ভিসেরা রিপোর্টে আটকে আছে মায়ার মৃত্যুরহস্য

আপডেট : ০৬ মে ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

ভিসেরা রিপোর্টের জন্য আটকে আছে কুষ্টিয়ার কিশোরী মায়ার মৃত্যুর রহস্য। দুই মাসের মধ্যে এ রিপোর্ট পাওয়ার কথা থাকলেও থানা পুলিশ ও ফরেনসিক কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক ভূমিকায় দীর্ঘ ৯ মাসেও তা পাওয়া যায়নি। এদিকে তদন্ত প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছে নিহতের পরিবার। এ ঘটনায় পুলিশের করা অপমৃত্যুর মামলায় অগ্রগতি না থাকায় জানা যাচ্ছে না তার মৃত্যুর কারণও। পুলিশের দাবি, ভিসেরা রিপোর্ট হাতে না পাওয়ায় ঝুলে আছে মায়াসহ শতাধিক অপমৃত্যুর মামলা। এ সুযোগে অপরাধীরাও চলে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জানা যায়, গত বছরের ৬ আগস্ট সকালে শহরের কোর্টপাড়ায় বারো শরিফ দরবারের বিপরীতে অজ্ঞাত এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিনই কুষ্টিয়া মডেল থানায় অপমৃত্যুর মামলা (নম্বর ৩৬০) নথিভুক্ত হয়। লাশের ময়নাতদন্তের জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ। সংবাদটি ছড়িয়ে পড়লে নিহত কিশোরীর নানি মর্গে এসে লাশ শনাক্ত করে জানান, নিহতের নাম মায়া খাতুন।

আনজু বেগম বলেন, ২০০৮ সালে তার মেয়ে শিরিনা খাতুনের বিয়ে হয় পাবনার কালামের সঙ্গে। ১১ বছর পর স্বামী-কন্যাকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যায় শিরিনা। কালামও দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার বাঁধেন। কেউ মায়ার দায়িত্ব না নেওয়ায় তার আশ্রয় হয় আমার কাছে। তিনি আরও জানান, আমি অন্যের বাড়িতে কাজ করে খাই। এ কারণে নাতনিকে ঠিকমতো দেখাশোনা করতে পারিনি। এ সুযোগে ২০২৩ সালে কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশন এলাকার চা বিক্রেতা সোহেল কর্তৃক মায়া ধর্ষণের শিকার হয়। থানাপাড়া গড়াই সেতুর নিচে বসবাস করত সোহেল। এ ঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা হয়। সোহেল গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যায়। জেল থেকে বেরিয়ে সোহেল বিভিন্ন সময় মামলা তুলে নিতে চাপ দিত, না হয় আরও বড় ক্ষতি করার হুমকি দেয়। মায়ার মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশকে হত্যা মামলা নিতে বললে ওসি জানান, ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট হাতে পেলে এমনিতেই হত্যা মামলা হবে। কিন্তু ভিসেরা রিপোর্টও আসছে না হত্যা মামলাও হচ্ছে না।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মায়ার লাশ উদ্ধারকালে সুরতহাল রিপোর্টে পুলিশ উল্লেখ করেছে, মরদেহের বিভিন্ন স্থানে রক্তাক্ত জখমের চিহ্ন রয়েছে। গত বছরের ৬ আগস্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। চার দিন পর ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক নিহতের মরদেহে জখম দেখে মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং নিহতের সঙ্গে কী ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা শনাক্তে অধিকতর পরীক্ষার জন্য মরদেহের ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রসহ প্রাসঙ্গিক নমুনা হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষাগারে পাঠানোর সুপারিশ করেন।

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবদুল মান্নান বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ময়নাতদন্ত করে ভিসেরা নমুনা সংগ্রহ করে হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টের জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠায়। কিন্তু ৯ মাস আগের ঘটনার ভিসেরা রিপোর্ট এত দিনেও কেন পাওয়া যায়নি তার কারণ খোঁজ নিয়ে বলতে পারবেন। তবে সরেজমিনে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খোঁজ নিয়েও মায়ার হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মো. কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, ‘ক্লুলেস অপমৃত্যু মামলার রহস্য উদঘাটনে হিস্টোপ্যাথলজি বা ভিসেরা রিপোর্টের জন্য নিহতের নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। সাধারণত দুই মাসের মধ্যে এ রিপোর্ট পুলিশের হাতে এসে পৌঁছালে পুলিশ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত ওই সব মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ স্থবির হয়ে থাকে। এভাবে অসংখ্য অপমৃত্যু মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল আটকে আছে। এসব ক্ষেত্রে বিলম্বের কারণটা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবেন।

কুষ্টিয়া জেলা সিভিল সার্জন, হাসপাতাল, পুলিশ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মায়াসহ শতাধিক অপমৃত্যু মামলার ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। এ কারণে ওইসব মামলার পরবর্তী কার্যক্রম হিমঘরে পড়ে আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত