রহস্যঘেরা অর্ধশত মৃত্যু

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১১ এএম

জ্বর, সর্দি ও কাশির পাশাপাশি শরীরে লালচে দানা বের হওয়া যেসব শিশু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে তাদের এই নমুনা দেখেই ধরে নেওয়া হচ্ছে হামে আক্রান্ত। হাসপাতালে তাদের যতটা সম্ভব আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমন উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা ৫০ শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। স্বাভাবিকভাবেই উপসর্গ দেখে প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া হয়েছে তারা হামে আক্রান্ত ছিল। কিন্তু বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় এসব শিশুর নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাদের শরীরে হামের জীবণু নেই। এমন প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, যদি হাম না হয়, তাহলে এসব মৃত্যুর কারণ কী?

গত মাসের শুরু থেকেই রাজশাহী অঞ্চলে হামের বাড়তি সংক্রমণ শুরু হয়। রাজশাহী বিভাগ ছাড়াও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এমনকি ঢাকা বিভাগের দুয়েকটি জেলা থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে আসতে থাকে রামেক হাসপাতালে। এখানে আসার পর প্রাথমিক ধারণা থেকে শুরু হয় হামের চিকিৎসা। হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৮ শতাধিক রোগী রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এদের মধ্যে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। হামের পরীক্ষা করাতে নমুনা পাঠাতে হয় ঢাকায়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রামেক হাসপাতালে মারা যাওয়া রোগীদের শরীরে হামের জীবাণু শনাক্ত হয়নি। এখন প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তাহলে কী? এটি নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উপসর্গ এক হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ভিন্ন হতে পারে। বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্ত করা দরকার। তিনি বলেন, যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে তাদের প্রায় সবারই শ্বাসকষ্ট নিউমোনিয়া ছিল। এতগুলো শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিল, কিন্তু পরীক্ষায় তাদের হাম শনাক্ত হলো না। এটার কারণ নিশ্চিত হতে পারলে চিকিৎসা দেওয়া আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে এটি নতুন কোনো ভাইরাসের স্ট্রেইন কিনা বা কোভিড বা আরও কাছাকাছি যে ভাইরাসগুলো রয়েছে, তাদের মিউটেশনের কোনো একটি রূপ কিনা এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের আলোচনা এবং গবেষণা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।’

তিনি বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি হামে আক্রান্ত হলে শরীরে র‌্যাশ হবে, জ্বর হবে, ঠান্ডা-সর্দি হবে। কিন্তু এবার আমরা দেখছি এই উপসর্গগুলো থাকলেই তা হাম হচ্ছে এ রকম কোনো নিশ্চয়তা নেই। যখন আমরা রক্ত পরীক্ষা করছি বা থ্রোট সোয়াব দিয়ে আমরা পরীক্ষা করে রিপোর্টটা পাচ্ছি, দেখা যাচ্ছে এখানে হামের জীবাণু পাওয়া যাচ্ছে না। সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া চিকিৎসা দিলে অনেক সময় প্রকৃত কারণ আড়াল হয়ে যায়। তাই মৃত্যুর সঠিক কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শাহনাজ পারভিন বলেন, এতগুলো বাচ্চা তো এমনি এমনি মারা যায়নি। এর নিশ্চয় কোনো কারণ আছে। এটা নিশ্চিত করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সরকারের দায়িত্ব। কোনো শিশু আক্রান্ত হওয়ার আটদিন পর জীবাণু নাও পাওয়া যেতে পারে। তবে রামেক হাসপাতালে এতগুলো শিশু মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। এই দায় কেউই এড়াতে পারে না। আগামী দিনে এই চিকিৎসা আরও ভালো করার জন্যও এসব মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া দরকার। এমনও তো হতে পারে হামের এটি নতুন ধরন। আর হাম না হয়ে অন্য কোনো ভাইরাস কিনা সেটিও নিশ্চিত হতে হবে। সরকাররের এ নিয়ে উদ্যোগ থাকা দরকার।

তবে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে এ নিয়ে কোনো তথ্য নেই। তারা বলছেন বিষয়টি জাতীয় ইস্যু। কেন্দ্র থেকে যে সীদ্ধান্ত নেওয়া হবে তারই বাস্তবায়ন হবে।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা উপসর্গ অনুযায়ী রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছি এবং নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস ল্যাবরেটরিজ আইপিএসে পরীক্ষা হচ্ছে এবং পজিটিভ যেসব রোগী পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো আমরা হাম বলে বিবেচনা করছি। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব রোগী আসছে, সব রোগীকেই আমরা জেলা, উপজেলা এবং মেডিকেল কলেজ সব লেভেলে আইসোলেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত