অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী
ভিজিটিং প্রফেসর, ডেন্টাল সার্জারি বিভাগ
বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা।
মাড়ির ভেতরে খাদ্যকণা জমে থেকে যে আবরণ তৈরি করে, তার নাম ডেন্টাল প্লাক। ডেন্টাল প্লাক ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে পাথরের মতো অবস্থায় যখন থাকে, তখন দেখা দেয় নানা সমস্যা। ডেন্টাল প্লাকের ভেতরে বাস করে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া যদি কোনোভাবে রক্তের সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে সৃষ্টি হয় নানা জটিলতার। উপরন্তু একটি স্থায়ী দাঁত পড়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ হলো ডেন্টাল প্লাক।
প্লাক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে রক্তনালির প্রদাহের সৃষ্টি হয়। ফলে হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। সঠিক সময়ে চিকিৎসার মাধ্যমে এই প্রদাহ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া বা ডেন্টাল প্লাক দূর করা যায়। যেসব রোগী আগে মাড়ির রোগে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা ৬৪ শতাংশের বেশি।
গবেষকরা বলেছেন, যেসব রোগী তাদের দাঁত সঠিকভাবে স্কেলিং করান, তারা পরবর্তী সাত বছর হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের মতো রোগ থেকে ঝুঁকিমুক্ত থাকেন। মাড়ি অসুস্থ মানেই দাঁত থেকে রক্ত পড়া, মুখে দুর্গন্ধসহ দাঁতের নানাবিধ রোগের শুরু। সুন্দর ও সুস্থ দাঁতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মাড়ির যতœ নেওয়া। কারণ মাড়ির রোগের কারণে মুখগহ্বরে যে প্রদাহ ও ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়, রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। ফলে দাঁতের সমস্যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যাদের একই সঙ্গে মাড়ির রোগ ও দাঁতের ক্ষয় রয়েছে। ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে তার মধ্যে যেমন : অ্যাথেরোসেক্লরোসিস। রক্তে থাকা ব্যাকটেরিয়া ধমনীর দেয়ালে বিদ্যমান কোলেস্টেরলের সঙ্গে যুক্ত হয়, ফলে ধমনি সরু ও শক্ত হয়ে যায়। এতে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ‘প্রদাহ বৃদ্ধি’ ঝুঁকি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। মুখের ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রদাহজনিত প্রোটিন (সি-রিয়াকটিভপ্রোটিন) বাড়ায়, যা রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত করে ও রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, ফলে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ছাড়াও ‘এন্ডোকার্ডাইটিস’ যদিও কম তবুও এই ব্যাকটেরিয়া হৃদপি-ের আস্তরণে সংক্রমণ ঘটায় যা হৃদযন্ত্রের ভাল্ভ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যখন দাঁতের চারপাশের টিস্যুগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তখনই একজন রোগী পেরিওডেন্টাল রোগে আক্রান্ত হন। দুর্ভাগ্যবশত মাড়ির ক্ষয়ই হচ্ছে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দাঁত পড়ে যাওয়ার প্রথম কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব লোকেরাই মাড়ির রোগে আক্রান্ত হন। সাধারণত ৭৫% ভাগ মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া, দাঁত থেকে মাড়ি আগলা হয়ে যাওয়া বা দাঁত নড়ে যাওয়া রোগে আক্রান্ত। মাড়ির এ ধরনের রোগ মুখের ভেতরের হাড়ের কাঠামোকে ধ্বংস করে। কখনো কখনো হাড় প্রতিস্থাপনও করতে হয়। মাড়ির বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে নড়ে যাওয়া দাঁতকে সঠিকভাবে রাখা যায়। আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসকও আছে। মাড়ির চিকিৎসার সঙ্গে ক্ষয় হয়ে যাওয়া হাড়কেও আবার প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।
মাড়ির রোগের চিকিৎসা
সার্জিক্যাল পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘পকেট রিডাকশন সার্জারি’ যা ফ্ল্যাপ সার্জারি নামেও পরিচিত। এই পদ্ধতির মাধ্যমে দাঁতের মাড়ি এবং দাঁতের মাঝখানের দূরত্ব কমে যায়। ফলে ওই অংশে ব্যাকটেরিয়ার বসতি কমে যায়। যেসব রোগীর দাঁতের মাড়ি একদমই পাতলা অথবা সম্পূর্ণভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত, তাদের ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতিটি সবচেয়ে উপকারী। মাড়ির প্রদাহ বা ইনফেকশন দেহে রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়ে শরীরের প্রধান প্রধান অঙ্গ যেমন : হৃৎপি-, মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনি, হাড় এমনকি গর্ভবর্তী নারী, শিশুকেও আক্রান্ত করতে পারে। অতএব, মাড়ির রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ডেন্টাল প্লাক অথবা দাঁতের ও মাড়ির ফাঁকে লেগে থাকা খাদ্যকণা দূর করা বা পরিষ্কার রাখা। সবচেয়ে বড় কথা, ডেন্টাল প্লাকমুক্ত থাকা মানে জীবন রক্ষা করা। প্রতি বছরে অন্তত একবার, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের দুবার মাড়ি ও দাঁতের চিকিৎসা নিতে হবে। এতে করে হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি যেমন কমবে, তেমনি ভালো থাকবে মুখের স্বাস্থ্য, নিশ্চিত হবে দেহের স্বাস্থ্য।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে
ডেন্টাল এক্স-রে ওপিজি এবং বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে প্রদাহের মাত্রা অন্যান্য রোগের উপস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে।
ডেন্টাল স্কেলিংয়ের মাধ্যমে দাঁতের গোড়া থেকে পাথর দূর করে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
অন্যান্য পর্যায়ে যদি ডায়াবেটিস থাকে বা অন্যান্য রোগের উপস্থিতি থাকে, তবে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাড়ির স্কেলিং এবং সেই সঙ্গে ডেন্টাল প্লাক প্রতিরোধে দুবেলা সকাল এবং রাতে দাঁত ব্রাশ করা আবশ্যক এবং দু-দাঁতের ফাঁক থেকে খাবার কণা বের করার জন্য ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার এবং অ্যান্টিসেপটিক মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা এবং জীবচুলার (টাং ক্লিনার) মাধ্যমে প্রতিদিন জিহ্বা পরিষ্কার করা। এ ছাড়াও দাঁতের মাড়ি ম্যাসাজ ও মুখের চোয়ালের ব্যায়াম, চিনি জাতীয় খাবার কম খাওয়া এবং পান, সিগারেট ও জর্দা, সাদাপাতা, গুল, খৈনি ইত্যাদি তামাকজাত দ্রব্য বর্জন করা অপরিহার্য।
