দুই নীতিমালায় পুলিশে চাপা অসন্তোষ

আপডেট : ১৪ মে ২০২৬, ০৮:১৩ এএম

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা পুলিশের উপপরিদর্শক, সহকারী উপপরিদর্শক ও কনস্টেবলদের পদায়ন ও বদলিসংক্রান্ত নীতিমালা নিয়ে সারা দেশের বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের মধ্যে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ নীতিমালার কারণে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের।  আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ নীতিমালা অনুসরণে ব্যত্যয়ও ঘটছে, যা অনিয়মের প্রশ্রয় দিচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা নারী ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবলদের পদায়ন নীতিমালা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ওই নীতিমালায় কেবল নির্দিষ্ট ব্যাচের কর্মরতদের নিজ জেলা বা পছন্দসই জেলায় পোস্টিং পাওয়ার বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব ‘বৈষম্যমূলক নীতিমালা’ বহাল থাকায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।

গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ পুলিশে এসআই (নিরস্ত্র), এএসআই (নিরস্ত্র) ও কনস্টেবল পদের পদায়ন নীতিমালা-২০২৫’ শীর্ষক প্রজ্ঞাপনটি জারি করেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-৩) মো. জামিরুল ইসলাম। নীতিমালার ৬ নম্বর কলামে বলা হয়েছে ‘পুলিশ সদস্যদের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ব্যতীত নিজ জেলার মেট্রোপলিটন পুলিশে পদায়ন করা যাবে না।’

এই নীতিমালাটিকে আঞ্চলিকতা দুষ্ট ও চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন পুলিশে কর্মরত ঢাকার বাসিন্দা কনস্টেবল, এসআই ও এএসআইদের নিজ জেলার মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিটে পদায়ন করা গেলে অন্য জেলার কর্মরতদের পদায়ন করা যাবে না কেন। তা ছাড়া সাধারণত কোনো নীতিমালা প্রণয়ন হলে তা সবার জন্য প্রযোজ্য হয়। পুলিশ বিভাগেরও এ রকম নীতিমালা কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত প্রযোজ্য হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা নতুন নীতিমালার আওতায় পরিদর্শক থেকে উচ্চপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের আনা হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে কনস্টেবল থেকে এসআই পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পরিবার-পরিজন নিজ জেলায় অবস্থান এমন অনেক পুলিশ সদস্য এ নীতিমালার কারণে তাদের পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ সদস্য জানিয়েছেন, এ বৈষম্যমূলক নীতিমালার কারণে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে চেইন অব কমান্ডে বিঘ্ন সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। বৈষম্যের শিকার পুলিশ সদস্যরা মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ঢাকা বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পলিসি মেকাররা কি বুঝে ওই প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন তা আমার জানা নেই। আমরা চাই, নীতিমালা যদি হয় সবার জন্য হোক।’

জারি করা নীতিমালা সর্বক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য অনুসরণীয় হলেও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ হচ্ছে না। ওই নীতিমালার আলোকে চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা কনস্টেবল থেকে এসআই সিএমপিতে কর্মরত থাকার কথা না। কিন্তু চট্টগ্রামের বাসিন্দা হয়েও সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী, উপকমিশনার শেখ সাদী, সহকারী পুলিশ কমিশনার সিরাজদৌলা, ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক পারভেজ, হালিশহর থানার ওসি কাজী মো. সুলতান আহসান উদ্দিনসহ আরও অন্তত ১৮-২০ পুলিশ কর্মকর্তা কর্মরত আছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ দেওয়া (২০২৫ সালের ব্যাচ থেকে) নারী ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবলদের পদায়ন ও বদলিসংক্রান্ত জারি করা নীতিমালা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওই নীতিমালায় নারী পুলিশ সদস্যদের নিজ জেলা বা পছন্দসই জেলায় চাকরি/পোস্টিং পাওয়ার সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে, মূলত ২০২৫ ব্যাচের নারী পুলিশ সদস্যদের নিজ জেলায় পদায়নের উদ্দেশ্য তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং কাজের ক্ষেত্র সহজতর করা।

২০২৩ ব্যাচের এক নারী কনস্টেবল ওই নীতিমালাকে বৈষম্যমূলক মন্তব্য করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি খুলনা জেলা পুলিশে কর্মরত আছি। আমাদেরও তো পরিবার আছে। চাকরির জন্য পরিবার থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছু অতি-উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা বাহিনীর শৃঙ্খলা নষ্টের জন্য এ ধরনের নীতিমালা জারি করেছেন। ফলে মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।’

জানা গেছে, বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল আছে প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার। বিপুলসংখ্যক এই কনস্টেবল কর্মক্ষেত্রে বঞ্চিত ও অবহেলিত হওয়ার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এর মধ্যে তারা অতিরিক্ত ডিউটি, আর্থিক অসচ্ছলতা, বদলি-পদায়ন বৈষম্য প্রভৃতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন। এসবের প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে। হতাশ কেউ কেউ আত্মহননের মতো পথও বেছে নিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার রেকর্ডও একেবারে কম নয়। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে ৫ পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। আগের বছর ২০২৫ সালে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ জন।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে জারি করা ‘বৈষম্যমূলক নীতিমালা’ কোন প্রেক্ষাপটে, কি চিন্তা থেকে জারি করা হয়েছে এ বিষয়ে জানতে দেশ রূপান্তর থেকে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-৩) মো. জামিরুল ইসলামের মোবাইল ফোনে গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে একাধিকবার কল করলেও তিনি ধরেননি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি একেএম আওলাদ হোসেন গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় ফোন ধরলেও বিষয়টি শুনে মোবাইল ফোনের সংযোগ কেটে দেন।

গত শুক্রবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে মোবাইল ফোনে কথা হয় সদর দপ্তরের ডিআইজি (অ্যাডমিন) আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) একটি বড় ইউনিট। পলিসি মেকাররা যেটা ভালো মনে করেছেন, সেটাই করেছেন। এখানে মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ বা অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার কারণ নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত