অনেক।’

মুমতাহিনার মা অবশ্য ‘আইসক্রিম বেশি খেলে ঠান্ডা লাগতে পারে,’ এমনটি বলেন। তাই এখন তিনি বুঝে-শুনে খান। তারপরও গরমের দিনে টিফিন বিরতির সময় যা তার মনে হয়, তা তিনি এভাবেই প্রকাশ করলেন, ‘ইস যদি একটা আইসক্রিম পেতাম, তাহলে আর কিছু চাই না।’

শুধুই কি মুমতাহিনা? তপ্ত দুপুরে রাস্তায় ঘণ্টা বাজিয়ে আইসক্রিমওয়ালার আগমন, এই দৃশ্য আজও আমাকে শৈশবে নিয়ে যায়। স্মৃতির দরজা খুলে যায়। মায়ের কাছ থেকে ৫০ পয়সা নিয়ে দৌড়। তারপর মেরুন রঙের কাঠিওয়ালা আইসক্রিম, আহা কি সেই স্বাদ! সেই সময় শুধু এমনই মনে হতো পৃথিবীতে এমন সুস্বাদু খাবার দ্বিতীয়টি নেই।

বরফ আর মধুর প্রাচীন গল্প

আইসক্রিমের জন্ম নিয়ে অনেক মতভেদ থাকলেও গবেষকরা বলছেন, চার হাজার বছর আগে সূচনা হয়েছিল। প্রাচীন চীনে শীতকালে সংগ্রহ করা বরফের সঙ্গে দুধ ও চাল মিশিয়ে ঠান্ডা খাবার তৈরি করা হতো। পরে সেই ধারণা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পারস্যে, যেখানে গোলাপজল, জাফরান, ফলের রস ও বরফ মিশিয়ে তৈরি হতো রাজকীয় ঠান্ডা মিষ্টান্ন।

প্রাচীন রোমেও বরফের ব্যবহার ছিল। সম্রাট নিরো পাহাড় থেকে বরফ এনে তাতে ফলের রস ও মধু মিশিয়ে খেতেন এমন গল্প লেখা আছে। অভিযাত্রী মার্কো পোলো ১৩শ শতকে চীন থেকে ইতালিতে ফিরে আসেন। আসার সময় ঠা-া ডেজার্ট তৈরির ধারণা  নিয়ে আসেন। যদিও এই তথ্যেরও প্রমাণ নেই। ইতালি থেকেই আধুনিক আইসক্রিমের বিকাশ এমনটাই বলছেন ইতিহাসবিদরা। যা আস্তে আস্তে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে। ১৮৪৩ সালে মার্কিন নারী উদ্ভাবক ন্যান্সি জনসন হাতে ঘোরানো আইসক্রিম ফ্রিজারের পেটেন্ট নেন। এই আবিষ্কার আইসক্রিমকে রাজপ্রাসাদ থেকে মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসে।

স্বাদে বৈচিত্র্য সময়ের সঙ্গে

শুরুতে ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি আর চকোলেট এই তিনটি স্বাদই জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের রুচি। গ্রিন টি, ল্যাভেন্ডার, লবণাক্ত ক্যারামেল, ব্ল্যাক সিসেম, ওয়াসাবি, এমনকি মরিচের স্বাদের আইসক্রিমও তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য রয়েছে সুগার-ফ্রি, লো-ফ্যাট, ভেগান, ল্যাকটোজ-ফ্রি এবং উদ্ভিজ্জ দুধ দিয়ে তৈরি আইসক্রিম।

দেশে আইসক্রিমের যাত্রা

ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতা ও ঢাকার অভিজাত সমাজে প্রথম আইসক্রিম জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। স্বাধীনতা-পরবর্তী স্থানীয় উদ্যোক্তারা আইসক্রিম উৎপাদনে এগিয়ে আসেন। জেলা-উপজেলাগুলোতে উদ্যোক্তারা স্থানীয়ভাবে আইসক্রিম তৈরি করে বিক্রি করতেন।

আজকের শিশুদের কাছে ফ্রিজভর্তি নানা ব্র্যান্ডের আইসক্রিম সহজলভ্য। তা ছাড়া ফ্রিজ ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থার উন্নতির কারণে শহরের পাশাপাশি গ্রামেও পৌঁছে গেছে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির আইসক্রিম।

দেশের বাজারে কাপ, কোন, বার, স্টিক, ফ্যামিলি প্যাক, টাব, কুলফি, জেলাটো-ধাঁচের আইসক্রিমসহ নানা ধরনের পণ্য পাওয়া যায়।

আইসক্রিমের রঙিন বৈচিত্র্য

আইসক্রিমের জগৎ যেন বিশাল রঙের মেলা। দুধের ক্ল্যাসিক আইসক্রিম সবচেয়ে পরিচিত। এর বাইরে রয়েছে জেলাটো, যা ইতালীয় ধাঁচের এবং তুলনামূলকভাবে কম ফ্যাট। সফট সার্ভ আইসক্রিমের টেক্সচার অনেক বেশি নরম। ফ্রোজেন ইয়োগার্ট স্বাস্থ্যসচেতনদের কাছে জনপ্রিয়। কুলফি দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ঘন দুধের আইসক্রিম, যার স্বাদ অন্যগুলোর থেকে আলাদা।

আইসক্রিম মানেই সুখ

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো খাবারের সঙ্গে যদি সুন্দর স্মৃতি জড়িয়ে থাকে, তাহলে একজন মানুষ সেটি খাওয়ার সময় মানসিক প্রশান্তি অনুভব করেন। আইসক্রিমের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। আইসক্রিমকে অনেকেই ‘হ্যাপিনেস ফুড’ বলেন।

স্বাদের বাইরে এক সংস্কৃতি

বিশ্বজুড়ে পর্যটনেরও আকর্ষণ হয়ে উঠেছে স্থানীয় আইসক্রিম। ইতালির জেলাটো, তুরস্কের দন্দুরমা, ভারতের কুলফি কিংবা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী দুধের আইসক্রিম প্রতিটি স্বাদের পেছনেই রয়েছে নানা গল্প।

জানতে পারেন

পৃথিবীতে সবচেয়ে জনপ্রিয় আইসক্রিমের স্বাদ এখনো ভ্যানিলা। বিশ^জুড়ে এর বিক্রিও বেশি। আইসক্রিমের কোন আবিষ্কার করেন ১৯০৪ সালের সেন্ট লুইস ওয়ার্ল্ড ফেয়ার। জাপানে অক্টোপাস, স্কুইড কিংবা সয়াসসের স্বাদের আইসক্রিমও পাওয়া যায়। আবার দুবাইয়ে সোনার পাত দিয়ে সাজানো বিলাসবহুল আইসক্রিমও বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় আইসক্রিম তৈরি করতে লেগেছিল কয়েক টন দুধ ও অন্যান্য উপকরণ। বিশ্বের অনেক দেশে জুলাই মাসকে আইসক্রিম উদযাপনের মাস হিসেবে ধরা হয়।

আইসক্রিম নিয়ে যত ধারণা

আইসক্রিম নিয়ে বেশ কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন আইসক্রিম খেলেই সর্দি-কাশি হয়, টনসিল বাড়ে। চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

হাজার বছরের ইতিহাস পেরিয়ে আইসক্রিম আজও একইভাবে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি বদলেছে, স্বাদ বদলেছে, প্যাকেট বদলেছে; কিন্তু বদলায়নি এক স্কুপ আইসক্রিম হাতে পাওয়ার সেই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস। এ কারণেই হয়তো পৃথিবীর নানা প্রজন্ম, নানা ভাষা আর নানা সংস্কৃতির মানুষ একটি বিষয়ে একমত জীবনের ছোট ছোট সুখের মুহূর্তগুলোকে মিষ্টি করে তুলতে এক স্কুপ আইসক্রিমই যথেষ্ট।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত