জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর থেকেই সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব গঠন নিয়ে দলীয় অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, শিগগিরই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। সম্ভাব্য নেতৃত্বে আসতে পারেন এমন নেতারা ইতিমধ্যে জোর তৎপরতা শুরু করেছেন। সামাজিক মাধ্যম এবং সংগঠনের ভেতরে-বাইরে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও জল্পনা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া অনেকটাই গুছিয়ে আনা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্মতি পেলে শিগগিরই নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ‘সুপার ফাইভে’ কয়েকজন নেতার নাম ইতিমধ্যে জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। কমিটিতে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা নেতাদেরই নতুন কমিটিতে প্রাধান্য দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বেড়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা শোডাউন, শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি এবং দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। পাশাপাশি লবিং, তদবির ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়িয়েছেন অনেকে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন ছাত্রদলের শীর্ষ পাঁচ নেতা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে নতুন নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
পরে মধ্যরাতে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব লেখেন, অনেক বেশি সম্মান ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে। তিনি নতুন জীবন শুরু করার ইচ্ছার কথা জানান। একই সঙ্গে নতুন কমিটিকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
জানা গেছে, কমিটিতে যাতে কোনো বিতর্কিত ব্যক্তি বা অনুপ্রবেশকারী স্থান না পায়, সে জন্য প্রার্থীর পারিবারিক রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং বিগত আন্দোলনগুলোতে ভূমিকা কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আলোচনায় যারা : ছাত্রদলের আসন্ন কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২০০৯-১০ থেকে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের নেতাদের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা বেশি বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে সংগঠনকে আরও গতিশীল করা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে তুলনামূলক জুনিয়র কাউকে সাধারণ সম্পাদক পদে আনার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির ২ নম্বর সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল, কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল। একই শিক্ষাবর্ষের মনজরুল আলম রিয়াদ ও শাফি ইসলামও সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছেন।
২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ এবং মাসুদুর রহমান মাসুদ।
২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের নেতাদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তারিক, মাসুম বিল্লাহ (এফ আর হল) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ১ নম্বর সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক।
২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ থেকেও বেশ কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নাছির উদ্দিন শাওন, জাহিদ হাসান শাকিল, কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মাহমুদুল ইসলাম কাজল, রাজু আহমেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম রনি, প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ১ নম্বর যুগ্ম সম্পাদক শামিম আকতার শুভ।
২০১২-১৩ সেশন থেকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভুঁইয়া ইমন ও পাঠাগার সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম আলোচনায় রয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক জিয়ন। এর মধ্যে আউয়াল দলীয় কর্মসূচিতে চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল টিমের নেতৃত্ব বা তত্ত্বাবধানের কাজে তাকে যুক্ত থাকতে দেখা যায়। আর জিয়ন সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেলে ছাত্রদলের পক্ষে বক্তব্য ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে চান কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের বর্তমান সহসভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন ইশরাক। আলোচনায় থাকা কয়েকজন নেতা বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতিমধ্যে নতুন কমিটির বিষয়ে কাজ অনেকটাই গুছিয়ে এনেছেন। যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের নেতৃত্বে আনা হবে এমন প্রত্যাশা তাদের।
এর আগে ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাত সদস্যের আংশিক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে একই বছরের ১৫ জুন ২৬০ সদস্যের আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়। দুই বছর মেয়াদি ওই কমিটির মেয়াদ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় সম্ভাব্য নেতৃত্ব : ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সাত সদস্যের আংশিক কমিটি ২০২৪ সালের ১ মার্চ ঘোষণা করা হয়। এতে গণেশ চন্দ্র রায় সাহসকে সভাপতি এবং নাহিদুজ্জামান শিপনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরে কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর ২৪২ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের এবারের নেতৃত্বে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় মূলত ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪ এবং ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের নেতারাই বেশি আলোচনায় রয়েছেন।
২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছেন ঢাবি ছাত্রদলের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জসিম খান। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিএম কাউসার ও সাইফ খান নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে রয়েছেন ঢাবি ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামী, বজলুর রহমান বিজয়, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান এবং মিনহাজুল ইসলাম নয়ন।
২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আবু হায়াত মো. জুলফিকার জেসান, শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, প্রচার সম্পাদক তানভীর হাসানের নামও আলোচনায় রয়েছে।
অপেক্ষাকৃত নবীন ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পাদক মো. মেহেদী হাসান, আপ্যায়নবিষয়ক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক সাইয়্যেদ ইমাম হোসেন অনিক, ইমন ইসলাম ও সাইফ চৌধুরীর নাম আলোচনায় রয়েছে।
ছাত্রদলের কমিটি প্রসঙ্গে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আজকে পর্যন্ত আমার কাছে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা আসেনি। যদি সে রকম কোনো সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই আসবে। আমি জানিয়ে দেব।’