বজ্রপাত কি জলবায়ু সংকটের বার্তা

আপডেট : ০২ মে ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম

গ্রামবাংলার কৃষক, জেলে, পথচলা মানুষ কিংবা অসহায় পরিবারের জন্য ‘বজ্রপাত’ শুধু প্রকৃতির দৃশ্য নয়; এটি মুহূর্তে জীবন কেড়ে নেওয়া ভয়াবহ দুর্যোগ। এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০০ মানুষ বজ্রপাতে মারা যায়। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রাণহানির সংখ্যা ৩,৪৮৫। ২০২৫ সালেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল, অন্তত ৩৫০ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। নাসা-সংশ্লিষ্ট গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীতে বছরে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন বজ্রপাত ঘটে অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ৪৪টির মতো বজ্রচমক দেখা যায়। বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি হওয়ার পেছনে রয়েছে আবহাওয়া ও ভৌগোলিক বাস্তবতা। সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলে বজ্রপাত বেশি ঘটে, কারণ এই পরিবেশে বাতাসে জমে থাকা জলীয়বাষ্প মেঘের মধ্যে তীব্র অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সমুদ্রের উষ্ণতা ও আর্দ্রতার প্রভাবে এখানে দ্রুত বজ্রমেঘ তৈরি হয়। একইভাবে খোলা ও সমতল মাঠেও বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি, কারণ কোনো বাধা না থাকায় বজ্র সরাসরি মাটিতে আঘাত করে। সময় অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে, প্রাক-বর্ষা মৌসুম বজ্রপাতের সক্রিয় সময়। এ সময়ে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সমন্বয়ে বজ্রঝড় সহজে তৈরি হয়।

বিশেষ করে কালবৈশাখী ঝড়, যা হঠাৎ সৃষ্টি হয়ে তীব্র বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ ঘটায়, বাংলাদেশের বজ্রপাতের অন্যতম প্রধান উৎস। বিশ্বজুড়ে বজ্রপাত এখনো বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। নাসা আর্থডাটা এবং চিকিৎসা-বিষয়ক উৎস অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশে^ প্রায় ২৪,০০০ মানুষ বজ্রপাতে মারা যায় এবং প্রায় ২,৪০,০০০ মানুষ আহত হয়। আহতদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সমস্যা, স্মৃতিভ্রংশ, শ্রবণশক্তি হ্রাস, দৃষ্টিজনিত জটিলতা বা মানসিক আঘাতে ভোগেন। প্রশ্ন হলো, বজ্রপাত কেন দিন দিন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে? আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এটি গভীরভাবে যুক্ত। উষ্ণ বায়ু বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করে, ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা বাড়ে এবং শক্তিশালী বজ্রঝড় তৈরি হয়। সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে, বজ্রপাতের হার প্রায় ১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো উষ্ণ, আর্দ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এ ঝুঁকি আরও তীব্র। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া; হাওরাঞ্চলের সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ এবং উপকূলীয় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ভোলা ও পটুয়াখালী বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। খোলা মাঠ, জলাশয়, কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশের মৃত্যুহার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি, যদিও যুক্তরাষ্ট্রে বজ্রপাত শনাক্তকরণ, সতর্কতা ও নিরাপদ অবকাঠামো অনেক উন্নত। বিজ্ঞানীরা এখন বজ্রপাতের অবস্থান, তীব্রতা ও সময় নির্ণয় করতে পারেন। তবুও এটি এখনো একটি প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক ঘটনা, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। বজ্রপাত প্রাকৃতিক বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়া। মোবাইল ফোন ছোট যন্ত্র; এটি বজ্রপাত টানে না। আসল ঝুঁকি হলো, খোলা জায়গায় থাকা। আবার মাটিতে শুয়ে পড়লে, শরীরের বেশি অংশ মাটির সংস্পর্শে আসে, ফলে ভূমি-প্রবাহের মাধ্যমে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কিছু সহজ নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি। তাই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য কিছু নিয়ম খুব জরুরি।

বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে দ্রুত পাকা ভবন বা বন্ধ গাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে। খোলা মাঠ, নদী, পুকুর, উঁচু গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি বা টাওয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে। ঘরের ভেতরে থাকলেও বজ্রপাতের সময় তারযুক্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্র, প্লাগ, ট্যাপ, শাওয়ার বা ধাতব পাইপ স্পর্শ করা উচিত নয়। বাইরে আটকে গেলে দুই পা একসঙ্গে রেখে নিচু হয়ে বসতে হবে, কিন্তু কখনোই মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে বায়ু বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করে, ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় এবং ঘন ঘন বজ্রঝড়ের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র দেশে এই প্রভাব আরও স্পষ্ট সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়া এর বাস্তব প্রমাণ। বজ্রপাত মোকাবিলায় প্রয়োজন সরকার, সংস্থা ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ। প্রতিরোধে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা এবং কমিউনিটির যৌথ উদ্যোগ দরকার। প্রথমত, রিয়েল-টাইম বজ্রপাত সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষ মোবাইল এসএমএস, অ্যাপ, সাইরেন বা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে দ্রুত সতর্কতা পান। দ্বিতীয়ত, খোলা মাঠ, হাওর, চরের এলাকা ও উপকূলে বজ্রনিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, স্কুল, মসজিদ, বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও সাইক্লোন শেল্টারে বজ্রনিরোধক ও সঠিক গ্রাউন্ডিং ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। চতুর্থত, কৃষক ও জেলেদের জন্য মৌসুমভিত্তিক সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। পঞ্চমত, বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় আরও শক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। স্থানীয় কমিউনিটিও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউনিয়ন পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ মাঠ, জলাশয় ও রাস্তা চিহ্নিত করা, ঝড়ের সময় কাজ বন্ধ রাখার সামাজিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, স্কুলশিক্ষার্থীদের বজ্রপাত নিরাপত্তা শেখানো এবং স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা এসব ছোট উদ্যোগও প্রাণ বাঁচাতে পারে। বজ্রপাত প্রকৃতির এক অনিবার্য ঘটনা; কিন্তু বজ্রপাতে মৃত্যু অনিবার্য নয়। বিজ্ঞান, সতর্কতা, অবকাঠামো ও সচেতন আচরণ এই চারটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বজ্রপাতকে আর বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন এক নীরব, দ্রুতঘাতী ও জলবায়ু-সংবেদনশীল দুর্যোগ। বাংলাদেশের জন্য সময় এসেছে বজ্রপাতকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কারণ একটি সতর্কবার্তা, একটি নিরাপদ আশ্রয়, একটি সঠিক সিদ্ধান্তই পারে একটি পরিবারকে শোক থেকে রক্ষা করতে। বজ্রপাত থেকে বাঁচার মূলমন্ত্র তাই খুব সহজ। আপনি নিরাপদ আশ্রয় নিন, সচেতন থাকুন, জীবন বাঁচান। একই সঙ্গে অন্যকে বাঁচাতে সচেতন করুন। এক্ষেত্রে কীভাবে দেশব্যাপী জনগণকে সচেতন করা যায়, তার সমন্বিত উদ্যোগ দিতে হবে। এটি সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করা জরুরি।

 লেখক : জলবায়ুকর্মী ও কলাম লেখক

 [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত