খালের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন একটি পাকা সেতু। কিন্তু নেই সংযোগ সড়ক। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতু এখন এলাকাবাসীর কাছে যেন এক নির্মম উপহাস! চার বছর ধরে ব্যবহারহীন পড়ে থাকা এই সেতুর কারণে চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে পটুয়াখালীর মহিপুরের লতাচাপলি ইউনিয়নের হাজারো মানুষের।
জানা গেছে, পর্যটন নগরী কুয়াকাটার কাছেই লতাচাপলি ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সীমান্তবর্তী খালের ওপর প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে আরসিসি সøাবের এ সেতুটি। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ৩৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭ দশমিক ৩২ মিটার প্রস্থের সেতুটি দেখতে যেন আধুনিক উন্নয়নের প্রতীক। অথচ বাস্তবে এটি এখন এলাকাবাসীর দুর্ভোগের আরেক নাম। কারণ সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়কের কাজই শেষ হয়নি। পূর্ব পাশে প্রায় ২০০ মিটার এবং পশ্চিম পাশে ৫০ মিটার রাস্তার কাজ বন্ধ হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সেতুর নিচ দিয়ে খালের পানি বইছে, আর পাশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে কিছু মানুষ পারাপার হচ্ছে। বর্ষা এলেই দুর্ভোগ ভয়াবহ রূপ নেয়। কাদা আর পানিতে তলিয়ে যায় দুই পাশের পথঘাট। তখন স্কুলগামী শিশুদের অনেকেরই বন্ধ হয়ে যায় লেখাপড়া। অসুস্থ রোগী নিয়ে বিপাকে পড়েন স্বজনরা।
এলাকার ফাঁসিপাড়া গ্রামের আয়েশা বেগম (৫৫) বলেন, ‘মাঝেমধ্যে বাঁশের সাঁকো দিয়ে সেতুতে উঠি। কিন্তু বর্ষায় এ পথ মরণফাঁদ হয়ে যায়। তখন নাতনির স্কুল বন্ধ রাখতে হয়।’
খাজুরা আশ্রয়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জাকারিয়া বলে, ‘বাঁশের সাঁকো দিয়ে যেতে খুব ভয় লাগে। পানি বেশি হলে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।’ সেতুর পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি আশ্রয়ণ কেন্দ্র। সেখানে ৬০টি পরিবার বসবাস করছে। এ ছাড়া খাজুরা, বাহামকান্দা, ফাঁসিপাড়া, কলইপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ প্রতিদিন এই পথ ব্যবহার করে ইউনিয়ন পরিষদ, মহাসড়ক, কুয়াকাটা বাসস্ট্যান্ড ও উপজেলা শহরে যাতায়াত করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা স্বপন হাওলাদার বলেন, ‘সংযোগ সড়কের জন্য ঘরের সামনে মাটি কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। বৃষ্টিতে পানি জমে থাকে। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। চার বছরেও কাজ শেষ হলো না!’ আশ্রয়ণ সমবায় সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘তিন বছর আগে এখানে পানিতে ডুবে দুই স্কুলশিশুর মৃত্যু হয়েছিল। তারপরও কর্তৃপক্ষের কোনো তাড়াহুড়া নেই। এলাকাবাসী বছরের পর বছর কষ্ট করছে।’
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালীর গিয়াস উদ্দিন নামের এক ঠিকাদার কাজটির কার্যাদেশ পান। পরে কাজটি অন্যের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগ ওঠে। প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ৯ মে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী মনির হোসেন বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় এলাকাবাসী ভোগান্তিতে পড়েছেন। তবে এখন সংযোগ সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। আশা করছি, মে মাসের মধ্যেই পুরো কাজ শেষ হয়ে যাবে।’
