দেশের দুর্গম অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা, বড় ধরনের দাঙ্গা দমন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ ও জরুরি উদ্ধারকাজে পুলিশের হেলিকপ্টারের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সুন্দরবন বা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো এলাকায় অপরাধী শনাক্তকরণে আকাশপথের নজরদারি সবচেয়ে বেশি জরুরি। কারণ এসব স্থানে পুলিশ সহজেই যেতে পারছে না। বর্তমানে এসব কাজে পুলিশকে সেনাবাহিনী বা অন্যান্য সংস্থার আকাশযানের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সেবার মান আরও উন্নত করতে একাধিক পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর অংশ হিসেবে অপরাধীদের রুখতে স্থলপথের পাশাপাশি আকাশপথকে নিশানার আওতায় আনা হচ্ছে।
জানা যায়, কোনো বড় ধরনের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে যেতে পুলিশের জন্য হেলিকপ্টার কেনার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এমনকি পুলিশ অ্যাভিয়েশন ইউনিটসহ নতুন তিনটি ইউনিট গঠনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। পুলিশ সপ্তাহে বিষয়টি আলোচনাও হয়েছে। হেলিকপ্টার কেনার জন্য প্রায় ৪২৯ কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়েছে। তবে বাজেটের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। রাশিয়া থেকে দুটি হেলিকপ্টার কেনা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায় সেগুলো দেশে আনা সম্ভব হচ্ছে না। আরও চারটি হেলিকপ্টার কেনার কথাও ভাবছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অ্যাভিয়েশন ইউনিট গঠনের পাশাপাশি অন্তত ডজন দুয়েক পাইলট তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ইতিমধ্যে চারজন পুলিশ অফিসারকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে পাইলট হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। অ্যাভিয়েশন সেক্টরে কাজ করতে আরও ৪০ জন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রবাসীদের স্বার্থ ও মানব পাচার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোতে লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগ দেওয়ার কথাও ভাবছে পুলিশ সদর দপ্তর। এসব বিষয় নিয়ে চলমান পুলিশ সপ্তাহে উপস্থাপনের পাশাপাশি সরকারের হাইকমান্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা।
আকাশযানের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে চায় পুলিশ : পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, পুলিশের আধুনিকায়ন ও অপরাধ দমনের কৌশলে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। প্রচলিত স্থলপথের নজরদারির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এবার আকাশপথে নিজেদের সক্ষমতা জানান দিতে চায় পুলিশ। পুলিশের আকাশ জয়ের জন্য ছয়টি হলিকপ্টার ক্রয়, নতুন তিনটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন ও কূটনৈতিক পর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতি বৃদ্ধির মতো মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে পুলিশের অপারেশনাল গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা আশা করছেন। বর্তমানে পুলিশ মূলত সেনাবাহিনী বা অন্যান্য সংস্থার আকাশযানের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। দুর্গম অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা, বড় ধরনের দাঙ্গা দমন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ ও জরুরি উদ্ধারকাজে হেলিকপ্টারের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সুন্দরবন বা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো এলাকায় অপরাধী শনাক্তকরণে আকাশপথের নজরদারি সবচেয়ে বেশি জরুরি। এসব স্থানে পুলিশ সহজেই যেতে পারছে না।
পুলিশ অ্যাভিয়েশন গঠন : এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু যন্ত্র কিনলেই হবে না, তা পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন। পুলিশ বাহিনী ইতিমধ্যেই নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পাইলট প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ ‘পাইলট তৈরির নিশানা’ মূলত পুলিশকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার অংশ। তিনি আরও বলেন, বছর চারেক আগে রাশিয়া থেকে এমআই-১৭১ মডেলের দুটি হেলিকপ্টার ক্রয় করা হয়। এ জন্য বাজেট ধরা হয়েছিল প্রায় ৪২৯ কোটি টাকা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কারণে হেলিকপ্টারগুলো দেশে আনা সম্ভব হয়নি। কূটনৈতিকভাবে চিঠি চালাচালি হওয়ার পর বাধা অনেকটা দূর হয়েছে। আশা করি, চলতি বছরের মধ্যে এগুলো চলে আসবে। তা ছাড়া আরও চারটি হেলিকপ্টার ক্রয়ের পরিকল্পনা আছে। সব মিলিয়ে ‘অ্যাভিয়েশন পুলিশ’ ইউনিট গঠনের পথ অনেকদূর এগিয়ে যাচ্ছে। এতে দেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস দমন, দুর্গম-প্রত্যন্ত অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনা ও নজরদারিতে পুলিশ আরও তাৎক্ষণিক ভূমিকা রাখতে পারবে। ক্রয় করা হেলিকপ্টারগুলো ৮০০ কিলোমিটার ওপরে উড়ে ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে এবং ৫ হাজার কেজি ওজন পরিবহনে সক্ষম। ইউক্রেন যুদ্ধেও এসব হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে রাশিয়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এসব হেলিকপ্টার দরকার।
নতুন তিনটি ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা : পুলিশ সূত্র জানায়, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ দমনে গঠন করা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। তবে চলতি বছর তা হচ্ছে না। পুলিশের এ দুটি ইউনিটের স্থানে নতুন একটিসহ আরও দুটি ইউনিট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। সেগুলো হচ্ছে অ্যাভিয়েশন পুলিশ ইউনিট, সাইভার ক্রাইম ইউনিট ও স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট। তিনটি ইউনিট গঠনের পর এসবের দায়িত্ব সামলাবেন অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিটিটিসি ও এটিইউ গঠন করা হয়েছিল। ওই সময় জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ দমনের নামে বিভিন্ন বিতর্কিত কার্যক্রম চালানো হয়। ফলে এগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার দাবি ওঠে। এবারের পুলিশ সপ্তাহেও এসব বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তা ছাড়া সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকে পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা বেশকটি দাবি উত্থাপন করেছে।
পুলিশের যেসব গুরুত্বপূর্ণ দাবি : পুলিশ বলছে, দেশের সব স্থানেই সাইবার সুরক্ষায় জোরদারের পাশপাশি অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিট প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালসহ বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের বিদ্যমান পুলিশ হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করতে একটি পুলিশ মেডিকেল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি ও পুলিশ সদস্যদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে হবে। পুলিশের সক্ষমতা আরও বাড়াতে সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ২টি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার ও চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে একটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে।
পুলিশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হচ্ছে, প্রবাসী শ্রমিকরা রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের ওপর সংঘটিত মানব পাচার, নির্যাতন ও বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা বিশেষ প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ব্যবস্থাপনা আরও উন্নতি করাসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সে জন্য দূতাবাসে পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগসহ দুদক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএসহ আরও কিছু স্থানে পুলিশ অফিসারদের পদায়ন করতে বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের কোনো স্থানে বড় ধরনের ঘটনা ঘটলে সহজেই যেন পুলিশ যেতে পারে সেজন্য আমরা অ্যাভিয়েশনের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছি। সিটিটিসি ও এটিইউর কার্যক্রম বাতিল করতে আলোচনা হচ্ছে। তবে সরকারের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না।
র্যাবের হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণ সন্তোষজনক নয় : গতকাল পুলিশের একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশের জন্য এ মুহূর্তে আলাদা অ্যাভিয়েশন ইউনিট গঠনকে বাস্তবসম্মত মনে করা হচ্ছে। নতুন এ ইউনিট গঠনের আগে বিদ্যমান সক্ষমতা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। বর্তমানে র্যাবের একটি হেলিকপ্টার থাকলেও সেটির রক্ষণাবেক্ষণ সন্তোষজনক নয়। রাজশাহী সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই হেলিকপ্টারে উঠতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি। বিজিবির দুটি হেলিকপ্টারের মধ্যে একটি প্রায়ই রক্ষণাবেক্ষণে থাকে, আর অন্যটি অচল অবস্থায় রয়েছে।
পাইলট হলেন চার পুলিশ অফিসার : প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশের চার কর্মকর্তা পাইলট হয়েছেন। ২০২১ সালের জুলাইয়ে তাদের প্রশিক্ষণের জন্য আর্মি অ্যাভিয়েশন স্কুলে পাঠানো হয়। তারা হলেন মুশফিকুর হক (৩৫তম বিসিএস), সারোয়ার হোসেন (৩৫তম বিসিএস), ফাতেমা তুজ জোহরা (৩৬তম বিসিএস) ও আবুল হোসেন (৩৭তম বিসিএস)। ২০২২ সালের ১৬ মার্চ তাদের একক বিমান প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়। বেশ কয়েকজন এসআই ও কনস্টেবল র্যাবের এয়ার উইংয়ের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। একজন সহকারী মহাপরিদর্শক পুলিশ অ্যাভিয়েশন উইংয়ের দায়িত্বে থাকবেন।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট) মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘রাশিয়া থেকে কেনা হেলিকপ্টার দুটি দেশে আনতে সরকার কাজ করছে। দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে চিঠি চালাচালি চলছে। শিগগিরই পুলিশ অ্যাভিয়েশনে হেলিকপ্টার দুটি যুক্ত হবে বলে আশা করছি।
হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি : পুলিশ সূত্র জানায়, বিশেষায়িত একটি অ্যাভিয়েশন পুলিশ ইউনিটের প্রয়োজন। এজন্য পুলিশের জন্য হেলিকপ্টার কেনার প্রস্তাব দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার দুর্গম এলাকায় সন্ত্রাস দমনে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে রাশিয়া থেকে দুটি হেলিকপ্টার কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। জি টু জি পদ্ধতিতে ৪২৮ কোটি ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৬ টাকায় রাশিয়া থেকে হেলিকপ্টার দুটি কিনতে ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দপ্তরে জেএসসি রাশিয়ান হেলিকপ্টার্সের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদন হয়। চুক্তি অনুযায়ী দুই কিস্তিতে মোট ২৯৯ কোটি ৬৮ লাখ ৭৪ হাজার ৫২১ টাকা পরিশোধ করা হয়।
