দেশের সর্বপ্রথম আম পাড়া দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে সাতক্ষীরার আম মৌসুম। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় শুরু হয়েছে দেশের প্রথম আম পাড়া উৎসব। গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, বৈশাখী, গোলাপখাসসহ বিভিন্ন আগাম জাতের আম পাড়ার মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে সদর উপজেলার ফিংড়ী ইউনিয়নের আমচাষী আবু সাঈদের বাগানে এ উৎসবের উদ্বোধন করা হয়।
আগাম জাতের আম সংগ্রহকে কেন্দ্র করে সদর উপজেলার ফিংড়ী ইউনিয়নে আয়োজিত উৎসবে চাষি, ব্যবসায়ী ও কৃষি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে সৃষ্টি হয় প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ পরিবেশ। উপকূলীয় আবহাওয়ার অনুকূলে সবার আগে আম পাকার এই জেলায় মৌসুমের সূচনাকে ঘিরে দেখা দিয়েছে আশাবাদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। চাষি, ব্যবসায়ী, কৃষি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে দিনটি পরিণত হয় এক উৎসবমুখর আয়োজনে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলার উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম। প্রধান অতিথি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক বিষ্ণুপদ পাল। স্বাগত বক্তব্য দেন সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন।
প্রধান অতিথি বিষ্ণুপদ পাল বলেন, সাতক্ষীরার আমের সুনাম এখন দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই সুনাম ধরে রাখতে হলে অবশ্যই নির্ধারিত ‘আম ক্যালেন্ডার’ অনুসরণ করতে হবে। অপরিপক্ব আম সংগ্রহ ও বাজারজাত করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে আগাম পাকা আম সংগ্রহ করা যাবে। নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে জেলায় একটি বড় পরিসরের আম মেলা আয়োজন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা সহজ করতে প্রশাসনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
স্বাগত বক্তব্যে কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, আম পাড়া উৎসব এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অংশ। এটি শুধু কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম নয় বরং স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। ভবিষ্যতে নিরাপদ আম উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে আরও আধুনিক পদ্ধতি যুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
আমচাষী আবু সাঈদ বলেন, সাতক্ষীরায় একটি আধুনিক হিমাগার স্থাপন খুবই জরুরি। সংরক্ষণ সুবিধা থাকলে আমরা ন্যায্য দামে আম বিক্রি করতে পারবো এবং ক্ষতির ঝুঁকি কমবে।
সভাপতি উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, আম চাষ একটি লাভজনক কৃষিখাত। মধ্যস্বত্বভোগী কমিয়ে সরাসরি চাষিদের লাভবান করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি একটি আম প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ব্যবসায়ী লিয়াকত হোসেন বলেন, দেশে সবার আগে সাতক্ষীরার আম বাজারে আসে। আর স্বাদ-গুণেও এটি সেরা। এজন্য ক্রেতাদের আগ্রহ থাকে সবচেয়ে বেশি। চাষী ও ব্যবসায়ী হেমন্ত দাস বলেন, সাতক্ষীরার আমের আলাদা একটা ঘ্রাণ ও মিষ্টতা আছে, যা দেশের অন্য অঞ্চলের আম থেকে আলাদা। এই জেলার আম মানেই আস্থা।
আমচাষী বেলাল হোসেন বলেন, আম মৌসুমের শুরুতেই সাতক্ষীরা বাজার সরগরম হয়ে ওঠে। এখানে উৎপাদিত আম দ্রুত দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। মনিরুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরার আম আগে আসে বলেই ব্যবসায়ীরা ভালো দাম পান। যদি সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত হয়, তাহলে রপ্তানির সুযোগও বাড়বে।
আমচাষী খালিদ হাসান লিমন জানান, উপকূলীয় আবহাওয়ার কারণে সাতক্ষীরায় দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় আগে আম পাকে। এরই মধ্যে বাগানজুড়ে পাকা আমের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে, যা চাষিদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সদর উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা প্লাবনী সরকার জানান, চলতি মৌসুমে ৫ মে থেকে গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাস ও বৈশাখী জাতের আম বাজারে এসেছে। ১৫ মে থেকে হিমসাগর, ২৭ মে থেকে ল্যাংড়া এবং ৫ জুন থেকে আম্রপালি বাজারজাত শুরু হবে।
কৃষি বিভাগ জানায়, ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলায় প্রায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। নিবন্ধিত আম বাগানের সংখ্যা ৫ হাজার ২৯৯টি এবং সরাসরি এ খাতে যুক্ত রয়েছেন অর্ধলক্ষাধিক চাষি। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, অনুকূল আবহাওয়া ও সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার আম নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
দুমকিতে প্রেমিক-প্রেমিকা আটক, মীমাংসার চেষ্টা চলছে