নিজের অজান্তেই দুই কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক

আপডেট : ০৮ মে ২০২৬, ০৮:২৪ এএম

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ, যা শিশুদের মধ্যে মারাত্মক রক্তাল্পতা সৃষ্টি করে। রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতি মাসে দিতে হয় ১-২ ব্যাগ রক্ত, যা কষ্টকর ও ব্যয়বহুল। অথচ সামান্য সচেতনতায় রোগটি প্রতিরোধযোগ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজের অজান্তেই দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রতিরোধযোগ্য এই রোগের জিন বহন করছেন। আর রোগী আছে প্রায় ৬০-৮০ হাজার। এমন বাস্তবতায় আজ ৮ মে পালিত হচ্ছে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আর অদৃশ্য নয় : যাদের রোগ ধরা পড়েনি তাদের খুঁজে বের করি, অবহেলিতদের পাশে দাঁড়াই।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিন বহন করা বা বাহক মানেই রোগী নন। রোগটি কেবল তখনই হয়, যখন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করেন। এই জিন বহনকারী স্বামী-স্ত্রীর সন্তানদের ২৫ শতাংশের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্বামী বা স্ত্রীর কেউ একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে, তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হয় না। সেজন্য এটি প্রতিরোধে বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়ার জিন আছে কিনা, তা জেনে বিয়ে করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, পরীক্ষায় যদি দেখা যায় কারও শরীরে থ্যালাসেমিয়ার জিন আছে, তাহলে তিনি যেন আরেকজন থ্যালাসেমিয়ার জিন বহনকারী ব্যক্তিকে বিয়ে না করেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘জাতীয় থ্যালাসেমিয়া জরিপ-২০২৪’ অনুযায়ী, দেশের ১১.৪ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া ও হিমোগ্লোবিন-ই রোগের বাহক। অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি মানুষ নিজের অজান্তেই ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করছেন। এর আগে ২০২২ সালে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দিনাজপুরে পরিচালিত এক পাইলট স্টাডিতেও ১২.৪ শতাংশ মানুষের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া ও হিমোগ্লোবিন ই-বিটা রোগের বাহক শনাক্ত হয়। আরও কয়েকটি জরিপেও বাহকের হার ১০ শতাংশের বেশি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রতি বছর প্রায় ৬-৮ হাজার থ্যালাসেমিয়া-আক্রান্ত শিশু জন্ম নেয়। বর্তমানে দেশে আনুমানিক ৬০-৮০ হাজার থ্যালাসেমিয়ার রোগী রয়েছে।

বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন-বাহক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’ দিবসটি উপলক্ষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বাহকে বাহকে বিয়ে নিরুৎসাহিত করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতির সভাপতি ডা. এম এ মুহিত বলেন, ‘সাধারণ মানুষের রক্তকণিকা ১২০ দিন বাঁচলেও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের রক্তকণিকা মাত্র ৩০ দিন স্থায়ী হয়। বাবা-মা উভয়েই বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ এবং বাহক হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ।’

থ্যালাসেমিয়া জিনগত পরিবর্তনের কারণে হয়, ফলে হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে ত্রুটি দেখা দেয়। এই রোগটি সাধারণত শৈশবে ১ থেকে ৩ বছর বয়সের মধ্যে, তীব্র রক্তাল্পতা হিসেবে প্রকাশ পায়। এর সাধারণ লক্ষণফ্যাকাশে ভাব, জন্ডিস, ঘন ঘন সংক্রমণ, ক্ষুধামন্দা, খিটখিটে মেজাজ, শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া এবং পেট ফুলে যাওয়া।

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসায় রক্তাল্পতা পূরণের জন্য ২-৪ সপ্তাহের ব্যবধানে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চাহিদা মেটাতে রক্তের একটি নিরাপদ ও টেকসই সরবরাহ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. সাজিয়া ইসলাম বলেন, ‘যদি যথাযথ চিকিৎসা না পায় তাহলে রোগীর হিমোগ্লোবিন লেভেল কমে যাবে। অ্যানামিয়া ডেভেলপ হবে। হিমোগ্লোবিন যদি ৩-৪ এ নেমে যায়, অনেক সময় তার অর্গানগুলো ফেইল হতে পারে। হার্ট ফেইলিউর হলে দেখা যাবে তাকে বাঁচাতে সমস্যা সৃষ্টি হবে।’

তিনি বলেন, ‘থ্যালাসেমিয়ার রোগীদের অভিভাবকদের সচেতন করা জরুরি। যেন পরীক্ষা করে তারপর তারা সন্তান নেন।’ এক্ষেত্রে প্রিনেটাল টেস্টের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘টেস্টের মাধ্যমে জানা যায়, সন্তানের থ্যালাসমিয়া হবে নাকি স্বাভাবিক হবে। এর বাইরে আমাদের উচিত ইলেক্ট্রোসিসের মাধ্যমে বাহক কিনা সেটা জানা।’ একজন বাহকের অন্য বাহককে বিয়ে না করার মাধ্যমে রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব জানিয়ে এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘রোগটি প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। সেজন্য আমরা কাজীদের জানাতে পারি, মসজিদে বিষয়টি নিয়ে প্রচার করা যেতে পারে। যত বেশি প্রচার হবে, যত মানুষ জানবে, তত সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।’

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট থ্যালাসেমিয়ার একমাত্র স্থায়ী চিকিৎসা হলেও উচ্চব্যয় ও উপযুক্ত দাতার সংকটে এটি এখনো সবার নাগালের বাইরে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের বাঁচিয়ে রাখতে একবার রক্ত সঞ্চালন ও আনুষঙ্গিক চিকিৎসায় সাধারণত ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেছেন, ‘থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের মধ্যে ৯০ শতাংশই এর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে সক্ষম নন। আমরা যদি আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করতে পারি তাহলে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই কমাতে পারি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত