জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি নির্বাচিত এমপি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেশের সর্বকনিষ্ঠ এমপি হিসেবে সংসদে যাচ্ছেন। মাত্র ৭ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় ২৫ বছর বয়সেই এই অবস্থানে পৌঁছেছেন তিনি।
২০০১ সালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের বাগোয়ান গ্রামে জন্ম নুসরাতের। বাবা-মা দুজনই শিক্ষক। স্থানীয় বাগোয়ান কে সি ভি এন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ড. ফজলুল হক গার্লস ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবনে বিতর্ক, আবৃত্তি, নাটক ও হস্তশিল্পে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তার।
২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন নুসরাত এবং শামসুন্নাহার হলে থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সাত কলেজ অধিভুক্তি আন্দোলন, আবরার ফাহাদ হত্যা ও ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনে যুক্ত হন। সে সময় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকারও হন।
একই বছর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা শুরু হয়। আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করে তিনি আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে ছাত্র অধিকার পরিষদের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে সাংস্কৃতিক সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক এবং সহকারী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৩ সালে সংগঠনের কার্যক্রমে অসন্তোষ থেকে সহকর্মীদের নিয়ে পদত্যাগ করেন এবং নতুন ছাত্র সংগঠনে যুক্ত হন। এরপর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে তিনি আলোচনায় আসেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র হলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সমন্বয়কদের একজন হয়ে ওঠেন। ২৮ জুলাই ডিবি পুলিশের পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় তাকে। আটক ছয় সমন্বয়কের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র নারী। আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হলেও মুক্তি পাওয়ার পর পুনরায় আন্দোলনে যোগ দেন।
অভ্যুত্থানের সময় নারী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলা হলে তিনি হল থেকে নারী শিক্ষার্থীদের বের করে এনে আন্দোলনে যুক্ত করেন, যা ছিল নজিরবিহীন।
ডিবি হেফাজতে মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি ও অন্য সমন্বয়করা। আন্দোলন প্রত্যাহারের চাপের মুখে তারা ডিবি কার্যালয়েই অনশন শুরু করেন। ৩২ ঘণ্টা পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
১ আগস্ট মুক্তি পেয়ে আবার আন্দোলনে যুক্ত হন নুসরাত। পরবর্তীতে সরকার পতনের ঘটনায় আন্দোলনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠনের পর তিনি এতে যোগ দেন এবং যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পান। একইসঙ্গে দলটির নারী শাখা ‘জাতীয় নারী শক্তি’র প্রধান সংগঠক হন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাকে মানবাধিকার রক্ষাকর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই আন্দোলনকে ‘জেন-জি বিপ্লব’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে নুসরাত ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
স্বল্প সময়ে ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি এখন জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন নতুন প্রজন্মের।
