বর্ষায় উত্তাল ঢেউ আর ভাঙনের তান্ডব, আর শীত আসতেই খাঁ খাঁ মরুভূমি তিস্তার এই দুই রূপই এখন তীরের মানুষের খুব চেনা। তবে এবার ভাগ্যের চাকা ঘোরার নতুন স্বপ্ন দেখছেন নদীপাড়ের দুই কোটি মানুষ। একদিকে দেশে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ, অন্যদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন এই পরিবর্তিত পরিপ্রেক্ষিতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ ও ‘ন্যায্য হিস্যা’ নিয়ে নতুন করে বুক বাঁধছেন কৃষকরা। সরেজমিন লালমনিরহাটের আদিতমারী ও হাতীবান্ধা ঘুরে দেখা গেছে, একসময়ের প্রমত্তা তিস্তা এখন ধু-ধু বালুচর। যেখানে একসময় পালতোলা নৌকা চলত, সেখানে এখন মানুষ মাইলের পর মাইল হেঁটে পাড়ি দিচ্ছে। পানির অভাবে মরে বিলুপ্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, চর পড়ে মূল নদী এখন সরু নালা। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া অনেক পরিবার এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েছে রাস্তার ধারে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবি এবং বিজেপি সরকারের আধিপত্যকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মমতার বিরোধিতার কারণে দীর্ঘদিন আটকে থাকা তিস্তাচুক্তি এবার দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে আলোর মুখ পেতে পারে। আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ভারতে তো ভোট হইল বাহে। মোদি সরকার ক্ষমতায় আসছে। মমতার বাধায় এতদিন পানি পাই নাই, এবার যদি হামরা তিস্তাত পানি পাই।’ একই আশার কথা শোনালেন হাতীবান্ধার ডাউয়াবাড়ি গ্রামের রহিদুল ইসলামও। তিনি বলেন, ‘হামার দাবি একটাই তিস্তাত পানি। পানি আসলে হামার কষ্ট শ্যাষ হইবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ খরস্রোতা তিস্তা নদী সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল হয়ে বাংলাদেশের লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রামের ভেতর দিয়ে ১২৪ কিলোমিটার অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ১৯৯০ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করা ‘তিস্তা ব্যারাজ’ প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তরের ৩৫ উপজেলার দুই লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ভারতের গজালডোবায় বাঁধ নির্মাণের ফলে বর্তমানে শুকনো মৌসুমে মাত্র ৪০০-৫০০ কিউসেক পানি পাওয়া যায়, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ২০ হাজার কিউসেক।
সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় প্রায় প্রতিটি প্রার্থীর ইশতেহারেই ছিল ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ ও নদী খননের আশ্বাস। তবে বিগত কয়েক দশকের তিক্ত অভিজ্ঞতা এ অঞ্চলের মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বুনে দিয়েছে। তারা বলছেন, ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি মিললেও পরে তা আর আলোর মুখ দেখে না। এবার তারা কথার বদলে তিস্তাচুক্তি ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে চান।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও নদীশাসনের বিষয়ে আশাবাদী পানি উন্নয়ন বোর্ড। লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার রায় বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের একটি। এটি বাস্তবায়িত হলে নদী খনন ও পাড় সংরক্ষণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
তিস্তাতীরের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এখন কেবল একটি মহাপরিকল্পনা আর পানির ন্যায্য হিস্যার ওপর নির্ভর করছে। প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ফসলি জমি আর ঘরবাড়ি বিলীন হওয়া রোধে দ্রুত তিস্তাচুক্তি আর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ওই অঞ্চলের সবার দাবি। উত্তর জনপদের এ আর্তনাদ কি নতুন সরকারের কানে পৌঁছাবে? সে প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তিস্তাপাড়ে।
