বাংলাদেশের ফলমানব এম এ রহিম

আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ১১:৪৮ এএম

অধ্যাপক এম এ রহিম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৃষিবিজ্ঞানী। তার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বাউ-জার্মপ্লাজম। প্রায় ১৭ বছর গবেষণা করে উদ্ভাবন করেন ‘বাউকুল-১’। এ জাতটি সারা দেশের কৃষক ও সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সাধারণ মানুষ তাকে ‘ফলমানব’ অভিহিত করতে শুরু করে। কৃষিতে অবদানের জন্য তিনি ‘হুজ হু বাংলাদেশে ২০১৭’ পদক, বৃক্ষরোপণে অবদানের জন্য ২০০৪, ২০১২ ও ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার, নোবেল বিজয়ী ড. নরম্যান ই. বোরলগ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্মাননা-২০০৮, বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক-২০১৪, বাংলাদেশ একাডেমি অব এগ্রিকালচার স্বর্ণপদক-২০১৬ এবং বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স স্বর্ণপদক-২০১২ সহ দেশি-বিদেশি নানা সম্মাননা অর্জন করেছেন। কৃষি গবেষণায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ সালে তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। অক্লান্ত এই গবেষক বর্তমানে অনুষদ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কৃষি অনুষদে। শিক্ষার্থী-গবেষকদের নিয়ে মেতে আছেন নিত্যনতুন গবেষণায়। বাংলাদেশের কৃষি নিয়ে তার ভাবনা তুলে ধরেছেন ধানতারার পাঠকদের উদ্দেশে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনাম-উজ-জামান

আপনার কৃষিবিজ্ঞানী হয়ে ওঠার পেছনে প্রধান প্রেরণা কী ছিল?

আমি একটি অখ্যাত স্কুলের ছাত্র। মিরপুর হাই স্কুলে আমি পড়াশোনা করেছি। খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া জেলার একটি রেলস্টেশন মিরপুর। আমার বাবা সেই রেলস্টেশনের কর্মচারী ছিলেন। ছেলেবেলায় পড়াশোনায় তেমন ভালো ছিলাম না। খেলাধুলা বেশি করতাম। আমাদের পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত। আমরা ছিলাম চার ভাই ও চার বোন। পড়াশোনার খরচ চালাতে বাবার কষ্টই হতো। আমরা টিউশনি করেও পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। অষ্টম শ্রেণিতে উঠে আমি বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার নিয়ত করলাম। আগের ক্লাসগুলোতে খুব যে ভালো ফলাফল করেছিলাম তা নয়। আমার আগের ক্লাসগুলোর ফলাফল বিবেচনা করে আমার স্কুলে প্রধান শিক্ষক আমাকে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিতে রাজি হলেন না। আমার বন্ধুকে দিয়ে অনুরোধ করিয়েছিলাম। হেড স্যার বলেছিলেন, ও তো এমনিতেই পাস করতে পারে না। আবার বৃত্তি দেবে! কিন্তু বৃত্তি পেলে যেহেতু পড়াশোনার ক্ষেত্রে আমার অনেক সুবিধা হবে, তাই আমি আশা ছাড়লাম না। অনেক দৌড়াদৌড়ি করে অবশেষে আমি বৃত্তি দেওয়ার অনুমতি পেলাম। কিন্তু পরীক্ষা দিয়ে বৃত্তি পেলাম না। তবে বৃত্তি পাওয়ার আশায় যে পড়াশোনা করেছিলাম সেটাই আমার জীবন পরিবর্তন করেছিল। পরে পড়াশোনার এমন অনুরক্ত হলাম যে, নানা কষ্টে পড়লেও পড়াশোনাটা আর ছাড়িনি। লজিং থেকেছি, টিউশনি করিয়েছি। অর্থকষ্ট কেটেছে যখন থেকে কিছু কিছু স্কলারশিপ পেতে শুরু করলাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অর্থ জোগাতেও কিন্তু অনেক কষ্ট হয়েছে। ভর্তির পরে পড়াশোনার খরচ আসবে কোথা থেকে সেই চিন্তাও করতে হয়েছে। তারপর মেজ ভাই বললেন, আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছি। তুই পড়! আমি টিউশনি করে খরচ চালাতে থাকি। তিনি আমার জন্য নিজের পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমার সেই মেজ ভাইয়ের নাম আব্দুর রব। তিনি এখন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমার পড়াশোনার অসুবিধা যখন শেষ হলো স্কলারশিপ পাওয়ার পরে, তখন তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করেন। তিনি ছিলেন কুমিরের একমাত্র ব্রিডার। আমি প্রথম থেকেই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। পড়ার কারণে ভালো ফলাফল, শিক্ষকতা, কাজের প্রয়োজনে গবেষণা এবং সাফল্য লাভ। আমি ছোটবেলা থেকেই যে ভেবেছিলাম কৃষিবিজ্ঞানী হবো, তা না, পথ আমাকে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।

দেশীয় ফলের জাত উন্নয়নে কাজ করতে কী আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে? বাউকুল জাত উদ্ভাবনের প্রক্রিয়াটি কী ছিল?

দেশি ফল উন্নত করতে হবে এমন কোনো রূপরেখা আমাদের ছিল না। ১৯৮৫ সালে এসডিসি-সুইস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন একটি প্রজেক্ট নিয়ে এসেছিল। তার একটি অংশ হিসেবে আমি একটি গবেষণা শুরু করি, ফ্রুট ট্রিজ স্টাডিজ নামে। পরে ১৯৯৪ সালে যখন ইভালুয়েশন হলো, তখন অন্য কম্পোনেন্টগুলো রিজেক্ট হয়ে গেল। আমার কম্পোনেন্টটি টিকে গেল। তারা ২০২০ সাল পর্যন্ত ফান্ড করেছিল। সেখান থেকেই বাউকুল উদ্ভাবিত হয়েছে। এটা নিয়ে কাজ করতে গিয়েই জার্মপ্লাজম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রায় ১১ হাজার ৫০০টি গাছ ছিল। ১২৮টি জাত নিবন্ধন নিয়েছি। এ কাজে পিএইচডি প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা আমাকে প্রভূত সাহায্য করেছে। ২০১২ সালে প্রথম আমরা বাউকুল-১ জাতটি সবার সামনে আনলাম। এটা তখন ভীষণ আলোড়ন তুলেছিল। কৃষক ও সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেছিল। ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। বাউকুল চাষ করে অনেক কৃষক সচ্ছলতা অর্জন করেছিলেন। পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণেও এর দারুণ ভূমিকা ছিল। এখন বাউকুল-৩ চলছে।

আপনার মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার কোনটি হওয়া উচিত?

বাংলাদেশের জনসংখ্যা ভূমির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে আমাদের কৃষি গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৪ সালে ৭ কোটি মানুষের দেশেও কিন্তু মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা গেছে। এখন ১৮ কোটির দেশ, তারপরও মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছে তেমন শোনা যায় না। খাদ্যাভাব তখনই দেখা যায়, যখন বণ্টন ব্যবস্থায় সমস্যা থাকে। এই যে, খাদ্যে উৎপাদনে একটা বিপ্লব এলো, এটি তো এসেছে কৃষি গবেষণার হাত ধরে। হ্যাঁ, চ্যালেঞ্জ আছে। তবে তার সমাধানও হবে কৃষি গবেষণার হাত ধরে। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় এখনো অগ্রাধিকার দিতে হবে খাদ্য নিরাপত্তা।

কৃষি গবেষণার ফল কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত?

কৃষি গবেষণায় উদ্ভাবিত আবিষ্কারকে জনপ্রিয় এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারা সবসময় এই দায়িত্ব গুরুত্ব সহকারে পালন করেছে। এটা আমরা সবসময় দেখেছি। সরকারের কিছু প্রশাসনিক কাঠামো আছে যেগুলো এ ধরনের দায়িত্ব পালন করে থাকে। যেমন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। কিন্তু তাদেরও প্রশাসনিক দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়। এর ফলে তাদের মূল কাজ কৃষকদের নিয়ে প্রশিক্ষণ আয়োজন করা, কৃষি আবিষ্কারগুলো সম্পর্কে কৃষকদের জানানো, তাদের ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা, কোন জায়গায় কোন ফসল লাগানো উচিত সেসব বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা, তাই তারা সব কাজে যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। এসব সমস্যার সমাধান হলে আমরা কৃষি গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল থেকে অনেক বেশি লাভবান হতে পারব।

নতুন প্রজন্মের কৃষি গবেষকদের কোন বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে?

আমরা মনে করি, সরকারি কর্মকর্তারা যখন ঘুষ খান বা রাজনীতিকরা যখন ক্ষমতার অপব্যবহার করেন সেটিই বুঝি দুর্নীতি। কিন্তু যে শিক্ষক বেতনটি নিচ্ছেন কিন্তু ক্লাস ঠিকমতো করাচ্ছেন না। সময়মতো ক্লাসে আসছেন না তিনি কি দুর্নীতি করছেন না? অবশ্যই দুর্নীতি করছেন। যে যার অবস্থান থেকে যদি তার নির্দিষ্ট কাজটি না করেন তাহলে তিনি দুর্নীতি করছেন। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছেন জনগণের টাকায়। সেই সাধারণ মানুষের জন্য তাদের কাজ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের গবেষকদের গবেষণার উদ্দেশে বলব গবেষণার উদ্দেশ্য যেন উন্নয়ন সংখ্যার মোটা ফান্ড না হয়, যেন সাধারণ মানুষের কল্যাণমুখী হয়। তাহলেই তাদের গবেষণা ও শ্রম সার্থক হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত