আওয়ামী লিগ রাজনীতির সাথে জড়িত সাবেক তিন জাতীয় অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়, মাশারাফী বিন মোর্ত্তজা ও সাকিব আল হাসান। ২০২৪ আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পর এই তিন জনের ক্রিকেটাঙ্গনে ফেরাটা কঠিন হয়ে গেছে তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে। তবে শুধু সাকিবকে নিয়ে বেশি কথা হচ্ছে বলে মনে করেন বিসিবির অ্যাডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল।
মিরপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেছেন, 'আমরা গত এক-দুই বছর ধরে একজন নির্দিষ্ট ক্রিকেটার, নাম বললে সাকিবকে নিয়েই আমরা কথা বলছি। আমি অনুরোধ করব এই প্রশ্নটা যখন করেন আমাদের তিনজন ক্রিকেটার, সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা, নাইমুর রহমান দুর্জয়, সাকিব আল হাসান একই ধরনের পরিস্থিতিতে আছে। আমার মনে হয় না এটা উচিত হবে এখানে বসে শুধু একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে কথা বলা।'
তামিম ইকবাল জানান, 'আমাদের তরফ থেকে ক্রিকেটিং যেকোন ধরনের সুযোগ-সুবিধা আমরা তাদেরকে স্বাগত জানাব। আইনের যে বিষয়গুলো আছে, আমাদের প্রতিমন্ত্রীও বলেছেন আমরা নমনীয় হবো। ক্রিকেট বোর্ড হিসেবে আমাদের তরফ থেকে ক্রিকেটীয় যেসব সহায়তা করতে পারি সেটা আমরা সবসময় করব। আমরা তাদের স্বাগত জানাব যদি উনারা ওই সমস্যা সমাধান করে আসেন।'
আরও ১৫০ থেকে ২০০ ক্রিকেটার বের করে আনার উদ্যোগ
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির তিনটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তামিম ইকবাল। যার অন্যতম কাউন্টি ক্রিকেটের মতো জাতীয় ক্রিকেট লিগের দলগুলোর দ্বিতীয় একাদশ গঠন করা। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের সমান্তরালে এই মৌসুম থেকেই প্রতিটি বিভাগীয় দলের দ্বিতীয় একাদশ খেলবে তিন দিনের টুর্নামেন্ট।
এই প্রসঙ্গে তামিম বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্রিকেটারদের জন্যই আমাদের বেশির ভাগ ক্রিকেট। যারা জাতীয় দলে খেলে, তারাই বিপিএল খেলে, বিসিএল খেলে, এনসিএল খেলে। একটা শ্রেণির খেলোয়াড়েরা ৫-৬টা টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু যারা থার্ড ডিভিশন, সেকেন্ড ডিভিশন বা ফার্স্ট ডিভিশন খেলে, তাদের জন্য এই লিগ খেলা ছাড়া আর কোনো খেলা নেই।’ তামিম মনে করেন, এ কারণেই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সেকেন্ড ডিভিশন বা থার্ড ডিভিশন থেকে কোনো খেলোয়াড়ের জাতীয় দলে আসার ঘটনা তেমন নেই। তাঁরা ওই প্ল্যাটফর্মটাই দিতে চান ক্রিকেটারদের।
জাতীয় লিগে দ্বিতীয় একাদশের টুর্নামেন্ট সম্পর্কেও বিস্তারিত বলেছেন তামিম, ‘কাউন্টি ক্রিকেটে ফার্স্ট ইলেভেন এবং সেকেন্ড ইলেভেন থাকে। এখন থেকে এনসিএল যখন শুরু হবে, চিটাগংয়ের দুইটা টিম থাকবে—ফার্স্ট ইলেভেন ও সেকেন্ড ইলেভেন। ঢাকারও দুটি টিম থাকবে। এভাবে প্রতিটি টিমের ফার্স্ট ও সেকেন্ড ইলেভেন থাকবে। ফার্স্ট ইলেভেনের অনেক খেলোয়াড় থাকে যারা বেশির ভাগ সময় ১২তম, ১৩তম বা ১৪তম খেলোয়াড় হয়ে থাকে, খেলার সুযোগ পায় না। কিন্তু সেকেন্ড ইলেভেন যখন আমরা শুরু করব, তখন আরও ১০০-১৫০ বা ২০০ ক্রিকেটার খেলার মধ্যে আসবে।’
পিকনিক ক্রিকেট প্রসঙ্গ
এর সুবিধাটাও ব্যাখ্যা করে বলেছেন জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়ক, ‘ধরুন, ঢাকা এনসিএলে ম্যাচ খেলছে, দুই দিন পর তাদের খেলা রাজশাহীর সঙ্গে। রাজশাহীতে ধরুন চারজন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান আছে এবং ঢাকা দলে কোনো অফ স্পিনার নেই। আমরা তখন কী করি? আমরা এখান-সেখান থেকে একজন অফ স্পিনার ধরে এনে খেলিয়ে দিই। এই যে ‘পিকনিক ক্রিকেট’ কথাটা জাতীয় লিগের ক্ষেত্রে ওঠে, সেটার জন্য খালি ক্রিকেটাররা নয়, আমরাও দায়ী। কারণ, আমরাই ওই সংস্কৃতিটা তৈরি করে দিয়েছি। এখন আর কাউকে বাসা থেকে তুলে আনতে হবে না, সেকেন্ড ইলেভেনে ওই অফ স্পিনার খেলতে থাকবে এবং ফার্স্ট ইলেভেন তার পারফরম্যান্স দেখে তাকে জাতীয় লিগে সুযোগ দিতে পারবে। এতে তাদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতাও তৈরি হবে।’ তামিম জানিয়েছেন, দ্বিতীয় একাদশের খেলোয়াড়েরাও ম্যাচ ফিসহ সব রকম সুযোগ-সুবিধা পাবেন। জাতীয় ক্রিকেট লিগে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতিও আবার ফিরিয়ে আনা হবে বল জানিয়েছেন তামিম।
মিরপুরে দর্শকদের সুবিধার জন্য উদ্যোগ
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের পূর্ব গ্যালারিতে ক্যানোপি বসানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে তামিমের অন্তর্বর্তীকালীন বোর্ড। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারির এই অংশটিতেই এখন শুধু ছাদ নেই। সবচেয়ে কম দামের টিকিটের এই গ্যালারিতে খেলা দেখা মানেই রোদে পোড়া অথবা বৃষ্টিতে ভেজা। তামিম জানিয়েছেন, এই গ্যালারির ২৭ হাজার স্কয়ার ফুটজুড়ে লাগানো হবে ক্যানোপি। পুরো মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার চিন্তাভাবনার কথাও বলেছেন তিনি, তবে চিন্তাভাবনাটি এখনো আছে প্রাথমিক পর্যায়ে।
পদত্যাগ করছেন না তামিম
কিন্তু সরকার অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন আয়োজন করতে। তারা দীর্ঘমেয়াদি কাজে হাত দিতে পারে কি না, সংবাদ সম্মেলনে সে প্রশ্নও হয়েছে। জবাবে তামিম বলেছেন, এই কমিটি অন্তত কিছু কাজের উদ্যোগ নিয়ে যেতে চায়। তাঁর আশা, নির্বাচিত বোর্ড এসে এসব কাজের ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তামিম জানিয়েছেন, আগামী ৩ মে অনুষ্ঠেয় বোর্ড সভায় নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এর ৩০-৪৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই-তিন সপ্তাহ আগেই বিসিবির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে তাঁর আশা। নির্বাচনের আগে কমিটি থেকে পদত্যাগ করতে পারেন- এমন গুঞ্জন প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে, পদত্যাগের সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিয়েছেন তামিম।
'ক্রিকেট প্রশাসক নয়, অবসরের পর রাজনীতিতে পুরোপুরি যুক্ত হতে চাই'- সাকিব