স্পেনে পাঁচ লাখ অভিবাসীকে বৈধতার উদ্যোগে পুরোনো ইউরোপীয় তথ্যভাণ্ডার বড় বাধা

আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৩:১২ পিএম

স্পেনে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা প্রায় পাঁচ লাখ অভিবাসীকে বৈধতার আওতায় আনার উদ্যোগ ইউরোপজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। কর্মসূচিটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঘোষণা করা হয় এবং এপ্রিল মাসে তা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর আওতায় বৈধ কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের এক বছরের জন্য নিয়মিত বসবাসের অনুমতি দেওয়া হবে, যদি তারা স্পেনে কমপক্ষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের আগে পাঁচ মাস বসবাস করে থাকেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকে। আবেদন করার জন্য জুন মাসের শেষ পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্পেন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী প্রায় পাঁচ লাখ অভিবাসী এ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। তবে স্প্যানিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফুঙ্কাসের হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যা প্রায় আট লাখ পর্যন্ত হতে পারে। এত অল্প সময় বিপুল সংখ্যক আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। স্পেন সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৩৭০টিরও বেশি ডাকঘর আবেদনকারীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৬০টি সামাজিক নিরাপত্তা কার্যালয় এবং কয়েকটি অভিবাসন কার্যালয়েও আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। যদিও প্রতিদিন ২০০০ থেকে ২৫০০ জন আবেদনকারী লাইনে দাঁড়ালেও জমা নেওয়া হচ্ছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি আবেদন।

রাজধানী মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার কয়েকটি ডাকঘরে আবেদনকারীরা প্রক্রিয়াকে তুলনামূলক স্বাভাবিক বললেও, অনেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ অপেক্ষার অভিযোগ করেছেন। পুরোনো ইউরোপীয় তথ্যভাণ্ডার এখন বড় উদ্বেগ। বহু অভিবাসীর কাছে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পূর্বে দেওয়া আশ্রয় আবেদন, বসবাসের অনুমতির আবেদন, আঙুলের ছাপ এবং পুরোনো অভিবাসন তথ্য। বিশেষ করে যারা ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম বা অন্য দেশে আগে নিবন্ধিত হয়েছেন, তাদের তথ্য স্পেনের যাচাই প্রক্রিয়ায় সামনে চলে আসছে।

ইউরোপীয় অঞ্চলে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানের জন্য একাধিক সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা রয়েছে। সীমান্তে আটক হওয়া, আশ্রয় আবেদন, ভিসা, বহিষ্কার আদেশ, নিরাপত্তা সতর্কতা এবং আঙুলের ছাপসহ বিভিন্ন তথ্য সেখানে সংরক্ষিত থাকে। ফলে স্পেনে আবেদন করলেও পূর্বের ইতিহাস যাচাইয়ের আওতায় আসছেন অনেক আবেদনকারী। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ: পূর্বের আশ্রয় আবেদন বা রেসিডেন্সি আবেদন। বহু অভিবাসী প্রথমে সমুদ্রপথে বা স্থলপথে ইউরোপে প্রবেশের সময় ইতালি, গ্রিস, ফ্রান্স, জার্মানি বা অন্য দেশে নিবন্ধিত হন। পরে নিয়তিত বা এজাইলাম আবেদন গ্রহণ না হওয়ায় তারা স্পেনে চলে আসেন। এখন বৈধতার আবেদন করতে গেলে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসছে: প্রথম নিবন্ধন কোন দেশে হয়েছিল? আশ্রয় আবেদন এখনো চলমান কি না? আবেদন বাতিল হয়েছে কি না? অন্য দেশে থাকার অনুমতি ছিল কি না? কোনো দেশে এখনো সক্রিয় রেসিডেন্সি আছে কি না? বহিষ্কার আদেশ আছে কি না? এসব বিষয়ে আবেদনকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়ছেন।

আঙুলের ছাপ মিললে, অভিবাসীদের ভাষায় সিস নামে পরিচিত বিষয়টি মূলত ইউরোপীয় তথ্যব্যবস্থায় সংরক্ষিত আঙুলের ছাপ, পরিচয় ও চলাচলসংক্রান্ত রেকর্ড। আবেদনকালে নতুন করে বায়োমেট্রিক তথ্য নেওয়ার সময় পুরোনো তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেলে কর্মকর্তারা অতিরিক্ত যাচাই শুরু করতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো আঙুলের ছাপ থাকা মানেই আবেদন বাতিল নয়। বিষয়টি নির্ভর করে ওই রেকর্ডের প্রকৃতি ও বর্তমান আইনি অবস্থার ওপর। প্রশাসনিক চাপও বড় সমস্যা। স্পেনে বৈধতার এই উদ্যোগের কারণে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক দপ্তরে চাপ বেড়েছে। আবেদনকারীরা অভিযোগ করছেন: সাক্ষাতের সময় পাওয়া কঠিন, আবেদন জমার তারিখ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, পুলিশ সনদ সংগ্রহে সমস্যা, পৌর নিবন্ধন সনদ পেতে জটিলতা, কর্মহীনতার সনদ সংগ্রহে বিলম্ব, নথি যাচাইয়ে সময়ক্ষেপণ।

বিশ্লেষকদের মতে, আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রশাসনিক সক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশি আবেদনকারীদের অতিরিক্ত সংকট। আবেদনকারী বাংলাদেশি মোহাম্মদ রানা বলেন, যারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আগে রেসিডেন্সি বা আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন, তারা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সময়মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে না পারা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহে বিলম্ব, পাসপোর্ট নবায়ন জটিলতা এবং দূতাবাসের ধীরগতির কারণে অনেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন জমা দিতে পারবেন না। তিনি আরও বলেন, অনেকেই দালালের মাধ্যমে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের আবেদন করে সময়মতো হাতে পাচ্ছেন না। দূতাবাসে মনিটরিং সেল চালু থাকলে ও কার্যকর উদ্যোগ নিলে আবেদনের অগ্রগতি জানা এবং করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা পাওয়া সহজ হতো। আবেদনকারীরা বেশি জটিলতায় পড়তে পারেন: যারা আগে অন্য দেশে আশ্রয় আবেদন করেছেন, যাদের আঙুলের ছাপ প্রথম প্রবেশদেশে আছে, যাদের নামে বহিষ্কার আদেশ রয়েছে, যারা একাধিক পরিচয় ব্যবহার করেছেন, যাদের নথিপত্র অসম্পূর্ণ।

যারা দীর্ঘদিন স্পেনে অবস্থান করছেন, কাজের প্রমাণ আছে, স্থানীয় নিবন্ধন রয়েছে, কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই এবং পরিচয়পত্র সঠিক আছে, তারা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকতে পারেন। স্পেনের বৈধতা উদ্যোগ বহু অভিবাসীর জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে পুরোনো ইউরোপীয় তথ্যভাণ্ডার, আগের আশ্রয় আবেদন, আঙুলের ছাপের রেকর্ড, নথি সংকট এবং প্রশাসনিক ধীরগতি এখন সবচেয়ে বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ। ফলে এটি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নথি, তথ্য ও আইনি বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠছে হাজারো মানুষের জন্য।

মূল প্রয়েন্ট: পূর্বের আশ্রয় আবেদন, আঙুলের ছাপ, নথি সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতায় উদ্বিগ্ন বাংলাদেশী নিয়মিত হওয়ার প্রত্যাশীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত