মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীতে জীবনযাপন করে। কেউ একা নিজের জন্য সবকিছু জোগাড় করতে পারে না। তাই মানুষের জীবন পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া চলতে পারে না। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষের জন্য মানুষই আশ্রয় আর সৎকার্য ও সেবাই মানুষের প্রকৃত মূল্য। আল্লাহর কাছে ধন-সম্পদ, ক্ষমতা বা বংশ নয়, বরং মানুষের আন্তরিকতা, মানবপ্রেম এবং সেবাই আসল মর্যাদা অর্জনের মাধ্যম।
কোরআনের সুরা বাকারা ১৭৭ আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘বড় সৎকাজ কেবল পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মুখ করে নামাজ পড়াই নয়, বরং আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন, মুসাফির এবং ক্রীতদাসদের মুক্তির জন্য ব্যয় করা, নামাজ-জাকাত আদায় করা এবং কঠিন সময়ে ধৈর্যধারণ করাই প্রকৃত সৎকর্ম।’ এ আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, সামাজিক দায়িত্ব এবং মানবকল্যাণ ইসলামের অপরিহার্য অংশ।
মানবসেবাকে ইসলাম ফরজ আমলের মর্যাদা দিয়েছে। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত যেমন ফরজ, তেমনি মানবসেবাও ফরজ। এর অর্থ, মানব কল্যাণের কাজ করলে তা কেবল সামাজিক কর্তব্য হিসেবে গণ্য হবে না, বরং আল্লাহর আদেশ পালনের শামিল হবে। যে ব্যক্তি সম্পদশালী, সে সম্পদ দিয়ে মানবসেবা করবে। যে ব্যক্তি জ্ঞানবান, সে জ্ঞান দিয়ে মানুষকে উপকার করবে। যে ব্যক্তি শক্তিমান, সে তার শক্তি দিয়ে মানুষের সেবায় এগিয়ে আসবে। প্রত্যেককে তার সাধ্য অনুযায়ী মানবকল্যাণে অংশ নিতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের কেউ পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তা তার মুসলিম ভাইয়ের জন্যও ভালোবাসে। এ হাদিস মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসা ও সহানুভূতির অনন্য উদাহরণ। আমরা নিজের জন্য সুখ, শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নতি কামনা করি। ইসলামের দাবি হলো, আমরা অন্যের জন্যও একই কামনা করব। অন্যের জন্য সেইটুকু চাইব, যা আমরা নিজের জন্য চাই।
মানবপ্রেম জান্নাতিদের গুণ। কোরআনের সুরা দাহরে বলা হয়েছে, ‘জান্নাতিরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আহার করায়। তারা বিনিময়ে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশা করে না।’ এই দৃষ্টান্তে আল্লাহ মানুষের প্রকৃত মানবপ্রেমিক রূপটি তুলে ধরেছেন। মানবসেবা নিছক মানবিক দায় নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করাই আসল উদ্দেশ্য।
আজকের পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ নিজের উন্নতি, সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, অন্যের জন্যও সেই কামনা রাখতে হবে। নিজের জন্য যেমন ক্ষুধা-তৃষ্ণা চাই না, অন্যের জন্যও তা চাইতে পারব না। নিজের জন্য যেমন নিরাপত্তা চাই, অন্যের জন্যও চাইতে হবে। নিজের কল্যাণ যেমন চাই, অন্যের জন্যও চাইতে হবে। সমাজে সবাইকে নিজের মতো করে ভাবা ও দেখা, এটাই প্রকৃত মানবপ্রেম।
রাসুল (সা.) মানবপ্রেম ও দয়ার গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন, ‘জমিনবাসীদের ওপর দয়া করো, আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়া করবেন।’ অর্থাৎ মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমেই আল্লাহর রহমত পাওয়া যায়। আল্লাহর দয়ার ছায়া লাভ করা ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়।
মানবসেবার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ শুধু আমলের জোরে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশের জন্য আল্লাহর রহমত অপরিহার্য। আর আল্লাহর রহমত লাভের সহজ পথ হলো, মানবকল্যাণে অংশ নেওয়া। নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সেই, যে মানুষের বেশি উপকার করে। তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো, কোনো মুসলমানকে আনন্দ দেওয়া, তার দুঃখ দূর করা, ঋণমুক্ত করা বা ক্ষুধা নিবারণ করা।
মানবপ্রেম শুধু দুনিয়ায় কল্যাণ বয়ে আনে না, বরং বিপদাপদ থেকেও রক্ষা করে। নবীজি বলেছেন, মানবকল্যাণমুখী কাজ বিপদাপদ ও অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে। গোপন দান আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় আয়ু বৃদ্ধি পায়। এসব হাদিসে মানবসেবার বহুমাত্রিক কল্যাণের চিত্র পাওয়া যায়।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
