যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থমকে যাওয়া আলোচনা ফের শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সম্প্রতি দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান বদলে কূটনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ায় এই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চলমান সংঘাত নিরসনে আগামী সপ্তাহেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আবার বৈঠকে বসতে পারে দুই দেশের প্রতিনিধিরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষ বর্তমানে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে কাজ করছে। ১৪ দফার এ খসড়া সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য হলো একটি আলোচনা প্রক্রিয়ার কাঠামো তৈরি করা, যার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হবে যুদ্ধের অবসান ঘটানো। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আশা প্রকাশ করে বলেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে দ্রুতই আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে। রোমে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা দেখব ইরানের জবাবে কী থাকছে। আশা করছি তারা এমন কিছু বলবে যা আমাদের গুরুগম্ভীর এক আলোচনা প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাবে।’
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সূত্রমতে প্রস্তাবিত এ খসড়ায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা হ্রাস ও ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ অন্য কোনো দেশে স্থানান্তরের সম্ভাব্য বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে বেশ কিছু বড় বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তেহরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়টি আলোচনার অগ্রগতিকে জটিল বা বিলম্বিত করতে পারে। অবশ্য আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোলে দুই পক্ষের সম্মতিতে প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত এক মাসের একটি সংলাপের মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, তারা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে সাড়া দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্রের রণতরীগুলোর মধ্যে ‘বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ’ হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। গতকাল শনিবার ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা ওমান উপসাগরে একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে একটি তেলের ট্যাংকার আটক করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বন্দরে ঢোকার চেষ্টা করার সময় তারা দুটি ট্যাংকার বিকল করে দিয়েছে।
ফারস নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের নৌবাহিনীর এক মুখপাত্র জানান, তারা ‘ওশান কোই’ নামক জাহাজটি আটক করেছেন। তার দাবি, জাহাজটি ইরানের তেল রপ্তানি এবং জাতীয় স্বার্থ বিঘিœত করার চেষ্টা করছিল। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি ইরানি বাহিনীর জাহাজে ওঠা এবং সেটি আটক করার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। জাহাজ ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি বার্বাডোসে নিবন্ধিত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আলাদাভাবে জানিয়েছে যে, ওমান উপসাগরে ইরানের বন্দরে প্রবেশের চেষ্টাকালে তাদের সামরিক বাহিনী ইরানের পতাকাবাহী দুটি ট্যাংকার বিকল করে দিয়েছে। সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলি কুপার এক বিবৃতিতে জানান, ইরানে আসা-যাওয়া করা জাহাজের ওপর যে অবরোধ রয়েছে, তা কঠোরভাবে পালন করতে অঞ্চলটিতে থাকা সেনারা প্রস্তুত রয়েছে।
ইরানের সামরিক কমান্ড অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রই একটি তেলের ট্যাংকার ও আরেকটি জাহাজে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে। তারা জানায়, এই হামলায় ১০ জন নাবিক আহত হয়েছেন এবং ৫ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ইরানের সামরিক কমান্ড আরও অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপের বেসামরিক এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান ওই প্রণালির পূর্বে এবং চাবাহার বন্দরের দক্ষিণে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান ওই এলাকায় নৌবাহিনীর তিনটি যুদ্ধজাহাজে (ডেস্ট্রয়ার) হামলা চালিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই শুক্রবার জানান, তারা মার্কিন প্রস্তাব নিয়ে এখনো চিন্তাভাবনা করছেন। তবে হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পরিস্থিতির ওপর ইরানের সেনারা কড়া নজর রাখছে এবং যেকোনো হামলা বা উসকানিমূলক আচরণের জবাব দিতে তারা তৈরি। আলজাজিরার সাংবাদিক রসুল সরদার তেহরান থেকে জানান- আইআরজিসি আগেও জাহাজ আটক করেছে, কিন্তু এবারের পদক্ষেপটি ইরানের কৌশলে এক নতুন মোড়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরান ‘পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্র্তৃপক্ষ’ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করছে এবং নতুন কিছু কঠোর নিয়ম চালু করছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে যেকোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে হলে ইরানি বাহিনীর কাছ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হবে। হরমুজ পার হতে জাহাজগুলোকে এখন থেকে ইরানকে ইমেইল করতে হবে। ইমেইলে জানাতে হবে জাহাজটি কোন দেশের, তাতে কী মালামাল আছে এবং সেটি কোথায় যাচ্ছে ইরান এসব তথ্য দেখে তাদের টোল নির্ধারণ করবে।
বাঘাই জানান, এটি সম্পূর্ণ নতুন এক সামুদ্রিক নিয়ম। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের অধিকার বা ক্ষমতা হাতছাড়া করছে না। তিনি আরও বলেন, ইরানের এই বড় সিদ্ধান্তটি একটি বিশেষ বার্তা দিচ্ছে। তা হলো ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করছে। তাদের সায় না থাকলে এখন থেকে কোনো জাহাজই আর সেখানে যাতায়াত করতে পারবে না। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলফিরেজ শেয়ার্স মনে করেন, ওমান উপসাগরে জাহাজ আটক করে আইআরজিসি আসলে বিশ্বকে তাদের ক্ষমতার জানান দিচ্ছে। তারা প্রমাণ করতে চাচ্ছে যে এই জলপথে এখন তাদেরই হুকুম চলে, যা তারা আগে কখনো এভাবে করতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, আইআরজিসি এই রুটটিকে অনিরাপদ ও বিপজ্জনক করে তুলছে- যেন সবাই বুঝতে পারে এই অঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতাপ কতটা। শেয়ার্সের মতে, এই সবকিছুর মূলে রয়েছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নড়বড়ে আলোচনা। ওয়াশিংটন যদি চুক্তির শর্তগুলো মানতে রাজি না হয়, তবে আইআরজিসি ঠিক এভাবেই নিজেদের শক্তি দেখিয়ে আলোচনার টেবিলে ইরানকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে আসার চেষ্টা করবে।
ইরানের ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো অটুট : সিআইএ
যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় ইরান এখনো প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের ধকল আরও তিন থেকে চার মাস সামলাতে পারবে। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের কাছে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) একটি গোপন বিশ্লেষণে এ কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন বর্তমান ও একজন সাবেক কর্মকর্তা গোয়েন্দা বিশ্লেষণের মূল বিষয়গুলো দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। এই মূল্যায়ন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার আশাবাদ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ইরান বিষয়ক গোপন মূল্যায়নগুলো প্রায়ই প্রশাসনের প্রকাশ্য বিবৃতির থেকে ভিন্ন হয়। এ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক সপ্তাহের তীব্র হামলার পরও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অক্ষুণœ রয়েছে। একজন কর্মকর্তা বলেছেন- বিভিন্ন প্রমাণ বলছে, ইরান ভূগর্ভস্থ প্রায় সব সংরক্ষণাগার পুনরুদ্ধার ও আবার চালু করতে পেরেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র মেরামত করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর সময় প্রায় প্রস্তুত থাকা কিছু নতুন ক্ষেপণাস্ত্রও তারা এখন নিজেদের অস্ত্রভা-ারে যুক্ত করেছে।
